সুশিক্ষা

কুবির প্রথম সমাবর্তনে মেতেছিল পুরো ক্যাম্পাস

‘সমাবর্তন’ শব্দটি সামনে এলেই মনের কোণে উঁকি দেয় শিক্ষাজীবনের বিশেষ দিনটির কথা। শিক্ষাজীবনের মূল পর্ব শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে প্রবেশের মাধ্যমে এবং এর সমাপ্তি ঘটে সমাবর্তনে। সমাবর্তন মানে একসঙ্গে মিলিত হওয়া, কিংবা শিক্ষার্থীদের উপাধি বিতরণের সভা। স্বাভাবিকভাবে এ দিনটি হওয়ার কথা বেদনার ও কষ্টের। কারণ সমাবর্তনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। চারটি বছরের

হাসি-কান্নামিশ্রিত দিনগুলোর বেদনাদায়ক বিদায় মুহূর্ত সামনে চলে আসে এদিন। কিন্তু এ দিনটিতে সব গ্র্যাজুয়েট গায়ে কালো গাউন ও মাথায় কালো ক্যাপ পরে হইহুল্লোড় করেন, আনন্দে মেতে ওঠেন। কে কতভাবে তাদের আনন্দ অন্যকে জানাতে পারেন, সে মহোৎসবে মেতে ওঠেন সবাই।

মোদ্দাকথা, সমাবর্তনের মধ্য দিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন শেষে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানানো হয়। সারাজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক অর্জনকে বরণ করে নেওয়ার দিন এটি। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী হন, ফলে সবার মধ্যে বাঁধভাঙা আনন্দ বিরাজ করে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ছিল ২৭ জানুয়ারি এমন একটি স্মৃতিবিজড়িত দিন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৪ বছর পর এদিন অনুষ্ঠিত হয় প্রথম সমাবর্তন। এ উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রথম থেকে ষষ্ঠ ব্যাচ পর্যন্ত যারা স্নাতক ও প্রথম থেকে অষ্টম ব্যাচ পর্যন্ত যারা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন, তাদের মধ্যে দুই হাজার ৮৮৮ গ্র্যাজুয়েট এ সমাবর্তনের জন্য নিবন্ধন করেন। সমাবর্তনের তিন দিন আগে শুরু হয় গাউন, ক্যাপ ও অন্যান্য উপহার সামগ্রী বিতরণ। সমাবর্তনের দিনে তাই কালো গাউন গায়ে জড়িয়েই সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন ফটোসেশনে।

২৪ জানুয়ারি থেকে গাউন বিতরণ শুরু হয়। অনেকে সেদিনই গাউন ও ক্যাপ সংগ্রহ করে গায়ে জড়িয়ে আনন্দ, উল্লাস ও হইহুল্লোড়ে মেতে ওঠেন। বিভাগের সামনে থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ঢঙে ক্যামেরার ফ্রেমবন্দি হন গ্র্যাজুয়েটরা। সবার মধ্যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ছিল। ছোট-বড় গ্রুপে বিভক্ত হয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করেন ডিগ্রিধারীরা। শুধু গ্র্যাজুয়েটরা নয়, এ আনন্দে যুক্ত হন জুনিয়র শিক্ষার্থীরাও। পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে যেন এক আনন্দমেলা বসে। সমাবর্তন ঘিরে ক্যাম্পাসকে সাজানো হয় বর্ণিল সাজে। ব্যানার-ফ্যাস্টুনসহ নানা সাজে সজ্জিত করা হয় পুরো ক্যাম্পাসকে।

ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর মধ্যে শহিদ মিনার, মুক্তমঞ্চ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যের সামনে, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, কাঁঠালতলা, গোলচত্বর, বাবুই চত্বর, বিভিন্ন অনুষদ ভবনের সামনে, প্রশাসনিক ভবনের সামনের স্থানসহ ক্যাম্পাসের সব স্থানকে ফ্রেমে বন্দি করে রাখেন শিক্ষার্থীরা। গ্র্যাজুয়েটরা তাদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানে ক্যাম্পাসের শেষ মুহূর্তকে ধারণ করে রাখার আয়োজন শুরু করেন ২৪ জানুয়ারি থেকেই।

নৃবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক সম্পন্ন করা সাইফুল ইসলাম পলাশ তার বন্ধুদের নিয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ছবি তুলছিলেন। একেক জনের কী উচ্ছ্বাস! সবার মুখে যেন এক অপার অনন্দ।

গণিত বিভাগের ষষ্ঠ ব্যাচের শিক্ষার্থী মাহিনুর আক্তার তার বাবা, মা ও সন্তানকে নিয়ে ক্যাম্পাসে এসে গাউন গায়ে জড়িয়ে ছবি তুলছিলেন। তার চোখের কোনা বেয়ে ঝরছিল আনন্দাশ্রু। চোখে-মুখে ছিল উচ্ছ্বাস। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত এটি। আজ আমি এ বিশ্ববিদ্যালয় ও বাবা-মায়ের একজন গর্বিত গ্র্যাজুয়েট।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট দম্পতিদের উচ্ছ্বাস যেন একটু বেশিই ছিল। অনেকে পড়ালেখা সম্পন্ন করার দীর্ঘ সময় পরে ক্যাম্পাসে আসেন সমাবর্তন উপলক্ষে। তাদের মধ্যে অনেকেরই ঘটেছে পরিণয়। বেঁধেছেন ঘর। তাই সমাবর্তনে ক্যাম্পাসে এসে ছবির ফ্রেমে বন্দি করে নেন নিজেদের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী আহসান হাবিব ও একই ব্যাচের নাজনিন আক্তার ক্যাম্পাস জীবনের স্মৃতিবিজড়িত দিনগুলোর কথা উল্লেখ করে বলেন, এ ক্যাম্পাসের সঙ্গে রয়েছে আমাদের এক অপার ভালোবাসা। এতদিন পর সেই পুরোনো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। সমাবর্তন যেন আমাদের সেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের উল্লসিত দিনগুলোয় ফিরিয়ে এনেছে।

সবাই একসঙ্গে মাথার ক্যাপ খুলে ছুড়ে মারলেন আকাশের দিকে। সেই টুপি ধরতে লাফ দিলেন কেউ কেউ। সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরাবন্দি হয়ে যায় মুহূর্তটি। দৃশ্যটি সমাবর্তনের একটি চিরচেনা মুহূর্ত।

সমাবর্তনের দিন সবার আগমনে ক্যাম্পাস প্রাণচঞ্চল ও আলোড়িত হয়ে ওঠে। ২৭ জানুয়ারি বিকালে অনুষ্ঠিত হয় সমাবর্তনের আনুষ্ঠানিক পর্ব। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিগ্রি তুলে দেন। সমাবর্তনের মধ্য দিয়েই সার্থক হয় ডিগ্রিধারী গ্র্যাজুয়েটদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন।

  মো. জাহিদুল ইসলাম

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..