পাঠকের চিঠি

কিশোর অপরাধ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকিস্বরূপ

শিশু-কিশোরদের একটা বড় অংশ স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে বর্তমান করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বন্ধ আছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছেশিশু-কিশোরদের ওপর।

মহামারির চরম দুঃসময়ে কিশোর অপরাধের ভয়াবহ দৃশ্যপট এ অতিমারির চেয়েও দুর্বিষহ পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করে চলছে।

রাষ্ট্র-সমাজ-পরিবারসহ সামগ্রিক পরিবেশ-প্রতিবেশকে প্রচণ্ড ক্ষতবিক্ষত করে কিশোর অপরাধের অপ্রতিরোধ্য গতিভঙ্গি ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতি ও মাত্রিকতায় প্রকাশ পাচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন গণমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে তাদের নানা অপরাধ। লুটপাট থেকে শুরু করে ধর্ষণ, হত্যার মতো ঘৃণ্য অপরাধকর্মে লিপ্ত হচ্ছে।

কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের তথ্যমতে, কেন্দ্রে অবস্থানরত ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সী কিশোরদের ২০ শতাংশ হত্যা এবং ২৪ শতাংশ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার আসামি। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক সেবন, ক্রয় ও বিক্রয়, অস্ত্র ব্যবহার-ব্যবসা ইত্যাদি জঘন্য অপরাধে জড়াতে তারা বিশেষ মহল কর্তৃক প্রতিনিয়ত প্ররোচিত হচ্ছে।

আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার ৪ কোটি বা প্রায় ৩০-৩২ শতাংশ শিশু-কিশোর। তাদের এক-তৃতীয়াংশের অধিক এক কোটি ৩০ লাখ শিশু বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। ফলে অতি সহজেই তাদের যে কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা অতি প্রকট।

২০১৮ সালের ৬ জানুয়ারি বাংলাদেশে উত্তরা ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী ‘নাইন স্টার’ ও ‘ডিসকো বয়েজে’র সংঘাতের বিষয়টি জনগণের বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়। সহজ-সরল অর্থে এ দুটি কিশোর গ্যাংয়ের মূল কাজ ছিল পার্টি করা, বিকট শব্দে হর্ন বাজিয়ে দ্রুততম গতিতে মোটরসাইকেল চালানো, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, যা ধীরে ধীরে তাদের সন্ত্রাস, মাদক, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, হত্যা, ধর্ষণসহ সমাজের আইনবিরোধী ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডে জড়িত করে।

বরগুনার নয়ন বন্ড তার ‘০০৭’ গ্রুপ নিয়ে জনসমক্ষে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করে। এ হত্যার জন্য ১১ কিশোরকে কারাদণ্ড দিয়ে বরগুনার আদালত বলেছেন, ‘সারাদেশে কিশোর অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে। গডফাদাররা এ কিশোরদের ব্যবহার করছে।’ এ ধরনের ঘটনা সাভার, নারায়ণগঞ্জ ছাড়াও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রায়ই সংঘটিত হচ্ছে।

 সম্প্রতি নরসিংদী জেলা পুলিশ প্রশাসনের অভিযানে একটি বৃহৎ কিশোর গ্যাংকে আটক করতে সক্ষম হয়। অথচ দেশের সব জেলার চিত্রটাও একই। চলমান কঠিন মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি নবতর সংকট হচ্ছে এ কিশোর অপরাধ।

সারা দিন-রাত পাবজি, ফ্রি-ফায়ার গেমসসহ  টিকটক, লাইকি, ভিভোর মতো সাইটে সস্তায় সেলিব্রিটি হতে প্রজন্মের একটা বড় অংশ শো-অফ, পারফরম্যান্স দেখাতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ছে এলাকাভিত্তিক ভয়াবহ গ্যাং কালচার, অপসংস্কৃতি, ইভটিজিং, অশ্লীলতা, মারামারি, ছিনতাইসহ খুনের মতো অপরাধে!

দেশের নগর-শহর-জেলা-উপজেলা এবং প্রান্তিক অঞ্চলে এই অপসংস্কৃতির বিকাশ ও বিস্তার ইতোমধ্যে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে।

অল্প বয়সে স্কুলের গণ্ডি পেরোতে না পারা, দারিদ্র্য, উচ্চাকাক্সক্ষা, পারিবারিক-সামাজিক অনুশাসনের বিপর্যয়, রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি চর্চা কিংবা প্রভাবশালীদের রাজনৈতিক ছত্রছায়াও কিশোর অপরাধ বৃদ্ধিতে অনেকাংশে দায়ী।

এছাড়া বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ক্রান্তিকাল, স্থানান্তর, ভঙ্গুর পরিবার, পারিপার্শ্বিক প্রতিবেশ ও পরিবেশ, পিতা-মাতার শিথিল নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন অরুচিকর বিনোদন ও কল্পিত নায়ক-খলনায়কের মধ্যে সহিংস বিরোধ দৃশ্যের প্রদর্শন, গৃহবিবাদ, ভূমিহীনতা, মাদক সেবন-বিক্রি, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ক্রয়-বিক্রয়-ব্যবহার ইত্যাদি এ অপসংস্কৃতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত।

একটু পর্যালোচনা করলেই দেখা যায়, এ অপসংস্কৃতির উৎসমূলে রয়েছে ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্রুত সামাজিক পরিবর্তন ও বিপুল জনসংখ্যা বৃদ্ধি। সাধারণত নানামুখী জীবন নির্বাহের ধরন, কর্মসংস্থান, অপরিকল্পিত নগরায়ণ-শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট গ্রাম থেকে শহরমুখী গণ-স্থানান্তর, চরম বৈষম্যের বহিঃপ্রকাশে এ অপসংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি, দ্রুততর সময়ের মধ্যে ক্ষমতা-অর্থসম্পদ-বিত্তশালী হওয়ার প্রলোভনও বিবেচ্য।

অপরাধ বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ মনে করেন, অপরাধের শাস্তি যদি অপরাধীর অন্তরে অপরাধ কর্মের জন্য কঠিন যন্ত্রণার উদ্রেক না করে, তাহলে অপরাধপ্রবণতা পূর্ণ বিকশিত হয়। বিখ্যাত মনীষী কার্ল মার্কস, সিগমুন্ড ফ্রয়েড, এমিল ডুর্কেইম, জেলেমি বেনথ্যাম, সিজার লমব্রোসো, এনড্রিকো ফেরি, রাফেলে গ্যারোফেলো, এডউইন এইচ সুদারল্যান্ডসহ খ্যাতিমান সমাজ-মনো-নৃবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিজ্ঞানীরা নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতিতে কী ধরনের অপরাধ কীভাবে সংঘটিত হয়ে থাকে, তার বিশদ বিশ্লেষণও করেছেন।

সর্বোপরি, ধ্বংসের তলানিতে পৌঁছানোর আগেই জনসংখ্যার তুলনায় স্বল্পসংখ্যক এসব কিশোর অপরাধী ও গ্যাং অপসংস্কৃতি নির্মূলে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কাউন্সেলিং-নিরাময় কেন্দ্র, পরিবারের যথোপযুক্ত মনোযোগ, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। একইসঙ্গে অপরাধীদের ও তাদের ইন্ধন দাতাদের কঠোর আইনের আওতায় আনা না গেলে এ কিশোর গ্যাং অপসংস্কৃতি যে করোনা অতিমারির চেয়েও ভয়ংকর মহামারির রূপ ধারণ করবে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ফলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষায় এখনই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

মামুন হোসেন আগুন

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..