মত-বিশ্লেষণ

কাশ্মীরে ভারতের সাংঘাতিক ভুল

ড. আয়েশা রয়: অসম্ভব ভয়ানক, অগণতান্ত্রিক ও গোপনীয়তাপূর্ণ পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মদি ও তার সরকার রাষ্ট্রপতি আদেশের মাধ্যমে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫নং ধারা রদ করে দিলেন। অশান্ত জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সরকার তার সব অংশীজনকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেনি।
ভারতে রাষ্ট্রপতি আদেশ বলতে বোঝায় রাজ্য সরকারকে স্থগিত করে প্রত্যক্ষ কেন্দ্রীয় শাসন কাঠামো চাপিয়ে দেওয়া। এমন একটি আদেশ জম্মু ও কাশ্মীরে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই সর্বশেষ আদেশটির বৈধতা পাওয়ার জন্য তারা পার্লামেন্টে চালিয়ে দিয়েছিল একেবারে চুপিসারে।
যেহেতু জম্মু ও কাশ্মীরে কোনো বিধানসভা নেই, তাই মোদি সরকার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমিত সাহ খুব ধূর্ততার সঙ্গেই ৩৬৭নং ধারাটিকে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এই ধারা বলে তারা দেখিয়েছিলেন যে, কোনো রাজ্যের পরিকাঠামোগত অবস্থা আইনসম্মতভাবে পরিবর্তন করা যেতে পারে রাষ্ট্রপতি আদেশের মাধ্যমে।
ভারতের সঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীরকে একীভূত করতেই ১৯৪৭ সালে ৩৭০নং ধারাটি সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই ধারাটি বলবৎ হয়েছিল মহারাজা হরি সিংয়ের স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে। ধারাটিকে সংযোজনের হাতিয়ার বা চাবিকাঠি বলে ডাকা হতো। এই ধারটি জম্মু-কাশ্মীর অঞ্চলটিকে একটি বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতাদান করেছিল।
রাজ্যটি নিজস্ব একটি সংবিধান পেয়েছিল, পেয়েছিল একটি পতাকা। তারা নিজেদের মতো করে আইন প্রণয়ন করত। নয়াদিল্লি এসব বিষয়ে কোনো নাক গলানোর অধিকার রাখত না। কেবল পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ বিষয়াদির ওপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ছিল নয়াদিল্লির। ৩৭০ ধারায় বলা হয়েছে, ভারতীয় সংবিধানের ১নং ধারাটি কাশ্মীরের ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য হয়।
কিন্তু ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী ৩৭০ ধারা কখনোই সংশোধনযোগ্য হতে পারে না বিধানসভার অনুমোদন ছাড়া। ধারা ৩৭০(৩)-এ বলা হয়েছে: “সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করে কেবল রাজ্যের বিধানসভার অনুমোদিত পরিমার্জন ও সংশোধন এবং তারিখ নির্দিষ্ট করার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি এই ধারাটির কার্যকারিতা স্থগিত করতে কিংবা বলবৎ করার ঘোষণা দিতে পারেন… প্রজ্ঞাপনের মতো রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রচারণা এক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক বলে গণ্য হবে।”
কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই নয়াদিল্লির ভারতীয় পার্লামেন্ট কর্তৃক সৈন্য মোতায়ন বাড়ানো হলো, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আটক করা হলো এবং সম্ভবত এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আট মিলিয়ন কাশ্মীরি জনগণকে কারারুদ্ধ করা হলো। পার্লামেন্ট এই রাজ্যকে পৃথক দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করল। একটি লাদাখ, যারা কোনো বিধানসভা পেল না এবং আরেকটি জম্মু ও কাশ্মীর, যাদের একটি বিধানসভা দেওয়া হলো।
