প্রচ্ছদ সাক্ষাৎকার

কৃষক কষ্ট করে ফসল ফলায় মুনাফা খায় মধ্যস্বত্বভোগী

সা ক্ষা ৎ কা র : খান আলতাফ হোসেন ভুলু

কৃষক লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য খান আলতাফ হোসেন ভুলু। বর্তমানে তিনি সংগঠনটির সিনিয়র সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। শুরু থেকেই কৃষক লীগের সঙ্গে থাকা প্রবীণ এ আইনজীবী আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন কৃষক লীগের গঠন, কৃষি-কৃষক নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাবনা ও কৃষকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন শেয়ার বিজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শরিফুল ইসলাম পলাশ

শেয়ার বিজ: কৃষক লীগের সূচনার প্রেক্ষাপট দিয়ে শুরু করতে চাই…

খান আলতাফ হোসেন ভুলু: ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এ ঘোষণার পরপরই পাকিস্তানের সেনা শাসক ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ২৬ মার্চ থেকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের কৃষক মুক্তিযোদ্ধাদের বাসস্থান আর খাদ্য দিয়ে সাহায্য করে। বাংলাদেশের লাখ লাখ কৃষক পরিবারের যুবক সন্তান বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অস্ত্র ধারণ করে। সবাই মিলে ৯ মাসের মধ্যে  দেশকে স্বাধীন করে। পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে বঙ্গবন্ধুকে জীবিত ফেরত আনার জন্য ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সারা বিশ্বে জনমত সৃষ্টি করেন। ইন্দিরা গান্ধীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে জীবিত অবস্থায় স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

শেয়ার বিজ: কৃষক লীগ গঠন করা হয়েছিল কবে, কীভাবে?

খান আলতাফ হোসেন ভুলু: বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসার পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় বক্তৃতাকালে বলেন, ‘এই বাংলাদেশের কৃষক আমার মুক্তিযোদ্ধাদের বাসস্থান দিয়েছে। তাদের খাদ্য সরবরাহ করেছে। বাংলাদেশের কৃষক পরিবারের যুবকরা অস্ত্র ধারণ করে মাত্র ৯ মাসে  দেশকে স্বাধীন করেছে। আমি এদেশের কৃষকদের জন্য কিছু করতে চাই।’ বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার মাত্র দুই মাসের মধ্যে ১৯৭২ সালের ১৯ এপ্রিল বাংলাদেশে কৃষক লীগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। কৃষক লীগ প্রতিষ্ঠার সময় তৎকালীন মন্ত্রী শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত, ব্যারিস্টার বাদল রশীদ, একসময়ের ছাত্রলীগ প্রেসিডেন্ট ও পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রউফ, শেখ ফজলুল হক মনি, মরহুম আবদুর রাজ্জাক, ফনিভূষণ মজুমদার, যশোরের সোহবার হোসেন, বরিশালের ডা. মোখলেছুর রহমান এবং সর্বকনিষ্ঠ আমাকেসহ ১১ সদস্য নিয়ে সেদিন কৃষক লীগের প্রথম কমিটি গঠন করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ও তার নেতৃত্বে।

শেয়ার বিজ: কৃষক লীগ গঠনকালে বঙ্গবন্ধু কৃষককে কোন কোন সুবিধা দেওয়ার কথা বলেছিলেন?

খান আলতাফ হোসেন ভুলু: কৃষকের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে বাকেরগঞ্জে কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সে সম্মেলনে ব্যারিস্টার বাদল রশীদকে প্রেসিডেন্ট ও আবদুর রউফকে সেক্রেটারি করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। সেখানে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, ‘আমি এই কৃষকের জন্য কিছু করতে চাই। বাংলাদেশের অর্থনীতি হবে কৃষিভিত্তিক। দেশের এক ইঞ্চি জমিও খালি রাখা যাবে না।’ এ ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধু আরও বলেন, ‘খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে সার দেওয়া হবে। নামমাত্র মূল্যে কীটনাশক দেওয়া হবে। জমিতে পানি সেচের জন্য ডিপ টিউবওয়েল দেওয়া হবে।’ জমির একটি সিলিং করে দিয়ে তিনি আরও বললেন, ‘এক পরিবারের ২৫ বিঘার ওপরে কোনো জমি থাকতে পারবে না। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা চিরদিনের জন্য মওকুফ করে দেওয়া হলো। সে সঙ্গে দেশের প্রত্যেক ভূমিহীন কৃষককে দেড় একর করে জমি দেওয়া হবে।’

