মত-বিশ্লেষণ

কৃষি পর্যটন: উৎপাদনের সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে

রিম্পা খাতুন: আমাদের কর্মক্লান্ত এই জীবনের অবসরে অলসতা কাটিয়ে নয়ন ও মনকে বিনোদন দেয়ার উদ্দেশ্যে পর্যটকরা দিক থেকে দিগন্তে ছুটে চলেন নয়নাভিরাম দৃশ্যপট দেখতে, অচেনাকে চিনতে এবং অজানাকে জানতে। স্রষ্টার এমন কিছু সৃষ্টি বিশেষ বিশেষ স্থান রয়েছে, যার অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পর্যটকেরা ছুটে চলেন অবিরাম। প্রকৃতপক্ষে ভ্রমণের মাধ্যমে একদিকে যেমন চাক্ষুষ জ্ঞান আহরণ করা যায়, তেমনি প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যও উপভোগ করা যায় এবং একই সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তিও লাভ করা যায়। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের যেদিকে দুচোখ যায় সবুজ আর মনকাড়া চিত্র-বৈচিত্র্যে ভরা, যে মৌসুমই আসুক না কেন সবুজ আর সজীবতার যেন অন্ত নেই। এর মধ্যেও আছে নানা বৈচিত্র্যের সমাহার। কেউ কি আমরা খুঁজে দেখি বৈচিত্র্যময় প্রকৃতিকে? প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সখ্য গড়ে তুলতে কৃষি পর্যটন হতে পারে অন্যতম মাধ্যম। কৃষি পর্যটন হলো অবকাশ যাপনের এমন এক ধরন, যেখানে খামারগুলোয় আতিথেয়তার আয়োজন করা হয়। অবকাশকালীন কর্মকাণ্ডের মধ্য থেকে কৃষি পদ্ধতি সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান আহরণ, ফল ও সবজি চাষ, ফল ও সবজি ক্রয়, ঘোড়ায় চড়া, মধু আহরণ এবং স্থানীয় আঞ্চলিক বিভিন্ন পণ্য অথবা হস্তশিল্প সামগ্রীর তৈরি শৈলী দেখা ও কেনার সুযোগ তৈরি হয়। এককথায় কৃষির আদ্যোপান্ত জানার সুযোগ তৈরি করে এই কৃষি পর্যটন। কৃষকেরা তাদের কৃষিজমিগুলোকে একটি গন্তব্যে পরিণত করে এবং তারা সেখানে কী করেÑসে সম্পর্কে আরও শেখানোর উদ্দেশ্যে জনগণের জন্য তাদের দরজা উš§ুক্ত করে।
বিশ্বে কৃষি পর্যটনে সবচেয়ে এগিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইন?। তাছাড়া ফ্রান্স, নিউজিল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া পর্তুগাল, নেপাল, উগান্ডা, আয়ারল্যান্ড, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এরই মধ্যে কৃষি পর্যটন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফ্রান্সের প্যারিস থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত লাকুলুয়ে দো সারজি এলাকায় গড়ে তোলা উঠেছে এক ফার্ম। এখানে অরগানিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন রকমের শাকসবজি, ফলমূল, ফুল ও ফসল উৎপাদন করা হয়। উৎপাদিত সব ফসল শহরে বিক্রি করা হয়। স্থানীয় অভিবাসী ও শহর থেকে অনেক পর্যটক এখানে আসেন। ফার্মটি মূলত কৃষি পর্যটন মাথায় রেখে গড়ে তোলা হয়। এখানে পর্যটকরা ভ্রমণ করেন ইচ্ছামতো, নিজের পছন্দমতো ফলটি খেতে পারেন, আবার প্রয়োজন অনুযায়ী কিনতে পারেন। কৃষি যে কতটা মনোমুগ্ধকর হতে পারে, ফার্মটিতে গিয়ে উপলব্ধি করা যায়। এখানে রয়েছে খামার, রেস্তোরাঁ, বাজার, দোকানপাট প্রভৃতি। ফার্মটিতে শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ভ্রমণ করার মতো সুযোগ এবং প্রকৃতির উš§ুক্ত খোলা দরজা, যেখান থেকে শিক্ষার্থীরা জানতে পারবে কৃষি সম্পর্কে আদ্যোপান্ত এবং কৃষির জ্ঞানে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারবে। এরূপ কৃষি পর্যটন আমাদের বাংলাদেশেও গড়ে উঠতে পারে যদি যথার্থ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এমন কৃষি পর্যটন ক্ষেত্র পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয়ই বটে। কারণ প্রতিটি মানুষ প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকতে অবশ্যই ভালোবাসে।