এসব ড্রাকোনিয়ান বিধিমালা-মানদণ্ড যখন থেকে পাস করা হলো, তখন থেকেই কাশ্মীরে কারফিউ জারি হয়ে গেল। তাতে পুরো এলাকা হয়ে গেল অবরুদ্ধ। বিপুলসংখ্যক মিলিটারির উপস্থিতিতে পরিবেশ কঠোরতম হয়ে উঠল, কোথাও কোনো স্বাভাবিকতা থাকল না। এই পরিবর্তন ভারত ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য একটি বিপর্যস্ত পরিণতি এনে দিল।
একতরফা সিদ্ধান্ত
এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো কাশ্মীরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই গৃহীত হয়েছে। সমগ্র কাশ্মীরবাসীর অনুমোদনের তোয়াক্কা না করেই একটি রাজ্যকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করতে মোদি সরকারের এই একক একতরফা ছোবল বয়ে এনেছে একটি ভয়াবহ আইনসংক্রান্ত পরিস্থিতি, যা জটিল সংকট সৃষ্টি করে এবং কোনোভাবেই কারও কাছে আকাক্সিক্ষত ও সম্ভাষিত হতে পারে না। এমনকি এখানে সৃষ্টি হয়েছে কিছু সাংবিধানিক প্রশ্ন।
৩৭০নং ধারা পাল্টে ফেলায় জম্মু ও কাশ্মীর কি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হবে? আর এই পাল্টে ফেলার আইন কি এই রাষ্ট্রটিতে ভারতকে দখলদারিত্বের দুয়ার খুলে দেবে? কেননা যতক্ষণ পর্যন্ত ৩৭০নং ধারাটি ভারতীয় সংবিধানের সঙ্গে যুক্ত ছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত ভারত কাশ্মীরকে তাদের আইনসংগত অধিকার বলে দাবি করতে পারত।
কিন্তু এই আইনের অনুপস্থিতিতে, কাশ্মীর নিয়ে ভারতের আইনসংগত অধিকার বিষয়ে এখন একটি স্পষ্ট প্রশ্ন উঠে এসেছে। ভারত সরকার এখানে আরেকটি আইনি বাধার সম্মুখীন হচ্ছে; সেটা হলো, এই ৩৭০ ধারাটি একটি সাময়িক বিধান হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছিল, যা কেবল জম্মু ও কাশ্মীরের বিধানসভার মাধ্যমেই পরিবর্তন ও সংশোধনযোগ্য বলে পরিগণিত হতো। কিন্তু বিধানসভা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল ১৯৫৭ সালেই এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩৭০ ধারা একটি স্থায়ী ধারায় পরিণত হয়।
২০১৮ সালে ভারতীয় সুপ্রিমকোর্ট আবার ব্যাখ্যা করেন যে, ধারা ৩৭০ স্থায়িত্ব অর্জন করেছে, এটাকে কোনোভাবে বাতিল করা সম্ভব নয়।
নিরাপত্তা
দ্বিতীয়ত, এই ভয়াবহ, অসুস্থ ও কল্পনাপ্রসূত পদক্ষেপটি কার্যত কাশ্মীরকে পাকিস্তানের অধিকার বলে দাবি করতে পাকিস্তানকে উৎসাহ জুগিয়েছে। এমনকি এই পদক্ষেপটি হিজবুল মুজাহিদিন, লস্কর-ই-তৈয়্যিবা ও আলকায়দার স্থানীয় শাখা এবং আনসার গাজওয়া-উল-হিন্দের মতো বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হাতে কাশ্মীরকে তাদের অধিকার হিসেবে তুলে দিয়েছে। এছাড়া কাশ্মীরি তরুণদের উগ্রপন্থায় টেনে আনতে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে কিছু বৈধ উপলক্ষ তৈরি করে দিয়েছে।
মোদি সরকার আদতে তার নিজ দেশের নাগরিকদেরই জিম্মি করে রেখেছে। তাতে এই কাশ্মীরি নাগরিকগুলোকে সরকারের পক্ষ থেকেই আগের প্রাক-ভারতীয় কাশ্মীরি নাগরিক হিসেবে ভারতের প্রতিপক্ষ বানিয়ে নিয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এটা একটি ভয়াবহ অসুস্থ পরামর্শ এবং আতঙ্কজনক পদক্ষেপ বলেই বিবেচিত হয়।