শেয়ার বিজ: কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু বলুন…

খান আলতাফ হোসেন ভুলু: এভাবেই বঙ্গবন্ধু কৃষকের জন্য এক বিশাল পরিকল্পনা নিলেন। কৃষকরাও বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুসারে অধিক ফলন ফলানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করে। ছাত্রসমাজ ও আওয়ামী লীগের মন্ত্রিপরিষদ, স্কুলশিক্ষক এবং নেতাকর্মী সবাই মিলে যেখানেই খালি জায়গা ছিল, সেখানেই আমরা ফসল উৎপাদন করেছি। তৎকালীন সময়ে রাস্তা বেশি ছিল না। যেখানেই রাস্তা ছিল, সেখানেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমরা রাস্তার দুই ধারে গাছ লাগিয়েছি। আমি যখন বিএম কলেজের ভিপি, তখন কলেজে বিশাল মাঠ ছিল; সেই মাঠে আমরা ধান চাষ করেছি। প্রচুর ধান হয়েছে। এ রকম শুধু বিএম কলেজ মাঠেই নয়, সারা দেশের সব স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দির ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে ছাত্র-শিক্ষক সমাজ চাষাবাদ করেছে। অনেকে দালানের ছাদে মাটি দিয়ে সেখানে ধান চাষ করেছেন। সারা দেশেই এমনি করে কৃষি বিপ্লব শুরু হয়। মাত্র দুবছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছিল। আজ আমরা ছাদকৃষি দেখি, তখন ছাদকৃষি ছিল না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তখনও অনেকে ছাদে ধান চাষ করেছেন। সেদিনের ছোট ছোট দালানের ওপর ধান চাষ থেকেই আজকের ছাদকৃষির শুরু বলে আমার মনে হয়। এটিও বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনারই ফসল।

শেয়ার বিজ: কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় কৃষক লীগ কীভাবে কাজ করছে?

খান আলতাফ হোসেন ভুলু: কৃষক লীগ আজ সারা দেশে কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে। কৃষকের স্বার্থে আমরা যেসব দাবি করি, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বঙ্গবন্ধুর পথ অনুসরণ করে কৃষকদের তারচেয়েও বেশি দিচ্ছেন। যেখানে যা দরকার দেওয়া হচ্ছে। কৃষকের চাহিদা সরকার পূরণ করছে। যে কারণে স্বাধীনতার পর সাড়ে সাত কোটির বদলে এখন ১৮ কোটি জনসংখ্যা হলেও আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। শুধু ধানই নয়, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল ও মাছÑসবকিছুতেই আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। এর পেছনে কৃষক লীগের অবদান আছে। তবে সবচেয়ে বড় অবদান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। যে কারণে বাংলাদেশের কৃষক শেখ হাসিনার ওপর ভীষণভাবে খুশি। বাংলাদেশের ভোটারদের ৮০ ভাগই কৃষক; তারা প্রত্যেক নির্বাচনেই তাদের পবিত্র ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করেন। দেশের কোটি কোটি কৃষক আজ আওয়ামী লীগের পক্ষে, শেখ হাসিনার পক্ষে।

শেয়ার বিজ: কৃষক লীগের আগামী দিনের মূল দাবিগুলো কী হবে?

খান আলতাফ হোসেন ভুলু: কৃষক ধান-আলুসহ অন্যান্য ফসলের নায্যমূল্য পায় না। তারা কষ্ট করে ফসল ফলায়; কিন্তু সেই ফসলের মুনাফা খায় মধ্যস্বত্বভোগীরা। এজন্য মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে যাতে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেজন্য আইন প্রণয়নের জন্য আমরা কৃষক লীগের পক্ষ থেকে দাবি জানাচ্ছি। আমরা এর আগে যেসব দাবি তুলেছি, সেগুলো গুরুত্বসহকারে নেওয়া হয়েছে। কখনও কখনও কৃষকের স্বার্থে আমরা যা চেয়েছি, তার চেয়েও বেশি দেওয়া হয়েছে।

শেয়ার বিজ: চলমান ক্যাসিনো-দুর্নীতিবিরোধী অভিযান আপনি কীভাবে দেখেন?

খান আলতাফ হোসেন ভুলু: চলমান ক্যাসিনো-দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রতি গণমানুষের সমর্থন রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে জি কে শামীম ও খালেদসহ আরও অনেকের মুখোশ উšে§াচিত হচ্ছে। আমি মনে করি, যারা বিভিন্ন সময়ে বাইরে থেকে আওয়ামী লীগে ঢুকেছে, তারাই লুটপাট করছে। বহিরাগতরাই বাংলাদেশের দুর্নাম করছে। আর তার দায় আওয়ামী লীগকে নিতে হচ্ছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না। তাই এ অভিযানকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। বহিরাগত ও ক্লিন ইমেজ ছাড়া যত স্বার্থান্বেষী মহল আছে, যারাই দুর্নীতি-টেন্ডারবাজির সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

শেয়ার বিজ: এ অভিযানকে আপনি কতটা চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করেন?

খান আলতাফ হোসেন ভুলু: এটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এক কাজ। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একইভাবে লড়াই শুরু করেছিলেন। তবে এখন সে সময় নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ষড়যন্ত্রকারীরা পরাস্ত হবে। দেশের সাধারণ মানুষ প্রধানমন্ত্রীর পাশে আছে।

শেয়ার বিজ: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

খান আলতাফ হোসেন ভুলু: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সর্বশেষ..