মত-বিশ্লেষণ

কৃষক মর্জিনা খাতুনের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

শামীমা চৌধুরী: পরিবার ছাড়াও এখন গ্রাম, উপজেলা-জেলায় তার বিশেষ মর্যাদা। এলাকার যে কোনো উন্নয়নমূলক কাজে সবাই তার পরামর্শ চায়। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তাকে ডাকা হয়। রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে সবাই একটু সরে দাঁড়িয়ে সালাম জানায়। এই সম্মানে তার চোখে নেমে আসে আনন্দাশ্রু। অনেক কষ্ট আর সংগ্রামের পর তিনি পেয়েছেন এই সম্মান।

গল্পটি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মহেশ্বরচাদা গ্রামের নারী কৃষক মর্জিনা খাতুনকে নিয়ে। এলাকায় কৃষিতে বিশেষ অবদানের জন্য পেয়েছেন ‘বঙ্গবন্ধু কৃষিপদক ২০১৭’। তার বাবা ওমর আলী দরিদ্র কৃষি শ্রমিক। ভিটেবাড়ি আর সামান্য জমি এই তার সম্বল। মাত্র ১৫ বছর বয়সে মেয়ের বিয়ে দেন। কিন্তু যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় তার মেয়ের ওপর চলতে থাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। শেষাবধি দুই সন্তানসহ তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বাবার বাড়ি। এখানে এসে মর্জিনা বুঝতে পারে কারও বোঝা হয়ে নয়, এবার তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। বাবার বাড়ির আঙিনায় প্রথমে সবজি চাষ করে বিক্রি করতেন।  এতে করে সংসারের অভাব দূর হতো না। পরে গ্রামের আরও কয়েকজন নারীর সঙ্গে ‘হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ড’ নামের প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় কেঁচো চাষের প্রশিক্ষণ নেন তিনি। ‘হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ড’ নামের এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান লক্ষ্য বিষমুক্ত সবজি চাষ। এখন মর্জিনা তার ৭০০ চৌবাচ্চায় কেঁচো সার তৈরি করেন। প্রতি মাসে প্রায় ৪ টন সার বিক্রি করেন, যার বাজারদর প্রায় ৮০ হাজার টাকা। এই সার বিক্রি করে তার মাসে ৩০-৩৫ হাজার টাকা আয় হয়। ছেলেমেয়ের পড়ার খরচ এবং প্রতিদিনের খরচ চালিয়ে বেশ কিছু টাকা জমাও করতে পারছেন। বাড়িতে নতুন টিনের ঘর তুলেছেন। পাশাপাশি সবজি চাষের কাজও করছেন তিনি। শুধু মর্জিনা খাতুন নন, এই গ্রামের আরও অনেক নারীর ভাগ্যের বদল ঘটেছে কেঁচো সার উৎপাদন করে। ‘যৌতুকের জন্যি স্বামী খেদায়ে দেল। যহন পুলাপান দুডোর হাত ধরি বাপের বাড়িত এসেছিলাম, তখন জেবন ছিল আনধার। আমার সার তৈরির কাজ আমারে এতো সম্মান আনি দেল। যেদিন পুরস্কার পালাম সেইনিডা আমার কাছে সপনের মতো। অহন সকল দুঃখ ভুইলে গেছি। আজ আমি সুখী। এই সবই হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্যি। আমি তেনার ওপর বেজায় খুশি। আমি আমার এই কাজ আরও বড় করবো। যাতে অনেক মেইয়েরা এখানে কাম করার সুযোগ পায়। আমার লোকজনের বেতন বাড়ানো দরকার।’ কথাগুলো বলে চোখ মুছেন মর্জিনা খাতুন।

‘হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ড’-এর কর্মসূচি বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এসএম শাহিন হোসেন জানালেন, ‘২০১১ সাল থেকে এই এলাকায় বিষমুক্ত সবজি চাষ শুরু হয়। এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে আমরা গ্রামের অসহায় দরিদ্র নারীদের কেঁচো ও বালাইনাশক তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ শুরু করি। প্রত্যেকে প্রশিক্ষণের সময় যথেষ্ট পরিশ্রম করেছে; যা আজ মর্জিনার মতো অনেক নারীর ভাগ্য বদলে দিয়েছে। তারা সবাই নিজেদের ভাগ্য বদলাতে চায়।’

বর্তমান সরকার জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে ১০টি বিশেষ উন্নয়ন উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এর অন্যতম একটি নারীর ক্ষমতায়ন। শিক্ষা ও কর্মে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ করে নারীর প্রতি সব বৈষম্যের অবসান ঘটানো সরকারের লক্ষ্য। তাই উন্নয়নের মূলস্রোতে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য গ্রাম পর্যায়ের নারীদের দেওয়া হচ্ছে নানা সুযোগ। এর মধ্যে গুরুত্ব পাচ্ছে কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণের বিষয়টি।