আমাদের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ এবং শ্রমশক্তির ৬০ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত। দেশের জিডিপি প্রায় ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ কৃষিক্ষেত্র থেকে আসে। দুই কোটি কৃষক খাদ্য সরবরাহের জন্য খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী গ্রামগুলোয় বাস করছে। আমাদের জিডিপিতে কৃষির অবস্থা বর্তমানে আমাদের আশানুরূপ নয়। তাই বিদ্যমান কৃষিতে অতিরিক্ত উপার্জনমূলক কার্যক্রম যুক্ত করতে পারলে অবশ্যই জিডিপিতে কৃষির অবদান বাড়বে। এক্ষেত্রে কৃষি পর্যটন হতে পারে এমন জাতীয় কার্যক্রমের একটি বিশেষ ক্ষেত্র। আবার আমাদের দেশের পর্যটনশিল্পে অপার সম্ভাবনা থাকা সত্তে¡ও বিশ্ব ট্যুর মার্কেটে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব মাত্র এক দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ, যেটা হতাশাজনকও বটে, যেখানে পর্যটন ১০৯টি শিল্পকে সরাসরি প্রভাবিত করে, চালিত করে এবং প্রসারিত করে। একজন পর্যটকের আগমনে সেবা খাতে প্রত্যক্ষভাবে ১১ জন ও পরোক্ষভাবে ৩৩ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এই সুযোগকে আমরা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছি না, যার ফলে পিছিয়ে থাকছে আমাদের দেশের পর্যটনশিল্প, পিছিয়ে থাকছে আমাদের দেশÑযে পর্যটনশিল্প আমাদের দেশের জাতীয় আয়ের অন্যতম উৎস হতে পারত! কিন্তু অন্যতম উপায় হিসেবে পর্যটনশিল্পকে আমরা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছি। এর অন্যতম কারণ রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পরিকল্পনা ও প্রতিজ্ঞার অভাব এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগের অভাব। পর্যটনশিল্পের এসব প্রতিবন্ধকতাকে অবশ্যই দূর করতে হবে। সেইসঙ্গে কৃষি পর্যটন হতে পারে নতুন মাত্রা। কৃষি পর্যটনশিল্পে ব্যক্তিপর্যায়ে আমরা উদ্যোগ নিতে পারি। এটা বেকারত্ব দূরীকরণের অন্যতম পন্থা হতে পারে। পর্যটনের সঙ্গে কৃষিকে সম্পৃক্ত করলে একদিকে যেমন পর্যটকেরা ভ্রমণ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে, সেইসঙ্গে কৃষিজ পণ্য ও বাজার সম্প্রসারণে কৃষি পর্যটন গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করবে। কৃষি পর্যটন হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম একটি চমৎকার আয়ের উৎস। কারণ আমাদের আছে নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু, আছে উর্বর ভ‚মি, আছে সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার সামর্থ্য। এরই মধ্যে আমাদের দেশে অপরিকল্পিতভাবেই কিছু কৃষি পর্যটন গড়ে উঠেছে, যেমন রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাগান, দিনাজপুরের লিচু বাগান, স্বরূপকাঠির পেয়ারা বাগান, যশোরের ফুলের বাগান, নরসিংদীর লটকন বাগানÑএমন আরও অসংখ্য কৃষি পর্যটন। দেশীয় পর্যটকদের কাছে ভ্রমণের জন্য এই জায়গাগুলো এরই মধ্যে বেশ পরিচিতি লাভ করে ফেলেছে। যথাযথ পদক্ষেপের মাধ্যমে এই ক্ষেত্রগুলো আরও প্রসারিত ও সমৃদ্ধ করা সম্ভব।
