মত-বিশ্লেষণ

কার্বন নির্গমন: জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস

আকিক তানজিল জিহান: কালের পরিক্রমায় মানবসভ্যতার ক্রমবর্ধমান বিকাশ সাধিত হয়েছে। গত কয়েক শতকের শিল্পবিপ্লবের দরুন কৃষিনির্ভর আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা ক্রমেই পরিবর্তিত হয়ে যন্ত্রনির্ভর ব্যবস্থার আকার ধারণ করে। ফলে প্রকৃতি ও পরিবেশের এক ধারা থেকে অন্য ধারায় পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্টই লক্ষ করা যায়। প্রকৃতির মৌলিক উপাদান তথা মাটি, বায়ু, পানি, বায়ুমণ্ডল ও আলো, যার ওপর পুরো জীববৈচিত্র্য নির্ভরশীল, সেগুলো আজ কার্বন নির্গমনের জাঁতাকলে পড়ে ক্ষত্রিগ্রস্ত হচ্ছে। একদিকে অতিরিক্ত কার্বন নির্গমনের ফলে সৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে এর প্রভাবে জলবায়ু পরিবর্তিত হওয়ার ফলে প্রাণ-প্রকৃতি, বাস্তুতন্ত্র বা পরিবেশ তার স্ব-বৈচিত্র্য হারাচ্ছে।

নোবেলজয়ী বায়ুমণ্ডল-বিষয়ক রসায়ন বিজ্ঞানী পল জে. ক্রুটজেন মানুষ ও পরিবেশের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে গিয়ে ভূতাত্ত্বিক কাল বিভাজনে দুটি পর্বের ইঙ্গিত করেছেন। একটি হলোসিন (যড়ষড়পবহব), অপরটি অ্যানথ্রোপসিন (holocene) । প্রথম পর্বে কৃষিনির্ভর আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় মানুষকে বায়োলজিকাল এজেন্ট (biological agent) হিসেবে অবিহিত করলেও দ্বিতীয় পর্বে সমসাময়িক যন্ত্রনির্ভর পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় মানুষকে জিওলজিকাল এজেন্ট (geological agent) হিসেবে অবিহিত করেছেন। এ থেকে স্পষ্টই ধারণা পাওয়া যায়, কৃষিনির্ভর আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় মানুষ পরিবেশের উপাদানের ওপর কিছুটা প্রভাব ফেললেও ব্যবহারের দ্বারা সর্বোপরি উপকৃত হতো। কিন্তু যন্ত্রনির্ভর পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় মানুষের জীবনযাত্রা সহজতর হলেও প্রাকৃতিক সম্পদের বিধ্বংসী ব্যবহার, অনিয়ন্ত্রিত ধোঁয়া ও বর্জ্য নিষ্কাশনের মাধ্যমে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে চলেছে প্রতিনিয়তই। অন্যভাবে বলতে গেলে নগরায়ণ, অরণ্যবিনাশ, জীবাশ্ম জ্বালানির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, জলাভূমি ভরাট, কৃষিজমি ধ্বংস এবং কলকারখানার অপরিকল্পিত বর্জ্য নিষ্কাশনের প্রভাবে জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়াও বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাসসহ ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। একইসঙ্গে মাটি, বায়ু ও পানির মতো পরিবেশের উপাদানগুলো বিনষ্ট হওয়ার পথে।

ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ১৮৫০ সালের চেয়ে ২০১১ সালে এসে কার্বনডাই-অক্সাইড নির্গমনের পরিমাণ ১৫০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৮০ সালে কার্বনডাই-অক্সাইড নির্গমনের পরিমাণ ছিল ১৯৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন, যা ২০১১ সালে হয়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ২৭৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন। ইতিহাসের যেকোনো সময়ের মধ্যে এটিই সর্বাধিক।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন প্ল্যান ২০২১-২০২৫’-এর প্রতিবেদনে দেখা যায়, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের হার কলকারখানায় ২৯ শতাংশ, কৃষিজমিতে ১৮ শতাংশ, গৃহস্থালিতে ১৮ শতাংশ, যোগাযোগ ব্যবস্থায় ১৬ শতাংশ, বর্জ্য নিষ্কাশনে চার শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে ১৫ শতাংশ।