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি নারী শ্রম। বীজ সংরক্ষণ, বীজ বপন, সেচ ও সার দেওয়া, ফসল উত্তোলন, ফসল মাড়াই, ফসল ঘরে তোলা, সংরক্ষণ, বিক্রি-ফসল উৎপাদনের অধিকাংশ ধাপেই নারীর সরাসরি অংশগ্রহণ রয়েছে। বাংলাদেশের নারীরা কখনও নিজের জমিতে কৃষক হিসেবে কাজ করেন, পারিবারিক কৃষি খামারে বিনা বেতনে কাজ আবার কখনও অন্যের জমিতে অর্থের বিনিময়ে অথবা বিনা বেতনে কাজ করে থাকেন। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বে কৃষিতে নারীদের তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রয়েছে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের মতে, নারী শ্রম শক্তির ৬৮ শতাংশই কৃষি, বনায়ন ও মৎস্য খাতের সঙ্গে জড়িত। বলা চলে, কৃষি ও এর উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে নারী। নারীর টিকে থাকার লড়াই বদলে দিচ্ছে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির চরিত্র। শ্রম শক্তি জরিপ অনুযায়ী দেশের ১ কোটি ২০ লাখ নারী শ্রমিকের মধ্যে ৭৭ শতাংশ গ্রামীণ নারী যারা কৃষি-সংক্রান্ত কাজে জড়িত। গত এক দশকের ব্যবধানে কৃষিকাজে প্রত্যক্ষভাবে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ বেড়েছে ১০ দশমিক ১৪ শতাংশ। ২০০১ সালের জরিপ অনুযায়ী, কৃষিকাজে নারীর অংশগ্রহণ ছিল মোট শ্রমশক্তির মাত্র ৪ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। আর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০-৭০ শতাংশে। জীবন-জীবিকার তাগিদে গ্রামীণ নারী যোগ দিচ্ছে কৃষিকাজ, ব্যবসা বা চাকরিতে। সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচি, ক্ষুদ্রঋণ ও কৃষিব্যবস্থায় পরিবর্তনশীলতা একে আরও ত্বরান্বিত করছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে ৭০ শতাংশের বেশি ভূমিহীন নারী কৃষিকাজে জড়িত। বলা চলে, কৃষি ও এর উপখাতের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে নারী। পারিবারিক ভাঙন, সমাজে স্বামী পরিত্যক্ত ও বিধবা নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি ন্যূনতম প্রশিক্ষণহীন এক নারীকে কৃষিজীবী নারীতে পরিণত করছে প্রতিদিন।  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের  উল্লিখিত  গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কোনো দায়িত্বশীল পুরুষ ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে দেশের উত্তরাঞ্চলের নারীপ্রধান ৫৮ শতাংশ পরিবার। বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, বিধবার হার উত্তরবঙ্গে সর্বোচ্চ। ফলে এ অঞ্চলের জেলাগুলোয় নারীপ্রধান পরিবারের আধিক্য রয়েছে।

আর ৭২ শতাংশ পরিবারের নারীপ্রধানের বয়স ৩০ থেকে ৪৯ বছর। আবার পরিবারপ্রধান হওয়ার পর ৯০ শতাংশ নারীর পেশা পরিবর্তন হচ্ছে, যারা আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে নিজেদের নিয়োজিত করছেন। পেশা পরিবর্তনে অগ্রাধিকার পাচ্ছে বসতবাড়িকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা কৃষিকাজ। উত্তরাঞ্চলের ৬৫ শতাংশ পরিবার প্রধান নারী এখন এ দুটি খাতে কাজ করছেন। পরিবর্তিত গ্রামীণ অর্থনীতির কারণে কৃষিক্ষেত্রে অধিকসংখ্যক নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো।

কৃষিকাজে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ার ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন জেলায় বৈষম্য রয়েছে। এখনও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। তবে অগ্রগতি হয়েছে উত্তরবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলায়-বিশেষ করে রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট। এছাড়া কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও রাজধানীর আশপাশের জেলাগুলোয় কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাব মতে, নারীরা যদি উৎপাদনের জন্য সম্পদ পুরুষের সমপরিমাণ পেত, তাহলে তারা তাদের জমিতে ২০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি উৎপাদন করতে পারত। এতে করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কৃষি উৎপাদন আরও ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেত; যার ফলে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ১০০ থেকে ১৫০ মিলিয়ন কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।

বাংলাদেশের জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১তে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীদের কাজের স্বীকৃতির কথা বলা হয়েছে, কিন্তু আমাদের নারী কৃষি শ্রমিকরা এখনও আইনগত স্বীকৃতি পাননি। এত কাজ করার পরও নারীর কাজকে কাজ হিসেবে গণ্য করা হয় না। তবে তৃণমূলে খেটে-খাওয়া নারীশ্রমিকদের কল্যাণে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে দিন দিন এ পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। ফলে আমরা পাচ্ছি মর্জিনা খাতুনের মতো কেঁচো সার উৎপাদনকারী সব নারী উদ্যোক্তা।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..