প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

কৃষিঋণের সুফল পাক উপযুক্ত কৃষকরা

গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘কৃষিঋণে খেলাপি ৫ হাজার ১১২ কোটি টাকা’ শিরোনামের খবরটি অনেক পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে। সেখানে অন্যান্য খাতের মতো কৃষি খাতেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে বলে উল্লেখ করে আমাদের প্রতিবেদক জানিয়েছেন, খাতটিতে গত অর্থবছরের একই সময়ে খেলাপি ঋণ ছিল চার হাজার ৫৩০ কোটি টাকার কাছাকাছি। এক বছরে কৃষি খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৫৮৩ কোটি টাকার মতো। প্রশ্ন হলো, এর কারণ কী? খেয়াল করা দরকার, একসময় কৃষিঋণ বিতরণে তেমন আগ্রহ দেখাত না স্থানীয়ভাবে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বেসরকারি ও বিদেশি অনেক ব্যাংক। তাদের যুক্তি ছিল, কৃষিঋণ বিতরণ ঝামেলার; তদুপরি ‘তেমন লাভজনক নয়’। তখন কৃষিঋণ বিতরণে প্রধান ভ‚মিকা রাখত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। এখনও এরাই মোট বিতরণকৃত কৃষিঋণের প্রধান উৎস। তবে ২০১১ সাল থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারিকৃত সার্কুলারের কারণে অন্যান্য ব্যাংকও এগিয়ে এসেছে কৃষিঋণ বিতরণে। ওই সার্কুলারে বলা হয়, ব্যাংকের মোট ঋণের অন্তত আড়াই শতাংশ কৃষিতে বিতরণ করতে হবে এবং কোনো ব্যাংক নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে ওই অংশের অর্থ পরবর্তী এক বছর জমা রাখতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকে। এ বিধানে পরে কিছুটা শিথিলতা আনা হলেও বলার অপেক্ষা রাখে না, কৃষিতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির এটি অন্যতম কারণ। দ্বিতীয় বিষয়, আকস্মিক ও মৌসুমী বন্যায় চলতি বছর বিশেষত ধান উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয় কয়েক দফায়। তার প্রভাব সারা দেশের চালের বাজারে আমরা লক্ষ করছি। এ পরিপ্রেক্ষিতে চাল আমদানি বৃদ্ধিসহ কৃষি খাতে সহজ শর্তে প্রয়োজনীয় ঋণ বিতরণের পরামর্শ দেওয়া হয় বিভিন্ন পক্ষ থেকে। খাতটিতে খেলাপি ঋণ বেড়ে ওঠার পেছনে এরও ভ‚মিকা রয়েছে, সন্দেহ নেই। এমন পরিস্থিতিতে কেউ কেউ বলছেন, কৃষিতে ঋণ বিতরণ অতীতের তুলনায় বাস্তবায়নগত দিক দিয়ে বেড়েছে। কারও কারও মতে, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় চলতি বছর কৃষিতে খেলাপি ঋণ বেড়ে উঠতে পারে, তবে তার অর্ধেকই এক অর্থে অবাস্তব। কোনো যুক্তিই উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

এমন পর্যবেক্ষণ ইতিবাচক যে, কৃষিঋণের গুণগত মান বেড়েছে। তবে এ দৈনিকের কাছে দেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদের মন্তব্যটি উদ্বেগজনক‘কিছু অসাধু ব্যাংক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী যোগসাজশ করে কৃষকদের ফাঁসায়। কৃষিঋণের নামে বড় বড় কোল্ডস্টোরেজকে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। এসব বন্ধ করতে হবে।’ ওই ধরনের কিছু ঋণ ছাড় হয়েছে বৈকি। তার পরিমাণ হয়তো শিল্প বা অন্যান্য খাতের তুলনায় কিছুই নয়। তারপরও বিতরণের বেলায় কৃষিঋণ যেন প্রকৃত ও উপযুক্ত কৃষকরাই পান, সেদিকে জোর দিতে বলব আমরা। কেননা প্রথমত, প্রকৃত ও উপযুক্ত কৃষকরা ঋণ পেলে তার সুফল অর্থনীতি পায় সরাসরি এবং এটি কৃষিঋণ বিতরণের মুখ্য উদ্দেশ্য। দ্বিতীয় কথা, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ছাড়া কৃষিঋণ বিতরণে অন্যান্য ব্যাংকের উৎসাহ কম এখনও। অভিযোগ রয়েছে, তাদের বেশিরভাগই ওই ঋণ বিতরণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের চাপে। এ অবস্থায় একশ্রেণির কোল্ডস্টোরেজ মালিকসহ অন্যান্য অনুপযুক্ত ব্যক্তির হাতে কৃষিঋণ গেলে ক্ষতি হয় উপযুক্ত কৃষকদেরই। তাই বিষয়টিতে নজরদারি বাড়ানো দরকার। কৃষি খাতে ঋণ সরবরাহ অব্যাহত রাখতে হবে নির্দ্বিধায়। তবে সেই ঋণ যেন সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছায়, সে ব্যাপারে শক্ত অবস্থান শুধু নয় কঠোর সতর্কতা জরুরি। উদ্যোগী হোন স্থায়ী সমাধানে সম্প্রতি টানা দু’দিনের বৃষ্টিতে ঢাকা শহরের অনেক এলাকাই জলমগ্ন হয়েছে। জলাবদ্ধতা এ শহরে অবশ্য নতুন নয়। এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেও রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ার ঘটনা রয়েছে। প্রতি বর্ষাকালেই এমনটা দেখতে হচ্ছে আমাদের। অথচ ঢাকার চারপাশে রয়েছে নদী। নদীবেষ্টিত এ শহরের অভ্যন্তরে অনেক খাল ছিল, যা দিয়ে বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি নদীবক্ষে বয়ে যেতে পারত। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অবৈধ স্থাপনা, জলাভ‚মি দখল, খাল ভরাট প্রভৃতি কারণে পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক উপায় বিনষ্ট হয়েছে। জলাবদ্ধতা সমস্যা বেড়ে ওঠার এটাই বড় কারণ বলে বিবেচিত।