২০১৮ সালের ইউনিয়ন অব কনসানর্ড সায়েন্টিস্টের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সর্বাধিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনকারী দেশগুলোর তালিকায় চীন শীর্ষে অবস্থান করছে। তারা কার্বন নির্গমন করছে ১০ হাজার ৬০ মিলিয়ন মেট্রিক টন। অন্যদিকে কার্বন নির্গমনে আগের শীর্ষ দেশ যুক্তরাষ্ট্র পাঁচ হাজার ৪১০ মিলিয়ন মেট্রিক টন কার্বন নির্গমন করে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। এরপর ক্রমান্বয়ে ভারত দুই হাজার ৬৫০ মিলিয়ন মেট্রিক টন, রাশিয়া এক হাজার ৭১০ মিলিয়ন মেট্রিক টন এবং জাপান এক হাজার ১৬০ মিলিয়ন মেট্রিক টন কার্বন নির্গমন করছে। এছাড়া অন্যান্য দেশের মধ্যে রয়েছে জার্মানি, ইরান ও কোরিয়ার মতো অন্যতম দেশগুলো। অপরদিকে সর্বোচ্চ ১৮ দশমিক ৪৮ টন মাথাপিছু কার্বন নির্গমন করে সৌদি আরব রয়েছে শীর্ষে। এর পরই যথাক্রমে ১৭ দশমিক ৬০ টন, ১৬ দশমিক ৯২ টন, ১৬ দশমিক ৫৬ টন ও ১৫ দশমিক ৩২ টন মাথাপিছু কার্বন নির্গমনে এগিয়ে থাকা দেশগুলো হলো তাজাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা।

জলবায়ু গবেষক ওয়ালেস ব্রোয়েকারের মতে, ওজন স্তরের ক্রমাগত ক্ষয় এবং বিশালাকায় হিমবাহ প্রবাহের ফলে আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন সূচিত হয়েছে, বা হতে পারে। কারণ এই হিমবাহের বরফের নিচে কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে ২৪ গুণ বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস মিথেন স্তূপীকৃত রয়েছে, যা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে বায়ুমণ্ডলই কাচের ঘরের ভূমিকা নেবে এবং সূর্যের আলো, তাপ ও অতিবেগুনি রশ্মি প্রতিফলিত হতে পারবে না। এর ফলে তাপমাত্রা ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকবে। এখন পর্যন্ত বার্ষিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ১৯৯৫ সালের ৫৯ দশমিক ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৯৯০ সালের আইপিসিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শতাব্দীর শেষদিকে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে পৃথিবীর বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে এই গড় তাপমাত্রা আট ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১৬ ফুট বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।

বিজ্ঞানী জেমস হ্যানসেনের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে এবং পৃথিবীর বুক থেকে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ প্রজাতি বিলুপ্তি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শতাব্দীর শুরুর দিকে বেশ কয়েকটি পরিসংখ্যানের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, বিশ্বে প্রতি ২০ মিনিটে একটি করে এবং দিনে গড়ে ১৪০টি প্রাণিপ্রজাতি পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি ঘণ্টায় ৬৮৫ হেক্টর পরিমাণ ভূমি মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে এবং ৬০ জন ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। একইসঙ্গে প্রতি মিনিটে গড়ে ২১ হেক্টর পরিমাণ বনভূমি উজাড় করা হচ্ছে। এ ছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানি হিসেবে ৩৫ হাজার লিটার পেট্রোলিয়াম পুড়ছে বলে জানা যায়।

অন্যদিকে ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৯ দশমিক ছয় বিলিয়নে পৌঁছাবে এবং জীবনযাত্রা টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক সম্পদ সরবরাহ করতে পৃথিবীর সমতুল্য প্রায় তিনটি গ্রহের প্রয়োজন হতে পারে।

শিক্ষার্থী, পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..