দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

কৃষিতে সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা

মো. আরাফাত রহমান: কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, যা দেশের জিডিপিতে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অবদান রাখে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৪ শতাংশ তাদের জীবিকার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের শ্রমশক্তির প্রায় ৬৩ শতাংশ কৃষিক্ষেত্রে নিযুক্ত রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৫৭ শতাংশই একমাত্র ফসলের উপখাতে নিয়োজিত। ফসল উৎপাদন বাড়ানোর অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধক হলো ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ বা পেস্ট। পেস্ট শব্দটি দ্বারা পোকামাকড়, প্যাথোজেন, আগাছা, নেমাটোডস, মাইটস, ইঁদুর ও পাখির মতো জীবকে বোঝায়, যা মানুষ, প্রাণী, ফসল বা সম্পদের ক্ষতি বা বিরক্তির কারণ হয়ে থাকে।

একটি অনুমিত পরিসংখ্যান অনুসারে, ক্ষতিকর পোকা ও কীটপতঙ্গের আক্রমণে ধানে ১৬ শতাংশ, গমে ১১ শতাংশ, আখে ২০ শতাংশ, সবজিতে ২৫ শতাংশ, পাটে ১৫ শতাংশ এবং ডাল ফসলে ২৫ শতাংশ বার্ষিক ফলন হ্রাস হয়ে থাকে। বাংলাদেশে অতীতে রাসায়নিক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণই পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক পদ্ধতি ছিল। ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত সরকার কীটনাশক বিনা মূল্যে কৃষকের কাছে সরবরাহ করে তাদের ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করত। ১৯৭৪ সালে এই ভর্তুকি হ্রাস করা হয় ৫০ শতাংশে। সরকার ১৯৭৯ সালে সম্পূর্ণ ভর্তুকি প্রত্যাহার করে এবং কীটনাশক ব্যবসা বেসরকারি খাতে স্থানান্তরিত হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশে ৩০৪টি নামে ৯৬টি কীটনাশক নিবন্ধিত রয়েছে। এসব কীটনাশক প্রতিবছর কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে আমদানি করা হয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে কীটনাশকের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম হলেও দুই দশক ধরে কীটনাশকের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতীতে কীটনাশক কৃষি কীটগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য সর্বরোগ নিবারক ওষুধ হিসেবে বিবেচিত হতো। যদিও কীটনাশক অস্থায়ী সমাধান সরবরাহ করতে পারে, তবে এখন এটি ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছে যে, কীটনাশকের নির্বিচার ও অতিরিক্ত ব্যবহার এবং তাদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা কৃষিক্ষেত্রের জন্য স্থায়ীভাবে হুমকিস্বরূপ। রাসায়নিক কীটনাশকগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কেবল ব্যয়বহুল নয়, এটি ফসলের উৎপাদনকারী ও গ্রাহকদের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি নেতিবাচক পরিবেশগত প্রভাবের দিকেও নিয়ে যায়।

বিষয়গুলো বিবেচনা করে কেবল কীটনাশকের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট (আইপিএম) এক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। আইপিএম দেশের কৃষক, নীতিনির্ধারক, রাজনীতিবিদ ও সাধারণ জনগণের মধ্যে প্রচুর সচেতনতা তৈরি করেছে। ধারা ৭.১-এর অধীনে জাতীয় কৃষি নীতি (ন্যাপ) নির্ধারণ করেছে যে, কীট ও রোগ নিয়ন্ত্রণে আইপিএমই হবে মূল নীতি।

বর্তমানে বাস্তুসংস্থানীয় আনুকূল্যের ওপর ভিত্তি করে ফসল উৎপাদনে আইপিএমের একটি দৃঢ় ও বিস্তৃত পদ্ধতি রয়েছে। এমনকি এটি উৎপাদন ছাড়িয়ে যায়, কারণ এতে সর্বস্তরের ফসলের সঞ্চয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আইপিএম কৃষকদের একটি স্বাস্থ্যকর ফসল উৎপাদন করতে এবং একই সঙ্গে পরিবেশ ও মানব সম্প্রদায়ের স্বাস্থ্যের উন্নতির পাশাপাশি একটি টেকসই ভিত্তিতে তাদের খামার উৎপাদন এবং আয় বৃদ্ধিতে সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে।

