দিনের খবর প্রথম পাতা

কালিয়াচাপড়া চিনিকল এখন ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

আয়নাল হোসেন: সরকারের কাছ থেকে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার কালিয়াচাপড়া চিনিকলটি ইজারা নিয়েছিল নিলয়-নিটল গ্রুপ। কিন্তু সেটির উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণ না করে সেখানে গাড়িচালকদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মাধ্যমে ইজারা চুক্তির সব শর্ত ভঙ্গ করেছে তারা। শুধু তাই নয়, চিনিকলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে কর্মরত শ্রমিক, কর্মচারী, কর্মকর্তা ও আখচাষিদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) অধীনে ১৭টি চিনিকল রয়েছে। এসব কলের মধ্যে ১৯৬৫ সালে নির্মিত কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার কালিয়াচাপড়া চিনিকলটি ১৯৯৪ সালে সরকার বন্ধ করে দেয়। এরপর ২০০৪ সালে নিলয়-নিটল গ্রুপের কাছে শর্ত সাপেক্ষে মিলটি হস্তান্তর করে সরকার। কিন্তু সব শর্ত ভঙ্গ করে কারখানায় চিনি উৎপাদন বন্ধ করে সেখানে গাড়িচালকদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করেছে নিলয়-নিটল গ্রুপ। মিল এবং আশপাশের ভবন ও জায়গা নিয়ে মোট ৯৯ একর জমি রয়েছে মিলটির অধীনে। এসব জমিতে এখন জঙ্গল আর জঙ্গল। সেখানে নেশাজাতীয় পণ্য বেচাকেনা হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। 

১৯৭২ সালের ‘বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজেস (ন্যাশনালাইজেশন) অর্ডার’ রহিত করে সরকার ২০১৮ সালে ‘বাংলাদেশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ আইন’ প্রণয়ন করে। ওই আইনের ১১ ধারায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে হস্তান্তর প্রসঙ্গে বলা আছে। এটির এক নম্বর উপধারায় বলা আছে, বিক্রয় অথবা অন্যবিধ হস্তান্তরের পর চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ব্যর্থতার জন্য সরকার বিক্রয় ব্যতীত অন্যবিধ হস্তান্তর চুক্তি বাতিলপূর্বক উক্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান ফেরত গ্রহণ করতে পারবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান মো. আরিফুর রহমান অপু শেয়ার বিজকে বলেন, দুটি চিনিকল সরকার বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করেছে। এসব মিলের কোনো দায়-দায়িত্ব করপোরেশনের নেই। এ ব্যাপারে করপোরেশনের কোনো তদারকিও নেই।

মিল হস্তান্তরের ১২ নম্বর শর্তে বলা হয়, মিলের উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধিকল্পে ক্রেতা ওই মিলের বিএমআই’র (সুষমকরণ, আধুনিকীকরণ, পুনর্বাসন এবং সম্প্রসারণ বা ডাইভারসিফিকেশন) উদ্দেশ্যে বা তৎসম্পর্কিত উদ্দেশ্যে পুঁজি সংগ্রহ ও অর্থ সংস্থানের নিমিত্তে উক্ত মিলের জন্য স্থাবর সম্পত্তি এই শর্তে কোনো তফসিলি ব্যাংক, বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক, বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থা, বাংলাদেশ পুঁজি বিনিয়োগ সংস্থা (আইসিবি) বা অন্য কোনো অর্থলগ্নীকারী সংস্থার কাছে বন্ধক রাখতে পারবেন। উক্ত মিলের দায়দেনা পরিশোধের ক্ষেত্রে অত্র বিক্রয় চুক্তির অধীন ক্রেতার কাছে বিক্রেতার প্রাপ্য অর্থ সর্বাগ্রে আদায়যোগ্য বলে গণ্য হবে। এখানে উল্লেখ্য, অনুরূপ ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে বিক্রেতার অনুমতি গ্রহণ করতে হবে।

চুক্তির ১৩ নম্বর শর্তে বলা আছে, মেশিন ও  লোকবলের অনুপাতসহ মেশিনের অবস্থা, কাজের পরিবেশ ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় লোকবল নির্ধারণের উদ্দেশ্যে বিক্রেতা কর্তৃক মনোনীত একটি যৌথ কারিগরি কমিটি গঠন করা হবে। এ কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত প্রয়োজনীয় সংখ্যক শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাকে ক্রেতা কর্তৃক চাকরিতে নিয়োগ প্রদান করতে হবে। 

কালিয়াচাপড়া আখচাষি ও শ্রমিক কর্মচারী সংগ্রম পরিষদের সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, নিলয়-নিটল গ্রুপ মিলটি কেনার পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও দেয়া হয় অনেককে। মিলটি দুই বছর সীমিত আকারে পরিচালনার পর চাষিরা আখ চাষ করবেন না বলে লিখিত দেন। এমন অভিযোগ তুলে দুই বছরের মাথায় মিলটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

মতিউর রহমান আরও বলেন, কালিয়াচাপড়া চিনিকলটি ছিল কিশোরগঞ্জ ও আশপাশের জেলার একমাত্র কৃষিভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এ মিলকে কেন্দ্র করে অত্র অঞ্চলের অনেকের জীবিকা নির্বাহ হতো। কিশোরগঞ্জ, নান্দাইল, হোসেনপুর, কটিয়াদী, পাকুন্দিয়া ও আশপাশের লোকজনপ্রায় পাঁচ হাজার একর জমিতে আখ চাষ করতেন। এতে অনেকের কর্মসংস্থান হতো। মিলটি বন্ধ হওয়ায় অনেক শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কালিয়াচাপড়া কারখানাটিতে চিনি উৎপাদনের কোনো নিশানা নেই। ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, নিলয়-নিটলের ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ভেতরে পড়ে আছে বেশ কিছু বড় বড় কনটেইনার। মিলের ভবনগুলোর চারপাশে জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। ভবনগুলোর ফটক সিলগালা করা। ভেতরে মেশিনারিজ রয়েছে। ছোট ছোট পিকআপভ্যানে চালকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে এখানে। কয়েকটি পুরোনো পিকআপভ্যান অকেজো পড়ে থাকতে দেখা যায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মিলের ভেতরে সন্ধ্যা নামলেই চলে মাদকাসক্তদের আড্ডা। ভেতরে কেনাবেচা হয় নানা ধরনের মাদক। মিলের বাইরে পড়ে থাকা মিলের সরঞ্জাম মাদকসেবীরা নিয়ে বিক্রি করে দিচ্ছে। তবে দিনের বেলায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার থাকায় সেখানে তারা ঢুকতে পারে না।

সার্বিক বিষয়ে জানতে নিটল-নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল মাতলুব আহ্মাদের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি তা রিসিভ করেননি। পরে তার মুঠোফোনে খুদেবার্তা পাঠানো হয়। এরপর নিটল-নিলয় গ্রুপের কিশোরগঞ্জ জোনের প্রজেক্টর মো. ওমর ফারুক এই প্রতিবেদককে ফোন করেন। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, কিশোরগঞ্জ এলাকার একমাত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইকোনমিক জোন) হচ্ছে এখানে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হবে। বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। আগামী মার্চের মধ্যে কাজ শুরু হবে বলে জানান তিনি। এর চেয়ে বেশি কিছু তিনি বলতে রাজি হননি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..