সব বয়সি মানুষের মধ্যেই গ্রাম ও প্রকৃতির প্রতি আলাদা আকর্ষণ থাকে। তাছাড়া তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে কৃষির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকনের স্পৃহা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইট-পাথরের শহর ছেড়ে, যান্ত্রিকতার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে সবাই হতে চাই শিকড়মুখী। পুকুরে সাঁতার কাটতে চাই, নিজ হাতে মাছ ধরতে চাই, ফল-ফলাদি আহরণ করতে চাই। আসলে প্রকৃতির মাঝে থাকার যে আনন্দ, তা উপভোগ করতে চাই। কৃষি পর্যটনটি এমনই ক্ষেত্র, যেটি শান্ত, নিরিবিলি আর সবুজে আচ্ছাদিত একটি জায়গা, যেখানে মানুষ দূষণমুক্ত হাওয়ায় তৃপ্তিসহকারে প্রশান্তি অনুভব করতে পারে। মানুষের অরগানিক আর বিষমুক্ত কৃষিপণ্যের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে, পেতে চাই ফার্ম ফ্রেশ ভেজিটেবলস। কৃষি পর্যটনের বদৌলতে আমরা এমন সুযোগ পেতে পারি। এতে একদিকে যেমন ভোক্তার কাছে কৃষক তার পণ্য বিক্রি করে ন্যায্যমূল্য পেতে পারে, অন্যদিকে ভোক্তাও অরগানিক অর্থাৎ বিষমুক্ত পণ্য কিনে জীবনমানের উন্নতি করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়য়ে কৃষি উদ্যোক্তাদের হাতে বা কৃষি বাণিজ্যিকীকরণের ফলে অনেকে বেসরকারি পর্যায়ে বিনিয়োগ করছে। তারা অনেকে খামার করছে নিজেদের বিনোদনের জন্য, হয়তো তারা সপ্তাহে একদিন সেখানে যায়। অর্থাৎ নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে এগুলো তারা গড়ে তুলছে। কিন্তু তারা যদি খামারগুলোয় নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি পরিকল্পনা করে পর্যটকদের জন্য, তাহলে এটি আমাদের দেশের জন্য অন্যতম একটি আয়ের উৎস হবে। এমন উদ্যোগ আমাদের ঢাকা শহর থেকে বের হওয়ারও একটি জায়গা হতে পারে। যেসব পরিবার মনে করে যে বাচ্চাদের নিয়ে, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাইরে বেড়াতে যাবে, ফার্ম ফ্রেশ ভেজিটেবলস, ফ্রুটস কিনে আনবে, তাদের প্রজš§কে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত করবে, কৃষিজ্ঞানে সমৃদ্ধ করবেÑতাদের জন্য কৃষি পর্যটন হবে অন্যতম ক্ষেত্র। এছাড়া আমাদের দেশের কৃষি উদ্যোক্তা ও সরকারি কৃষিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোরও বিপুল বিস্তৃত আবাদযোগ্য জমি রয়েছে। তারাও এমন পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে পারে কৃষি পর্যটন খামার। বাণিজ্যিক দিক থেকেও এমন উদ্যোগ অবশ্যই লাভজনক হবে। গত বছর পর্যটন দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘গ্রামীণ উন্নয়নে পর্যটন’। কৃষি পর্যটন যে প্রতিপাদ্যটির সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট, তা আর বলার বাকি রাখে না। আমরা যদি এই সম্ভবনাময় সুযোগকে কাজে লাগাতে পারি, তাহলে কৃষি ও কৃষকের অবস্থার যেমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটতে পারে, তেমনি পর্যটনশিল্পের গতিও ত্বরান্বিত হতে পারে।
আমাদের প্রজš§কে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে, অর্থাৎ কৃষির জ্ঞানে সমৃদ্ধ করতে, ফসলের সঙ্গে সমৃদ্ধ করতে, মাটির সংস্পর্শে আনতে এবং গাছগাছালির সবুজের সঙ্গে সখ্য তৈরি করতে, মাটির সঙ্গে নিবিড় বন্ধন গড়ে তুলতে, কৃষির প্রতি সম্মান ও কৃষির ঐতিহ্যকে নিজেদের মধ্যে লালন করতে কৃষি পর্যটন হতে পারে অন্যতম মাধ্যম। প্রকৃতির মাঝে থেকে আনন্দ উপভোগ করার যে অনুভ‚তি, তার সুযোগ আমরা খুব সহজেই পেতে পারি কৃষি পর্যটনের মাধ্যমে। তাছাড়া কৃষি পর্যটনের মাধ্যমে টেকসই উৎপাদন করার সঙ্গে সঙ্গে বহুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে, বিনির্মিত হতে পারে বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, যা হয়তো আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে!

শিক্ষার্থী
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..