Print Date & Time : 26 May 2020 Tuesday 11:31 am

কাশিয়ায় ভাগ্যের পরিবর্তন চরাঞ্চলে

প্রকাশ: ফেব্রুয়ারী ১০, ২০২০ সময়- ১১:৩৪ পিএম

ধরলা নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চলে জেগে উঠেছে কাশিয়ার (কাশফুল) গাছ। একসময় ঘরের ছাউনি, টাটি ও বাড়ির বেড়া তৈরিতে ব্যবহƒত হতো এ কাশিয়া। সময়ের বিবর্তনে ইট, বালি, সিমেন্ট ও টিনের ব্যবহারে হারিয়ে যায় কাশিয়ার ব্যবহার। ফলে চরাঞ্চলের অনেক মানুষ কাশিয়া বিক্রি করে যা উপার্জন করত, তা থেকে বঞ্চিত হয়। তবে কয়েক বছর ধরে এতেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছেÑসেই কাশিয়া বিক্রি করে ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়েছে চরাঞ্চলের অনেকে। বর্তমানে পানের বরজের উপকরণ হিসেবে এর বহুল ব্যবহার চোখে পড়ে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ধরলা নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চলের প্রায় ৪০০ একর জমিতে প্রকৃতির আপন ইচ্ছায় জেগে উঠেছে কাশিয়া। গাছগুলো চাষ বা পরিচর্যা করতে কোনো খরচ হয়নি চরাঞ্চলের মানুষের। কোনো ব্যয় না করেই তারা এখন কাশিয়া বিক্রি করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। ঘটছে ভাগ্যের পরিবর্তন। ফলে লালমনিরহাটের বোয়ালমারীর চর, কুলাঘাট ২নং সিট, কুলাঘাট, গোরক, ফলি মারির চর, বনগ্রাম, কুড়িগ্রামের চতিন্দ্র নারায়ণ, সোনাই গাজী, ধনিরাম, বড়াইবাড়ীর চর, মাস্টারহাট চর, কাঁঠালবাড়ী চরসহ ধরলা নদী তীরবর্তী চরাঞ্চল থেকে লাখো টাকার কাশিয়া আসছে লালমনিরহাট সদর উপজেলার চর শিরের কুটি, মোগলহাট ও আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর এলাকায় গড়ে ওঠা কাশিয়ার বাজারে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত বসে এ বাজার। রাজশাহী, বরিশাল, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অর্ধশতাধিক পানচাষি ও পাইকাররা এখান থেকে কাশিয়া কিনে তা ট্রাকে করে নিয়ে যায় বিভিন্ন স্থানে।

প্রতি বছর আমন ধান কাটা শুরুর প্রায় মাস দুয়েক আগে রংপুর অঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে। ফলে কাজের সন্ধানে পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা পাড়ি দেয় দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। তবে এবার লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের অধিকাংশ মানুষকে পাড়ি দিতে হয়নি দক্ষিণাঞ্চলে। কাশিয়ার বাজারকে কেন্দ্র করে অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে কর্মসংস্থান। প্রতিদিন গাছ কাটা থেকে শুরু করে চরাঞ্চল থেকে নদীর ঘাটে আনা, ট্রাকে বোঝাই করা পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এখানে। দিনপ্রতি একেকজন মানুষ মজুরি পাচ্ছে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা। এতে চরাঞ্চলের কর্মহীন পরিবারগুলোর সংসারে ফিরে এসেছে সচ্ছলতা।

ফলি মারির চরের রহিম শেখ বলেন, এবার আমার প্রায় ১০ বিঘা জমিতে কাশিয়া হয়েছে। পাইকাররা চরে এসে ৮৫ হাজার টাকার কাশিয়া কিনেছেন। এতে আমার কোনো খরচ হয়নি। চার বছর ধরে এভাবে কাশিয়া বিক্রি করে তিনি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে তিনি এখন সুখে আছেন।

ধনিরাম চরের গোপাল রায় বলেন, এ বছর কাশিয়ার চাহিদা বেশি থাকায় দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত তিনি কাশিয়া বিক্রি করে তিন লাখ ৪০ হাজার টাকা আয় করেছেন। আর কাশিয়া গাছ কেটে মুঠা তৈরি করতে শ্রমিকদের দিতে হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার টাকা।

ট্রাক লোডের দায়িত্বে থাকা শ্রমিক রফিকুল, চান মিয়া, ফরিদসহ কয়েকজন বলেন, প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ১২ ট্রাকে কাশিয়া লোড করতে হয় আমাদের। চার বছর ধরে কাশিয়ার বাজার ঘিরে কাজ করেন তারা। এ কারণে কাজের সন্ধানে আর দক্ষিণাঞ্চলে যান না। গত বছরের নভেম্বরে কাজ শুরু করেছেন তারা, জানুয়ারি পর্যন্ত চলেছে তাদের কর্মযজ্ঞ। তারা এখানে কাজ পেয়ে অনেক খুশি।

বাজারের স্থানীয় পাইকার আসাদ হোসেন, সাইদুল, জোবেদসহ কয়েকজন জানান, বিগত বছরের চেয়ে এবার চাহিদা বেশি থাকায় কাশিয়ার দাম তুলনামূলকভাবে বেশি। কৃষকদের কাছ থেকে এক মুঠা কাশিয়া কিনতে হচ্ছে ছয় টাকা দরে। অথচ গত বছর এক মুঠা চার টাকায় কিনেছিলেন তারা। এ বছর ফলন ভালো হওয়ায় প্রতিদিন এ বাজার থেকে কমপক্ষে ১২ ট্রাক কাশিয়া দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে।

রাজশাহী থেকে কাশিয়া কিনতে আসা মাসুদ, রেজাউল ও নিজাম বলেন, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের ধরলা নদী তীরবর্তী চরগুলোয় সবচেয়ে বেশি কাশিয়ার আবাদ হয়। আর এসব কাশিয়া বিক্রি করতে গড়ে উঠেছে কাশিয়ার বাজার। তাই প্রতি বছর এ সময় এ বাজারে এসে পানের বরজ তৈরির জন্য কাশিয়া কিনি।

লালমনিরহাট সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহাদত হোসেন বলেন, বছরের একটি সময় এ অঞ্চলের মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েন। তাই কাজের সন্ধানে পরিবার-পরিজন নিয়ে পাড়ি দেন দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। সেইসব দিন কিছুটা হলেও পাল্টে গেছে।

লালমনিরহাট সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, চরাঞ্চলের জমিতে আপনাতেই জšে§ কাশিয়া। এ গাছগুলোর চাষ বা পরিচর্যায় কোনো খরচ নেই, এ কারণে কাশিয়া বিক্রি করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন তারা।

জে আই সমাপ্ত, লালমনিরহাট