সম্পাদকীয়

কালোটাকা সাদা করার অবারিত দ্বার রুদ্ধ হোক

আয়ের উৎস দেখাতে না পারলে তা যে অননুমোদিত পন্থায় অর্জিত, এটি অতি সহজেই বোধগম্য। চুরি, ডাকাতি, চোরাকারবারি, শুল্ক ও রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অর্জিত অর্থের উৎস দেখানো সম্ভবও নয়। যে অর্থ অর্জনের উপায় দেখানো যায় না, সেটি বৈধ পন্থা নয়। অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ ভোগ করার সুযোগ থাকলে নাগরিকরা সে পথেই অর্থ অর্জনের চেষ্টা করবে। একটি সভ্য ও কল্যাণ রাষ্ট্র কখনোই অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ ভোগের অনুমোদন দিতে পারে না। আমাদের সংবিধানেও বলা হয়েছে, অনুপার্জিত অর্থ যাতে কেউ ভোগ করতে না পারে, রাষ্ট্র তা নিশ্চিত করবে।

বিভিন্ন সময়ে আমাদের দেশে যেভাবে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়ে আসছে, তা সংবিধানের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কালো টাকাকে ‘অপ্রদর্শিত অর্থ’ হিসেবে দেখিয়ে অপরাধটিকে নগণ্য করেই দেখা হচ্ছে না বরং প্রকারান্তরে এটিকে স্বীকৃতিই দেয়া হচ্ছে বৈকি। এটি আইনের শাসনের পরিপন্থি বলেই মনে হয়।

একেকবার একেকভাবে বিনা প্রশ্নে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু সহজে এবং বিনা প্রশ্নে সাদা করার সুযোগে কালোটাকা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা যেমন থাকে, তেমই সৎ করদাতারা এতে নিরুৎসাহিত হন। এটি সম্পূর্ণ অপ্র্রত্যাশিত। দুঃখজনক হলো, বারবার সুযোগ দেয়া হচ্ছে।

প্রতি বছরই প্রাক-বাজেট আলেচনায় বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা বিনা প্রশ্নে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ করতে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। রোববার ‘জাতীয় বাজেট ২০২১-২২: পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য কী থাকছে’ শীর্ষক সংলাপে সিপিডি বাজেটে নতুন কোনো কর আরোপ বা করহার না বাড়িয়ে প্রশাসনিক দক্ষতায় কর ফাঁকি বন্ধ ও কালোটাকা বৈধ করার সুযোগ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।

আমরা মনে করি, বিনা প্রশ্নে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বারবার দিলে অসাধুদের প্রশ্রয়দান হিসেবেই গণ্য হবে। এবারও উৎস নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি না হওয়া এবং কভিডের কারণে বিদেশে অর্থ পাঠানোর সুযোগ কমে যাওয়ায় কালোটাকা সাদা করার সুযোগ নেবেন অনেকে।

অপ্রদর্শিত অর্থ মূল ধারায় আনার বিশেষ প্রয়োজনও রয়েছে। এটি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। কিন্তু আমাদের দেশে এ নিয়ে কোনো গবেষণা হয়নি। কালোটাকা সাদা করার যে সুযোগ, সেটি কোনো ‘নীতি’ই নয়। এটি সাম্য, নীতি, সংবিধান এবং সৎ করদাতা পরিপন্থি, উন্নয়ন ও সাম্যবিরোধী। টেকসই উন্নয়নের জন্য কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। কালো টাকার বড় অংশ টাকা বিদেশে নিয়ে যাচ্ছেন কারা, তাদের বিষয়ে কঠোর হতে হবে। যারা সৎভাবে ব্যবসা করবেন, তারা কর দেবেন ৩২ শতাংশ আর চুরি-ডাকাতির টাকা ১০ শতাংশ কর দিয়ে সাদা করা হবে, এটি নৈতিকতার পরিপন্থি। এমন সুযোগ দেয়া হলে সৎ করদাতারাই বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হন। দেশের আইন মেনে তারা তো ভুল করেননি। তাই কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ করার বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..