আইপিএম মাটি, পানি, সার, কীটপতঙ্গ ইত্যাদির যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার এড়ানো বা হ্রাস করে, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ এজেন্ট সংরক্ষণ করে, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ এজেন্টদের বৃদ্ধি ঘটায়, কীটসহনীয় ফসলের জাতের ব্যবহারের মাধ্যমে একটি স্বাস্থ্যকর ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে ধানের জমিতে কীটপতঙ্গ হ্রাস করতে পারে, কীটপতঙ্গগুলোকে যান্ত্রিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, কৃষকদের তাদের নিজস্ব ক্ষেতের বিশেষজ্ঞ হিসেবে ফসল পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণসহ আয়বর্ধক কার্যক্রম, যেমন আইল ফসলের চাষ এবং মাছ ও চিংড়ির চাষ বৃদ্ধি করার মতো কৃষিকাজ পদ্ধতি তৈরিতে সাহায্য করে।

আইপিএম গ্রহণের ফলে উপকারী পোকামাকড়, মাছ, ব্যাঙ, পশু, পাখি ও গুইসাপ প্রভৃতি সংরক্ষণ করা যায়। ক্ষতিকারক কীটনাশকের যুক্তিসংগত ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। যথেচ্ছ ব্যবহার না হওয়ায় উৎপাদন খরচ কমে। বালাইনাশকের পরবর্তী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রোধ করা সম্ভব হয়। এতে বালাইনাশকজনিত দুর্ঘটনা সহজেই এড়ানো যায়। ক্ষতিকারক পোকামাকড় বালাইনাশক-সহনশীলতা অর্জন করার সুযোগ পায় না। বালাইয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা কমে। সর্বোপরি পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং দুষণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।

বিশ্ব খাদ্য সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত আইপিএমের সংজ্ঞাটি হলোÑএকটি কীটপতঙ্গ পরিচালন ব্যবস্থা, যা পরিবেশ-সম্পর্কিত ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ এবং কীট প্রজাতির সংখ্যার গতিশীলতার পরিপ্রেক্ষিতে যথাযথভাবে উপযুক্ত উপায়ে সব উপযুক্ত কৌশল এবং পদ্ধতি ব্যবহার করে পোকার সংখ্যা এমন পরিমাণ বজায় রাখা হয় যেন তারা অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ না হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আইপিএম পদ্ধতি কেবল কীটপতঙ্গ ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর মধ্যে কার্যকর, নিরাপদ, টেকসই ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ফসল সুরক্ষা ব্যবস্থায় অবদান রাখার উপাদানগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বাংলাদেশে আইপিএম কার্যক্রম ১৯৮১ সালে ধানের ফসলে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা কর্তৃক আইপিএমের আন্তঃদেশীয় প্রোগ্রাম (আইসিপি) প্রবর্তনের মাধ্যমে প্রথম শুরু হয়। এর ফলে আইপিএমের  কার্যক্রমগুলো প্রসারিত হতে শুরু করে এবং সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে একটি জনপ্রিয় বিষয় হয়ে ওঠে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রশিক্ষণের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আইপিএম প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণের জন্য কৃষক বিদ্যালয় (এফএফএস) চালু করা হয়েছে।

বেসরকারি সংস্থার অনেক ব্যক্তিকে আইপিএম সম্পর্কে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচির সাফল্যের ফলস্বরূপ এবং বাংলাদেশে আইপিএমের প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে ধান ও শাকসবজিতে বেশ কয়েকটি আইপিএম প্রকল্প প্রকাশ্যে এসেছে, যা বিভিন্ন সরকারি দপ্তর এবং এনজিও কর্তৃক সম্পাদিত হচ্ছে।

এ-জাতীয় প্রকল্পের কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রচুর আইপিএম প্রশিক্ষক তৈরি করা হয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়নের এই কার্যক্রমগুলো ছাড়াও আইপিএম প্রকল্পগুলো পুরুষ ও মহিলা কৃষক এবং স্কুল শিশুদের জন্য আইপিএম ফিল্ড স্কুল প্রতিষ্ঠা, আইপিএম কৃষক ক্লাবগুলোর বিকাশ, প্রচার, জৈব-কীটনাশক পরীক্ষা, বায়ো-কন্ট্রোলের পরীক্ষায় ও ব্যবহারে সক্রিয় রয়েছে। সুতরাং, সরকারের দৃঢ় সমর্থন নিয়ে এরই মধ্যে বাংলাদেশে কার্যকর আইপিএম নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

