মত-বিশ্লেষণ

কৃষি পরামর্শ বিনিময়ের মাধ্যম হয়ে উঠছে কৃষক বন্ধু ফোনসেবা

তিশা মণ্ডল: বর্তমান যুগ বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। বিজ্ঞানের গৌরবময় ভূমিকার জন্য বিশ্বসভ্যতা আজ উন্নতির শীর্ষে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ছাড়া কোনো দেশ তার আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারে না। উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে প্রতিটি ক্ষেত্রে ডিজিটাল টুলস ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। দেশ থেকে দারিদ্র্য ও সব বৈষম্য দূর করে জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে সরকারি কর্মকাণ্ডের চালিকাশক্তি হবে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, যা আজ দৃশ্যমান বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন লালিত স্বপ্ন ‘সোনার বাংলা’ গড়ার এক নতুন প্রত্যয়ের নাম ডিজিটাল বাংলাদেশ। প্রযুক্তিনির্ভর বৈশ্বিক উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তথ্যপ্রযুক্তিভিক্তিক নতুন এক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে দিন বদলের সনদ, রূপকল্প: ২০২১ ঘোষণা করেন ১৪-দলীয় জোট নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। এ ধারণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও

লাগসই ব্যবহার। সরকারি-বেসরকারি সেবাগুলো দ্রুততার সঙ্গে স্বল্প খরচে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোই ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রধান অভীষ্ট। 

সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও উন্নয়নের সব ধারায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে সম্পৃক্ত করেছে সরকার। ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ই-গভর্ন্যান্স, ই-শিক্ষা, ই-বাণিজ্য ও ই-সেবা এই চারটিকে স্তম্ভ ধরে অগ্রাধিকার দিয়েছে বর্তমান সরকার। জনগণের দোরগোড়ায় সব ধরনের সরকারি-বেসরকারি, বাণিজ্যিক তথ্য ও সেবা পৌঁছে দেওয়ার একটি সমন্বিত উদ্যোগ হিসেবে ইতোমধ্যে ৬৪টি জেলায় চার হাজার ৫৫৫টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৩২৫টি পৌরসভা এবং আটটি সিটি করপোরেশনে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। এসব ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি,  আইনি সেবা, জš§নিবন্ধন, মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সনদ, জমির পর্চা, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধসহ প্রায় ১৫০ ধরনের সরকারি-বেসরকারি সেবা প্রদান করা হচ্ছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থাপিত ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের (ইউডিসি) মাধ্যমে পণ্যের উৎপাদন ও বিপণন-সংক্রান্ত তথ্যের অভিগম্যতার সুবাদে প্রান্তিক কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণ সহজতর হচ্ছে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

সরকারের এসব উদ্যোগ শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে জাতিসংঘ সাউথ-সাউথ কো-অপারেশন ভিশনারি অ্যাওয়ার্ড, আইসিটি সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড, গ্লোবাল আইসিটি এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড, আইসিটি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড-২০১৬, গ্লোবাল মোবাইল গভ অ্যাওয়ার্ড-২০১৭ অর্জিত হয়েছে। সব তথ্য ও সেবা এক ঠিকানায় এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তত্ত্বাবধানে সব দপ্তরের সহযোগিতায় অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) জাতীয় তথ্য বাতায়ন বাস্তবায়ন করছে। বিশ্বের বৃহত্তম সরকারি এ ওয়েব পোর্টাল জাতীয় তথ্য বাতায়নতথ্য ও সেবার ক্ষেত্রে অনবদ্য অবদান রাখায় ২০১৫ সালে জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থার (আইটিইউ) ডব্লিউএসআইএস অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছে। আট হাজার ৫০০টি ডাকঘরকে পোস্ট ই-সেন্টারে রূপান্তরের জন্য ডাক বিভাগকে দ্য ওয়ার্ল্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সার্ভিসেস অ্যালায়েন্স (ডব্লিউআইটিএসএ) মেরিট অ্যাওয়ার্ড প্রদান করেছে। ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর জাপানের টোকিওতে আয়োজিত  অ্যাসোসিয়ো ডিজিটাল সামিট ২০১৮ অনুষ্ঠানে ডিজিটাল গভর্নমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ক্যাটেগরিতে ‘ইনফো-সরকার’ প্রকল্পকে পুরস্কৃত করা হয়।

অর্থনৈতিক কিংবা সামাজিক যে কোনো খাতের ইতিবাচক এবং টেকসই পরিবর্তনকে উন্নয়ন বলে অভিহিত করা যায়। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টায় সরকারের নানামুখী সেবা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কৃষি বাতায়ন ও কৃষক বন্ধু ফোন সেবার সংযোজন করা হয়েছে। দেশব্যাপী কৃষকের দোরগোড়ায় দ্রুত ও আরও সহজে কার্যকরী ই-কৃষি সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কৃষি বাতায়ন এবং কৃষক বন্ধু ফোন সেবার মাধ্যমে কৃষিবিষয়ক পরামর্শ ও সেবা সহজলভ্য করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালে কৃষি বাতায়ন ও কৃষক বন্ধু ফোন সেবা সারা দেশে ৬৪টি জেলার ৫৬০টি উপজেলায় একযোগে উদ্বোধন করেন।

