প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

কৃষিকাজে নারী শ্রমিকের ভূমিকা

রিয়াদ হোসেন: জাহানারা বেগম, বয়স এখন প্রায় ৫০ বছর। তিনি ২০ বছর ধরে মজুরির ভিত্তিতে কৃষিকাজে কামলা বা শ্রমিক হিসেবে অন্যের জমিতে কাজ করে যাচ্ছেন। বিরাট সংসারের বোঝা সামলাতে তার স্বামী যেমন অন্যের জমিতে মজুর খাটছেন, তেমনি তিনিও বাধ্য হয়েছেন এ পথ বেছে নিতে। নারী হিসেবে কাজটি অত্যন্ত কঠিন হলেও ১০-১২ জন নারী সঙ্গীর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করতে করতে বর্তমানে গা সয়ে গেছে তার। কাদা জমিতে ধানের রোয়া লাগানো, বীজতলা থেকে ধানের বীজ উঠানো, পাকা ধান ও গম কাটা, ধান ও গমের আঁটি মাথায় করে মালিকের বাড়িতে পৌঁছানো, সবই করে থাকেন তিনি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দৈনিক মজুরির বিনিময়ে কিংবা চুক্তি বা ঠিকার ভিত্তিতে স্বদলবলে শুধু কৃষিকাজেই কামলা দিয়ে থাকেন। কেননা অন্য কাজে তিনি আদৌ অভ্যস্ত নন। একসময় তাও কিছু জমিজমা ছিল এবং আরও ধানিজমি বন্ধক নিয়ে স্বামী-স্ত্রী মিলে চাষাবাদ করে সংসার চালাতেন, কিন্তু সেদিন আর নেই বলে এখন তারা মজুর খাটতে হয় অন্যের জমিতে। এভাবেই শতকষ্টের মাঝেও তিনি পাঁচ ছেলেমেয়ের বিয়ে পর্যন্ত দিয়ে ফেলেছেন। শরীর না চললেও আরও দু’জন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ের স্বার্থে এখনও নিরলস খেটে চলেছেন তিনি। কিন্তু জানেন না, কবে হবে তার জীবনের অবসর।

সৃষ্টির গোড়া থেকে মানুষকে বেঁচে থাকার তাগিদে সংঘবদ্ধ বা সমাজবদ্ধ হতে হয়েছে। সভ্যতার প্রথম দিকে নারী-পুরুষের মধ্যে দৈহিক পার্থক্য ছাড়া আর কোনো পার্থক্য ছিল না। উভয়ের কাজের মর্যাদা ছিল সমান। আহরণ, শিশুপালন, পোশাক তৈরি, রান্না-বান্না প্রভৃতি কাজের দায়িত্ব ছিল নারীর। সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় নারীদের দ্বারা কৃষির আবিষ্কারের কারণে অর্থনীতিতে নারীদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুপালন, পরিবার-পরিচালনা এবং অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কারণে সমাজে নারীদের অধিকার সংরক্ষণ ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় বিশেষ সহায়তা ছিল। সন্তান জš§দানের কারণে পরিবারের প্রধান ছিল নারী এবং সন্তানেরা মায়ের পরিচয়েই পরিচিত হতো। সামাজিক রীতিনীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীই ছিল নেতৃস্থানীয়।

সামাজিক বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় নারী ও পুরুষের কাজ এবং কাজের মূল্যায়নে তারতম্য ঘটতে থাকে। কর্মক্ষমতা ও শক্তি প্রয়োগের কারণে নারীদের অধিকার ও মর্যাদা ক্ষুণœ হয় একসময়। সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকে ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিঃসন্দেহে দাবি করা যায় নারীরা পারে না এমন কোনো কাজ পৃথিবীতে নেই। গৃহকর্ম, শিশুপালন, কুটির শিল্প, স্বাস্থ্য রক্ষা ও সেবায়, শিক্ষা ক্ষেত্রে, রাষ্ট্র পরিচালনায়, যুদ্ধ, বৈমানিক হিসেবে, বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য, আবিষ্কার এবং সমাজ সংস্কার কোনোটাতেই নারীদের অনন্য ও অনবদ্য অবদান অগ্রাহ্য করা যায় না।        

