কৃষি কৃষ্টি দিনের খবর সারা বাংলা

কীটনাশকমুক্ত ফল চাষে সফল বারী

তাপস কুমার, নাটোর: নাটোরের বাগাতিপাড়ার কৃষক আব্দুল বারী বাকী থাই পেয়ারা, কমলা, মাল্টা, কাশ্মীরি কুল ও গোড়মতি আম চাষ করে ভাগ্য বদল করেছেন। শুরুতে এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে এখন কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক তিনি।

স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি বেকারদের কর্মসংস্থান ও পুষ্টিচাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখছে তার কৃষিপণ্য। মৃত্তিকা পরীক্ষাগারে মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে কীটনাশক ছাড়া তিনি বর্তমানে প্রায় ২০০ বিঘা জমিতে নানা ধরনের ফল চাষ করছেন। এর মধ্যে থাই পেয়ারা, দার্জিলিং ও চায়না কমলা চাষ করেছেন ৪৫ বিঘা জমিতে। মাল্টা ৪৫ বিঘায়। কাশ্মীরি কুল ২৪ ও গোড়মতি আম ১০ বিঘা জমিতে। তার উৎপাদিত এসব ফল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হচ্ছে। কীটনাশকমুক্ত ফল চাষের সব সমস্যা সমাধানে কৃষিবিভাগ তাকে সহায়তা করছে।

আব্দুল বারী বাকী বাগাতিপাড়া উপজেলার খন্দকার মালঞ্চি গ্রামের আশরাফ আলীর ছেলে। বারী বলেন, ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিল মনে নতুন কিছু করার। সে স্বপ্ন ও আত্মবিশ্বাস থেকেই পথ চলা। অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি পার হয়েছে। হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে বিনিদ্র কাটিয়েছেন অনেক রাত। তবু আশা ছাড়েননি। স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। ১৯৯৪ সালে মাধ্যমিক পাস করে কলেজে ভর্তি হলেও নানা প্রতিকূলতায় পড়ালেখা সম্পন্ন করতে পারেননি। বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনো আত্মপ্রত্যয়ী ছেলেটির স্বপ্ন বুনন শুরু হয় তখন। পড়ালেখার পাশাপাশি বাবার সঙ্গে কৃষিকাজে সম্পৃক্ত হন। সে সময় পেয়ারা ও পেঁপেসহ নানা ফল চাষ শুরু করেন। বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দূর্যোগে তার ফলের বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দমে যাননি তিনি। নতুন করে সাহস সঞ্চয় করে ঝুঁকি নিয়েছেন, ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।

বাগাতিপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মমরেজ আলী বলেন, লাখ টাকা বিনিয়োগ করে শুরু করা থাই পেয়ারা, কমলা, মাল্টা, কাশ্মীরি কুল ও গোড়মতি আমের চাষি এখন কোটি টাকার মালিক। ছয় বিঘা দিয়ে শুরু করা বাগান এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫০ বিঘায়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মৃত্তিকা পরীক্ষাগার থেকে মাটি পরীক্ষা করে তিনি চাষাবাদ শুরু করেন। কীটনাশক ছাড়া থাই পেয়ারা, কমলা, মাল্টা, কাশ্মীরি কুল ও গোড়মতি আম চাষ করছেন তিনি।

প্রতিবেশী ও সমাজসেবী মহিদুল ইসলাম মনি বলেন, নিজের পাশাপাশি এলাকার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান করছেন বারী। তার ফলের বাগানে শতাধিক শ্রমিক নিয়মিত কাজ করে। নিজস্ব জমির পরিমাণ কম হলেও প্রতি বিঘা আট থেকে ১২ হাজার টাকায় লিজ নিয়ে তিনি নিজ এলাকার পাশাপাশি লালপুর, রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার প্রায় ৩০০ বিঘা জমিতে ফল চাষ সম্প্রসারণ করেছেন।

পেয়ারা বাগানের শ্রমিক সর্দার মাসুম রেজা ও মানিক চন্দ জানান, বারী ভাই পেয়ারা চাষ শুরু করায় আমরা নিয়মিত কাজ করতে পারছি। এ পারিশ্রমিক দিয়ে নিজ ও পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে সংসারের ভরণপোষণ করছি।

বাগাতিপাড়ার সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তš§য় কুমার দাস ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুব্রত কুমার সরকারের অনুপ্রেরণায় বারী থাই পেয়ারা চাষ শুরু করেছেন বলে জানান। শুরুতে তিনি পুঠিয়ার এক চাষির কাছ থেকে থাই পেয়ারার চারা নিয়ে বাগান করেন। কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা পেলে ভবিষ্যতে পেয়ারার বাগান সম্প্রসারণের পাশাপশি ড্রাগন, শরিফা, হাইব্রিড নারকেলসহ উন্নত ফলের চাষ করতে চান। তিনি দাবি করেন, কীটনাশক ছাড়া পেয়ারা চাষ করতে পলিথিনের ব্যাগ প্রয়োজন। তবে আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় নানা সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। থাই পেয়ারা, কমলা, মাল্টা, কাশ্মীরি কুল ও গোড়মতি আমের চাষের মতো অন্য পুষ্টিকর ফল কীটনাশকের বিষক্রিয়া থেকে রক্ষা করতে সরকারিভাবে পলিথিনের বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে সমস্যা উত্তরণে কার্যকর পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রিয়াংকা দেবী পাল বলেন, আব্দুল বারী বাকী একজন সফল চাষি বলা যায়। তার ঋণ সুবিধা পাওয়ার জন্য রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তিনি অন্য ফলের চাষ করতে চাইলে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা করা হবে জানান তিনি।

স্থানীয় সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বকুল এ ফলের বাগান পরিদর্শন করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বারীসহ নির্বাচনী এলাকার যে কোনো উদ্যোক্তা আমাকে সবসময় পাশে পাবেন। তাদের যেকোনো সমস্যা সমাধানে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেব।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..