এ বাতায়নে মাঠপর্যায়ে কর্মরত ১৮ হাজার কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার তথ্য, ৫০৪টি উপজেলার বিচিত্রময় কৃষির তথ্য ও ১৪ হাজার কৃষি ব্লকের তথ্য এবং পাঁচ হাজার কৃষক সংগঠনের তথ্য রয়েছে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত প্রায় ৫০ ধরনের যন্ত্রপাতির তথ্য ও সেগুলো দেশের কোথায় ব্যবহৃত হয় তার তথ্য, ফসলভিত্তিক এক হাজার ২০০টি বিভিন্ন কন্টেন্ট  ও  ৫০০টি ভিডিও কন্টেন্ট রয়েছে এ তথ্য বাতায়নে। সেই সঙ্গে রয়েছে কৃষির ৭০০টি প্রদর্শনীর তথ্য। প্রতি মাসে গড়ে ছয় হাজার কলসেবা দেওয়া হচ্ছে। ১৫ হাজার সম্প্রসারণ কর্মী দ্বারা প্রায় তিন কোটি কৃষককে সহজে, দ্রুত ও কার্যকরভাবে চাহিদাভিত্তিক সেবা দিতে উপজেলার সব কৃষি তথ্যগুলো বহুমাত্রিক উপায়ে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। কৃষি বাতায়নের মাধ্যমে কৃষক কোনো ধরনের মাটিতে কী ফসল হবে, কীভাবে চাষাবাদ করতে হবে, উন্নত জাতের বীজের সন্ধান, ফসলকে কীটপতঙ্গ ও বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্ত রেখে কীভাবে অধিক ফলন ফলানো যায় ইত্যাদি তথ্য জানতে পারছে। সে লক্ষ্যেই ডিজিটালাইজড কানেক্টিভিটি কৃষি তথ্য বাতায়ন কাজ করে যাচ্ছে।

কৃষক এবং কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীদের মাঝে নিরবচ্ছিন্ন এবং নির্ভরযোগ্য কৃষি পরামর্শ বিনিময়ের উত্তমমাধ্যম কৃষক বন্ধু ফোনসেবা ৩৩৩১। কৃষি বাতায়নের রেজিস্ট্রেশনকৃত যে কোনো কৃষক তার ফোন থেকে এই নম্বরে কল করে কৃষিবিষয়ক যে কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারবেন। এক্ষেত্রে কলটি প্রথমে তার ব্লকে কর্মরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার মোবাইল ফোনে পৌঁছবে, দাপ্তরিক ব্যবস্থায় কল গ্রহণে অপারগতায় কলটি পরে একই কল এ কৃষি সম্প্রসারণ অফিসারের কাছে অগ্রগামী হবে, তার অপারগতায় কলটি উপজেলা কৃষি অফিসারের কাছে পাঠানো হবে। যেসব ফোনসেবা গৃহীত হবে সেগুলো একটি অটোমেটিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সংরক্ষিত হবে এবং পরবর্তী সময়ে কৃষি বাতায়নের মাধ্যমে সেবা প্রদান করা হবে।

কুষ্টিয়ার মিরপুরে কৃষি বাতায়ন ও কৃষক বন্ধু ফোনসেবা থেকে উপকারভোগী কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছর বোরো ধানের জমিতে হঠাৎ করেই ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। কৃষকরা তখন দিশাহারা হয়ে কৃষক বন্ধু ফোন সেবার ৩৩৩১-এ ফোন করেন। তাৎক্ষণিকভাবে কৃষি বাতায়ন থেকে ১৭ হাজার কৃষকের ফোনে এর সমাধান দিয়ে খুদে বার্তা (এসএমএস) দেওয়া হয়। আক্রান্ত জমির আট হাজার ৯৭০ জন কৃষক পরের দিনই তাদের জমিতে ওষুধ দেওয়া শুরু করে। এর ফলে তাদের বোরো ধান রক্ষা পায়।

কৃষিপ্রধান জনবহুল দেশ বাংলাদেশ। কৃষির উন্নয়ন অর্থনীতির উন্নয়ন, কৃষির সাফল্যই দেশের সাফল্য। এ লক্ষ্যে কৃষকদের একটি তথ্যবহুল ডিজিটাল মাধ্যম কৃষি বাতায়নে কার্যকরী কৃষি তথ্য সন্নিবেশিত করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা আজ শুধু স্বপ্ন নয়, এ এক বাস্তবতা। দেশ আজ একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে মজবুত অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশ থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার দ্বারপ্রান্তে। ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করার যে লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার, সে লক্ষ্য অর্জনে কৃষিই হবে মূল চালিকাশক্তি। উন্নত বাংলাদেশের কৃষক হবে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সেবায় আরও উন্নত, উন্নত হবে তাদের জীবনযাত্রা এমন প্রত্যাশা আমাদের সবার।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..