এ সময়ে টানা দু’একদিন বৃষ্টি অস্বাভাবিক নয়। তবে বৃষ্টির পানি কয়েকদিন ধরে জমে থাকাটা মানবসৃষ্ট সমস্যা। পানি নিষ্কাশনের জন্য চাই কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা। ঢাকার মোট আয়তনের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ (৩৬০ বর্গকিলোমিটার) এলাকায় ওয়াসার ড্রেনেজ ব্যবস্থা আছে। এ সমস্যা নিরসনে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, এমনটা অবশ্য বলা যাবে না। গত দু’বছরে বনানী, বারিধারা, গুলশান ও উত্তরার কিছু অংশের ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নে কাজ করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এসব এলাকায় খোলা ও পাইপ নর্দমা সংস্কার এবং নতুন নর্দমা তৈরিতে তাদের প্রচেষ্টাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে সার্বিক জলাবদ্ধতা নিরসনে তেমন অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। এক্ষেত্রে ওয়াসা, সিটি করপোরেশন ও রাজউকের পরিকল্পনা ও কার্যক্রমে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। এটিও বর্তমান জলাবদ্ধতার কারণ। ঢাকার জলাবদ্ধতার আরেকটি কারণ ত্রুটিপূর্ণ ড্রেনেজ ব্যবস্থা। এর উন্নয়নে সংস্থাটির একটি মহাপরিকল্পনার কথা গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়। কিন্তু ওয়াসা কর্মকর্তাদের মতে, এ মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়নও আটকে আছে তহবিল সংকটে। রয়েছে অব্যবস্থাপনাও।

আইন অনুযায়ী, মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত রাজধানীতে উন্নয়নমূলক কাজ স্থগিত রাখার নিয়ম থাকলেও তা মানা হয়নি। ফলে সিটি করপোরেশনের অর্ধসম্পন্ন কাজে জলাবদ্ধতার ভোগান্তি বাড়ছে কয়েকগুণ। আবার ডিএনসিসির ঊর্ধতন কর্মকর্তারা মনে করেন, ওয়াসার নিয়ন্ত্রণাধীন খালগুলো পুনঃখনন ও তা নিয়মিত সংস্কার করা না হলে কেবল ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নের সুফল বেশিদিন মিলবে না। অনেকেই মনে করেন, সহজে এ থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। এজন্য দরকার পর্যাপ্ত গবেষণা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সে অনুযায়ী কার্যক্রম।

নানামুখী সমস্যার ফল হিসেবেই জলাবদ্ধতা বর্তমান রূপ ধারণ করেছে। সম্প্রতি অন্য একটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নদীর সঙ্গে খালগুলোর কার্যকর সংযোগকেই রাজধানীর জলাবদ্ধতা দূরীকরণে প্রধান উপায় বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। জানা গেল, ঢাকার ৫৮টি খালের মধ্যে মাত্র ২৬টির অস্তিত্ব রয়েছে, যা অবৈধ স্থাপনা ও বর্জ্য দিয়ে ভরাটের ফলে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে এসব খাল পুনরুদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই এটা মানতে হবে। সঠিক প্রশস্ততা ও গভীরতা বজায় রেখে খালগুলোকে নদীর সঙ্গে যুক্ত করতে পারলেই বৃষ্টির পানি মূল শহরে জমে থাকবে না। নিয়মিত সংস্কার ও পরিষ্কারের মাধ্যমে ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে সচলও রাখতে হবে। দীর্ঘ বর্ষাকালে সীমাহীন জনভোগান্তিকে আমলে নিয়ে নগরীর খাল পুনরুদ্ধারসহ জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকার স্থায়ী ব্যবস্থা নেবে এমনটাই প্রত্যাশা।