প্রায় এক লাখ কৃষক এরই মধ্যে আইপিএম-সম্পর্কিত গভীরতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। অন্যান্য এশীয় দেশগুলোর মতো আইপিএম প্রশিক্ষিত বাংলাদেশি কৃষকরাও কীটনাশকের ব্যবহার হ্রাস করতে সক্ষম হয়েছেন।

সাধারণভাবে আইপিএমের উদ্দেশ্য হচ্ছে, সুস্থ ও মানসম্পন্ন ফসল উৎপাদনে কৃষকের প্রচলিত চাষাবাদ পদ্ধতির পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমানভাবে ফসল উৎপাদন ও কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি সামগ্রিক পরিবেশ তথা জনস্বাস্থ্যের উন্নতি। অনেকের ধারণা যে, আইপিএম পদ্ধতিতে আদৌ কোনো বালাইনাশক ব্যবহার চলবে নাÑআসলে তা নয়। পোকামাকড় ও রোগবালাই যদি অন্যান্য দমন পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয়, শুধু তখন শেষ ব্যবস্থা হিসেবে বালাইনাশক ব্যবহার করা যাবে। তবে তার ব্যবহার করতে হবে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ও যুক্তিসংগতভাবে। এর মধ্যে আছে নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন, কৃষি পরিবেশ বিশ্লেষণ ও নিয়মিত বালাই জরিপ নিশ্চিত করা; ক্ষেতে ক্ষতিকর ও উপকারী পোকামাকড়ের ভারসাম্য বজায় রাখা; শুধু বালাইনাশকের ওপর নির্ভরশীল না হওয়া ও বালাইনাশকের এলোপাতাড়ি ব্যবহার বন্ধ করা; আইপিএম ধারণায় কৃষককে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে, যাতে করে নিজের ফসলের বালাই ব্যবস্থাপনার সঠিক সিদ্ধান্ত তারা নিজেরাই গ্রহণ করতে পারেন।

তবে, জাতীয় পর্যায়ে আইপিএমের একটি উল্লেখযোগ্য ও ইতিবাচক প্রভাব নিশ্চিত করার জন্য এখনও বিপুলসংখ্যক কৃষককে আইপিএম প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং নিয়মিতভাবে তাদের জমিতে আইপিএম অনুশীলন করা উচিত। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে একটি টেকসই আইপিএম প্রোগ্রামের সম্প্রসারণ ও সমন্বয় নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

আইপিএমের বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন ও সংরক্ষণের বিষয়ে একটি বিস্তৃত পদ্ধতি রয়েছে, যার কারণে এখনকার দিনগুলোয় আইপিএমকে বিশ্বব্যাপী এক্ষেত্রে সেরা পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

আশা করা যায়, জাতীয় আইপিএম নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের ফসল উৎপাদন এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থাটি অনেক বেশি বিকশিত হবে। একই সঙ্গে আইপিএম প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ায় তাদের জড়িত হওয়ার মাধ্যমে কর্মী, কৃষক ও এনজিও কর্মীদের মধ্যে কাজের সম্পর্ক ও সহযোগিতা বিকাশ করতে হবে। কৃষকরা যদি তাদের জমিতে আইপিএম অনুশীলন করে, তবে ক্ষতিকারক কীটনাশকের ব্যবহার অনেক হ্রাস পাবে, যার ফলে উৎপাদন স্তর বৃদ্ধি এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে। আইপিএম খামারের আউটপুট বাড়িয়ে দেবে, যা দেশের বিপুলসংখ্যক কৃষকের আয়ের স্তর বাড়িয়ে তুলবে। সুতরাং সামগ্রিক অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক প্রভাব দেশের দারিদ্র্যপূর্ণ পরিস্থিতি হ্রাস করতে সহায়তা করবে। তবে সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত জাতীয় আইপিএম নীতি পর্যালোচনা করা এবং দেশের পরিবর্তিত কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংশোধন ও যুগোপযোগী করা উচিত।

সহকারী কর্মকর্তা

সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..