মত-বিশ্লেষণ

কৃষকবান্ধব নীতি শস্যের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে

মো. কামরুল ইসলাম ভূইয়া: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষিকে অগ্রাধিকারভুক্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি সবুজ বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন এবং বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদ কৌশল প্রবর্তনের মাধ্যমে টেকসই কৃষির যাত্রার সূচনা করেছিলেন। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুজ্জীবিত করার মধ্য দিয়ে কৃষি গবেষণার নবদিগন্ত উম্মোচিত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার কৃষিবান্ধব নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসার শুরুত্বেই কৃষক ও কৃষি সমৃদ্ধির জন্য রূপকল্প-২০২১, পঞ্চবার্ষিক কর্মপরিকল্পনা ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এসব উদ্যোগ ও গৃহীত কার্যক্রমের ফলে খাদ্য উৎপাদনে ধারবাহিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বজায় রাখা, বিভিন্ন ফসলের উন্নত ও প্রতিক‚লতা-সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন, নতুন শস্যবিন্যাস উদ্ভাবন, পানিসাশ্রয়ী সেচ পদ্ধতি, ভ‚-উপরিস্থিত পানির ব্যবহার বৃদ্ধি, কৃষিপণ্যের বহুমুখী ব্যবহার ও ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।

কৃষকবান্ধব নীতির ফলে খাদ্যশস্যের উৎপাদন প্রতিবছরই ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে ইন্দোনেশিয়াকে টপকে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। এছাড়া পাট রপ্তানিতে প্রথম, পাট ও কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, আলু ও আম উৎপাদনে সপ্তম ও পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে রয়েছে। ২০০৮-০৯ সালে যেখানে মোট খাদ্যশস্য (চাল, গম ও ভুট্টা) উৎপাদন ছিল তিন কোটি ২৮ লাখ ৯৬ হাজার মেট্রিক টন, সেখানে ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা বেড়ে চার কোটি ৫৩ লাখ ৪৩ হাজার মেট্রিক টন হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রে, যেমন আলু ৫২ লাখ ৬৮ হাজার মেট্রিক টন থেকে ১০৯ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন, ভুট্টা সাত লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন থেকে ৫৪ লাখ দুই হাজার মেট্রিক টন, শাকসবজি ২৯ লাখ ৯ হাজার মেট্রিক টন থেকে এক কোটি ৮৪ লাখ ৪৭ হাজার মেট্রিক টন এবং পেঁয়াজ সাত লাখ ৩৬ হাজার থেকে ২৫ লাখ ৫৭ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে।

সরকার সারের দাম হ্রাস করে যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করে। সারের মূল্য চার দফায় কমিয়ে প্রতি কেজি টিএসপি ৮০ টাকা থেকে ২২ টাকা, এমওপি ৭০ টাকা থেকে ১৫ টাকা, ডিএপি ৯০ টাকা থেকে ১৬ টাকা করা হয়েছে। ফলে কৃষক স্বল্পমূল্যে সার ক্রয় করতে পারছে। ২০০৯-১০ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত সার, বিদ্যুৎ, ইক্ষু ও ডিজেল ইত্যাদি খাতে মোট ৭৫ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদান করেছে সরকার।

সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কৃষিকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কৃষকদের কৃষিযন্ত্রের ক্রয়মূল্যের ওপর ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ উন্নয়ন সহায়তার মাধ্যমে হ্রাসকৃত মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হচ্ছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬৯ হাজার ৮৬৮টি কম্বাইন হারভেস্টর, রিপার, সিডার, পাওয়ার টিলারসহ কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে।

বন্যা, খরা, শিলাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি ঘূর্ণিঝড়, উজানের ঢল, পাহাড়ি ঢল প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবং বিশেষ বিশেষ ফসল চাষাবাদে উদ্বুদ্ধকরণে ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত এক হাজার ৩০ কোটি ৬৬ লাখ টাকা কৃষি পুনর্বাসন/প্রণোদনা প্রদান করা হয়েছে। কৃষকদের মাঝে কৃষি উপকরণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য কৃষক পরিবারকে দুই কোটি পাঁচ লাখ ৪৪ হাজার ২০৮টি কৃষি উপকরণ কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া কৃষি উপকরণ কার্ডের মাধ্যমে খোলা সচল ১০ টাকার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ৯৭ লাখ ৩৭ হাজার ৪৮টি।

গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন উচ্চফলনশীল ও প্রতিক‚লতা-সহিষ্ণু উন্নতমানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত আছে। ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে এ পর্যন্ত ৩৭১টি জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। এর মধ্যে ধানের ৬৭টি, গমের ১০টি, ভুট্টার ছয়টি, তুলার ১০টি, ইক্ষু ও সুগারবিটের ৫৫টি, পাটের ১০টি ও আলুর ৪৯টি জাত অন্যতম। প্রতিক‚লতা-সহিষ্ণু ধানের জাতের মধ্যে রয়েছে লবণাক্ততা-সহনশীল ১৩টি, জলমগ্নতা-সহিষ্ণু ছয়টি ও খরাসহিষ্ণু ১০টি জাত।

কভিড-১৯-এর প্রতিক‚লতা মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ফুল ও ফল চাষ, মৎস্য চাষ এবং ডেইরি ও পোলট্রি খাতে চার শতাংশ সুদে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনার স্কিম গঠন করা হয়। এ ছাড়া ফসল খাতে ঋণ বিতরণের জন্য ৯ শতাংশ থেকে হ্রাস করে চার শতাংশ রেয়াতি সুদে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা কৃষিঋণ প্রদানের তহবিল গঠন করা হয়। সেচ কাজে ব্যবহার করা বিদ্যুৎ বিলে ২০ শতাংশ হারে রিবেট দেয়া হচ্ছে। মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে বিএডিসির ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত সেচ যন্ত্রগুলোর সেচ চার্জ ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..