উপরন্তু, মোদি সরকার ৩৭০নং ধারাটি বাতিল করে দিয়েছে জম্মু ও কাশ্মীরকে একীভূতকরণের কার্যকারণ দেখিয়ে, যাতে তারা নাকি শান্তি, স্থিতি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এই অঞ্চলজুড়ে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা তার বিপরীত। রাজ্যজুড়ে যা হচ্ছে, তা ধারা বাতিলের উদ্দেশ্যের সঙ্গে একেবারেই বৈরিতা প্রদর্শন করে চলেছে।
এখন কাশ্মীর ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। তাহলে কি এই অঞ্চলটিকে ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতো করে ভাবা সম্ভব হবে, যখন এই রাজ্যে বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন করা থাকবে, নাকি অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় এই রাজ্যকে ভিন্নভাবেই ভাবতে হবে? এখানে একীভূতকরণ, শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রশ্ন; কিন্তু এর কোনোটিই পাশবিক শক্তি দিয়ে অর্জন করা যায় না।
অথচ এই পাশবিক শক্তি প্রয়োগের পথটিই এই মোদি সরকার বেছে নিয়েছে। এমনকি এই পথে তারা এখন বদ্ধপরিকর। দেখা যাচ্ছে তারা একটি উন্নয়নের চিন্তা করছে এই অঞ্চলজুড়ে। কিন্তু যতই তারা উন্নয়নের স্বপ্ন দেখুক না কেন একটি প্রশ্ন চলেই আসে কঠোরভাবে বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন করা কোনো অঞ্চলে কি কেউ বিনিয়োগ করতে চায়?
হিন্দু জাতীয়তাবাদ
চতুর্থত, ধারা ৩৭০ বাতিল করা ভারতীয় জনতা পার্টির মেনিফেস্টোতে সব সময়ই একটি জায়গা দখল করে আছে। ধারা ৩৭০ বাতিলে বিজেপির উদ্দেশ্যের সারকথা হলো, কাশ্মীরি পণ্ডিতদের প্রতি যে অন্যায়গুলো করা হয়েছে, তা সংশোধন করা। ভারত সরকারের বিরুদ্ধে কাশ্মীর বিদ্রোহ যখন আশির দশকের শেষের দিকে শুরু হয়েছিল, তখনকার সংখ্যালঘু এই হিন্দু পণ্ডিতদের জাতিগতভাবে ধবল ধোলাই করা হয়েছিল। এই সময়গুলোয় হিন্দু পণ্ডিতেরা তাদের আবাসন পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নে আপন অধিকার নিয়ে ভালোভাবেই জীবনযাপন করে চলছিলেন। কিন্তু মোদি সরকার এই সর্বশেষ প্রতারণাপূর্ণ আদেশে ছলে-বলে-কৌশলে এই রাজ্যকে প্রধানত একটি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে পা ফেলার চেষ্টা চালাচ্ছে।
ধারা ৩৭০ ও ৩৫ বাতিলের ভেতর দিয়ে এখন থেকে যে কোনো ভারতীয় এই রাজ্যে বসতি স্থাপন করতে পারবে। এটা উল্লেখযোগ্য হারে এই অঞ্চলের জনমিতি পরিবর্তন করে দেবে, যা ভারতের সংখ্যাগুরু হিন্দুদের অনুকূলেই যাবে।
এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা বা আলাপ-আলোচনায় কাশ্মীরি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হওয়ার মানে হলো চড়া মূল্য পরিশোধ করা। এমনকি ভারতের জন্য এর পরিণাম সর্বনাশা মহাবিপর্যয় বয়ে আনবে। ভারতের ওপর কাশ্মীরি মুসলিমদের পুনরায় বিশ্বাস রাখার আর কোনো কারণ বা উপলক্ষই বাকি থাকবে না। ফলে কাশ্মীরের বিরুদ্ধে ভারতের এই সর্বশেষ পদক্ষেপের পরিণতিতে হিংস্রতা, বিদ্রোহ, অন্ধকারের দিনমালা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সম্ভাব্য সব ধরনের যুদ্ধ নিকট দিগন্তেই উঁকি মারছে।

সহযোগী অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব পলিটিক্যাল সায়েন্স, কিংস কলেজ, পেনসিলভানিয়া

এশিয়া টাইমস থেকে
ভাষান্তর: মিজানুর রহমান শেলী

সর্বশেষ..