আমাদের দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সর্বোচ্চ খাত গার্মেন্টস শিল্পের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছেন নারী শ্রমিক। এ দেশের কৃষি উন্নয়নেও নারীর অনবদ্য ভূমিকা প্রশংসনীয়। কবি কাজী নজরুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন, ‘নর বাহে হল নারী বহে জল, সেই জল আর মাটি মিশে, ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল, সোনালী ধানের শীষে।’ এ দেশের কৃষি উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গেই গ্রামীণ নারীরা নানাভাবে সম্পৃক্ত। গ্রামের দিকে নজর দিলে দেখা যাবে ধান, পাট, গম, তিল-তিসি, আঁখ, ভুট্টাসহ অন্যান্য ফসলাদি বোনা থেকে শুরু করে ঘরে তোলার কাজেও নারীরা পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। নারী শ্রমিকরা পুরুষের মতোই বীজতলার চারা উত্তোলন, শস্যবপন ও রোপণ, আগাছা নিড়ানো, শস্যকাটা, শস্যমাড়াই এমনকি শস্য গোলায় তোলার ন্যায় কষ্টসাধ্য কাজটিও করতে পিছপা হচ্ছেন না। কৃষিজীবী পরিবারের কৃষাণি ও গৃহিনীদের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথাও কে-বা না জানে? গ্রামীণ কৃষাণিরা সাধারণত তরিতরকারি আবাদ থেকে শুরু করে যাবতীয় কৃষিবীজ সংরক্ষণ, ধানসিদ্ধকরণ ও শুকানো, সর্বপ্রকার ফসলমাড়াই, গোলায় শস্যতোলা, ধানকে চালে রূপান্তকরণ, মুড়ি ও চিড়া তৈরিকরণ, গরু-ছাগলও মাঠে চরানো, গোবরসহ নারারকম জৈব সার তৈরি, শ্রমিক কামলাদের জন্য রান্নাবান্না ও তাদের খাদ্য পরিবেশন, কৃষিক্ষেতের কাজ দেখাশোনাসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিটি কাজই করে থাকেন।

এ  তো গেল একদিক, অন্যদিকে এদেশের বেশকিছু নারী কঠোর সাধনা ও সংকল্পে অটল থেকে নগণ্য পুঁজি কিংবা সামান্য কৃষিঋণের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে দুর্লভ নজির স্থাপন করেছেন, এমনকি কেউ কেউ এতে করে বিত্তশালী পর্যন্তও হয়ে গেছেন। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কৃষিক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের পুরস্কৃত হওয়ার সংবাদ গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে। সুতরাং শ্রমবাজারে নারীরা আজ আর অবহেলা ও অবমূল্যায়নের পাত্র নয়, প্রয়োজন শুধু তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন।

তবে একথা ঠিক যে, এদেশের নারী শ্রমিক যারা কলকারখানায়, বাসা-বাড়িতে ও ক্ষেতে-খামারে অত্যন্ত দক্ষতা, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গেই কাজ করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের উপযুক্ত সম্মানী বা ন্যায্য মজুরি দেয়া হয় না, যা নেহায়েত অন্যায়। পুরুষের সমান কাজ করেও মজুরির বেলায় কম পাওয়ার বিষয়টি বৈষম্য। এটা ঠিক নয়। কিন্তু আমাদের মান রাখতে হবে, নারীদের এভাবে অবমূল্যয়ন করার অর্থ আমাদের নিজেদেরই ছোট করা এবং সংশ্লিষ্ট পুরুষদের এটা চরম হীনমন্যতা বৈ আর কিছু নয়। তাছাড়া নারী শ্রমিকরা সাধারণত পুরুষদের তুলনায় কর্মক্ষেত্রে বেশি মনোযোগী ও নিরলস। এমনকি দেখা যায় অসহায়ত্বের কারণে সস্তায়ই তাদের শ্রম কেনা যায় বলে তাদের প্রতি নিয়োগ কর্তাদের আগ্রহও থাকে বেশি। নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের এটা একটা নিকৃষ্টতম উদাহরণও বটে। কর্মজীবী নারীদের ঘর সামলানোর পর গর্ভধারণ, সন্তান প্রতিপালন প্রভৃতি সঙ্গে সঙ্গে চাকরি করে অর্থ-উপার্জন করাটা সত্যিই অনেক কঠিন কাজ, অথচ অনেক পুরুষই এ সত্যটা উপলব্ধি করেতে চায় না বা এ ধরনের চাকরিজীবী নারীর যথাযথ মূল্যায়নও করেন না।

নারীকে অবহেলা করে বা উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে তাদের দূরে ঠেলে রাখলে, কখনোই প্রকৃত অগ্রগতি লাভ করা সম্ভব নয়। তাই সর্বাগ্রে নারীদের প্রতি পুরুষদের অবমূল্যায়ন ও বৈষম্যমূলক মন-মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। নারীকে নারী হিসেবে না দেখে সর্বক্ষেত্রে তার কর্ম এবং মর্যাদার ভিত্তিতেই তাকে মূল্যায়ন করতে হবে। নারী শ্রমিকদের নিয়োগকর্তা মালিকদের মজুরি বৈষম্য দূর করে ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে এলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। উন্নয়নের পূর্বশর্ত যা নারী জনশক্তির পূর্ণ সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে জনসচেতনতা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রয়োজন কড়া নজরদারি, সমন্বিত উদ্যোগ এবং আমাদের এগিয়ে আসা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে। 

পিআইডি নিবন্ধ