প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

কৃষিঋণে খেলাপি ৫ হাজার ১১২ কোটি টাকা

মেহেদী হাসান : অন্যান্য খাতের পাশাপাশি কৃষিঋণেও বাড়ছে খেলাপি। চলতি বছরের গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি কৃষিঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার ১১৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল প্রায় চার হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কৃষি খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫৮৩ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ঋণের প্রায় অর্ধেক খেলাপির বাস্তব কারণ থাকলেও বাকি অর্ধেকের সুনির্দিষ্ট বা যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় অনিয়মের মাধ্যমে দেওয়া ঋণগুলো খেলাপি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষিঋণ বিতরণের পরিমাণ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এ ঋণ বিতরণে দু-একটা অনিয়ম হলেও এই ঋণের গুণগত মান আগের চেয়ে বেড়েছে বলে মনে করেন তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত সেপ্টেম্বর শেষে কৃষি খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ১১২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় খেলাপির পরিমাণ চার হাজার ৯৪০ কোটি ১২ লাখ টাকা। কৃষিঋণে খেলাপির শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। বিশেষায়িত এ ব্যাংকটির খেলাপির পরিমাণ দুই হাজার ৩০৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এরপরেই রয়েছে সোনালী ব্যাংক। এই ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক হাজার ৩৩০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৩৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর)  দেশের ব্যাংকগুলো মোট কৃষিঋণ বিতরণ করেছে চার হাজার ২৩৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। অর্থবছরের তিন মাসেই লক্ষ্যমাত্রার ২০ দশমিক ৭৬ শতাংশ কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়েছে। পুরো অর্থবছরের জন্য কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময়ে তিন হাজার ৪৪৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করেছিল ব্যাংকগুলো।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের তিন মাসে বিতরণ করা চার হাজার ২৩৫ কোটি টাকার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে প্রায় এক হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা। এছাড়া বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে দুই হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। কৃষিঋণ বিতরণে শীর্ষে রয়েছে সরকারি খাতের বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিশেষায়িত এ ব্যাংকটি ৯০৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকার কৃষিঋণ বিতরণ করেছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ১৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ। পুরো অর্থবছরের জন্য এ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা চার হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এরপরেই রয়েছে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। ব্যাংকটি তিন মাসে প্রায় ৩৪৩ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ করেছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ২৯ দশমিক ৬২ শতাংশ। কৃষিঋণ বিতরণে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড। ব্যাংকটি প্রায় ২৫৮ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ করেছে। অর্থবছরের তিন মাসেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকটি। পুরো অর্থবছরের জন্য ব্যাংকটির লক্ষ্যমাত্রা ২৩১ কোটি টাকা।

কৃষিঋণ বিতরণের হার বাড়লেও তা খেলাপি হয়ে পড়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছেন না বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘কৃষিঋণে খেলাপিতে প্রকৃত কৃষকের দোষ নেই। তারা অনিয়ম-দুর্নীতি করে না। বরং কিছু অসাধু ব্যাংক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী যোগসাজশ করে কৃষকদের ফাঁসায়। কৃষিঋণের নামে বড় বড় কোল্ডস্টোরেজকে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। এসব বন্ধ করতে হবে। এজন্য আবার প্রকৃত কৃষকদের বঞ্চিত করা যাবে না। তাদের ঋণ দিতে হবে।’

এদিকে বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের কৃষিঋণ বিতরণ নীতিমালা শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতদিন এসব ব্যাংক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে অনর্জিত অংশ বিনা সুদে এক বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখার যে বাধ্যবাধকতা ছিল তা তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে ব্যাংকগুলো লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিতরণ না হওয়া ঋণের মাত্র তিন শতাংশ জমা রাখবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কৃষিঋণ বিতরণকে ঝামেলা বিবেচনায় বেসরকারি ও বিদেশি অনেক ব্যাংক এ খাতে ঋণ দিতে আগ্রহ দেখাত না। এমন  প্রেক্ষাপটে ২০১১ সাল থেকে এসব ব্যাংকের মোট ঋণের অন্তত আড়াই শতাংশ কৃষিতে বিতরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোনো ব্যাংক নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে ওই অংশের অর্থ পরবর্তী এক বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখার বিধান ছিল। এখন সেখানে শিথিলতা আনা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হয়েছে, যেসব ব্যাংক পরবর্তী দুই অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে বিগত অর্থবছরের অনর্জিত অংশ বিতরণ করবে, আনুপাতিক হার অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখা অর্থ থেকে তা ফেরত দেওয়া হবে। অন্যথায় ওই জমাকৃত অর্থ আর ফেরত দেওয়া হবে না।