প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

কৃষি বাঁচাতে প্রয়োজন শস্যবিমা নিশ্চিতকরণ

ইয়াছিন ইসলাম: কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। ফসল চাষের অনুকূল পরিবেশ বর্তমান থাকলে যে কোনো দেশের মোট জাতীয় আয়ের একটি বড় অংশ কৃষি থেকে আসার সম্ভাবনা থাকে। যেসব দেশে শিল্পের তেমন বিকাশ ঘটেনি এবং কৃষি-উপযোগী জমির জোগান রয়েছে, সেসব দেশের অধিকাংশ লোক কৃষিকাজে নিযুক্ত থেকে জীবিকা নির্বাহ করে। মূলত অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় মোট জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশ কৃষিকাজে নিযুক্ত, যেমন ভারতের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজে নিয়োজিত।

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বাংলাদেশে মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৮৫ লাখ ৭৭ হাজার হেক্টর বা দুই কোটি ১২ লাখ একর প্রায়। দেশের আয়তনের এই বিশাল পরিমাণ জমির চাষাবাদে নিয়োজিত রয়েছে বিশাল জনগোষ্ঠী। ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, শ্রমশক্তির  ৪০ দশমিক ৬২ শতাংশ এখনও কৃষিতে নিয়োজিত। কভিড সংকটকালে ২০২০-২১ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আমাদের দেশের আবহাওয়া অনবরত বদলে যাচ্ছে, ফলে কৃষিক্ষেত্রে নানারকম ফসলের সময়মতো উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষির গতি-প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে মারাত্মকভাবে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশের কৃষি প্রতিনিয়ত প্রকৃতির বৈরী পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে এগিয়ে চলছে। অসময়ে খরা ও বন্যার কারণে একদিকে কৃষক হারিয়ে ফেলছে অতি মূল্যবান ফসলসহ নানা জাতের বীজ, অন্যদিকে মাটি হারাচ্ছে ফসল উৎপাদনশীলতা। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি তথা জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের কৃষিনির্ভরশীল ক্ষুদ্র খামারভিত্তিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন করতে হলে কৃষির এসব সমস্যা নিরূপণ করে খাদ্য উৎপাদন ও নিরাপত্তার লক্ষ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা আমাদের জন্য খুব জরুরি। এছাড়া কৃষিক্ষেত্রে উন্নয়নের লক্ষ্যে টেকসই কৃষিপ্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও বৈরী আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থার প্রচলন প্রয়োজন। কৃষিপ্রযুক্তির উন্নয়ন ও উদ্ভাবনে আমরা কিছুটা সফল হলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করার জন্য আধুনিক প্রযুক্তির মারাত্মক অভাব এখনও রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, যেমনÑলবণাক্ততা, উচ্চ তাপমাত্রা, খরা কিংবা বন্যাসহিষ্ণু প্রযুক্তির অভাব লক্ষণীয়, যা টেকসই কৃষি উৎপাদনের পূর্বশর্ত।

এসব সমস্যার কারণে প্রতি মৌসুমেই ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে কৃষক। প্রতিনিয়ত আমাদের কৃষিব্যবস্থার ওপর নতুন নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরূপ প্রভাব দেখা যাচ্ছে। দেশের প্রায় তিন দশমিক পাঁচ মিলিয়ন হেক্টর কৃষিজমি প্রতি বছরই খরায় আক্রান্ত হয়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিগত ৪০ বছরে লবণাক্ত জমির পরিমাণ প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে। ফলে কৃষিব্যবস্থা এখন হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।

কৃষি ও কৃষকদের বাঁচাতে প্রয়োজন কৃষি ও শস্যবিমা। কৃষি ও শস্যবিমা হচ্ছে কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী ও কৃষির ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জন্য একটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কৃষিবিমা সুরক্ষার আওতায় থাকে কৃষক, মৎস্যচাষি, গবাদি পশুপাখি পালনকারী ও কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য চাষি। বছরের বিভিন্ন সময়ে দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ খরা, বন্যা, শিলাবৃষ্টি, ভূমিকম্প ও ঘূর্ণিঝড়ে কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের মারাত্মক ক্ষতি হয়। ফলে গোটা দেশের খাদ্য উৎপাদন ও অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব পড়ে। কৃষি ও শস্যবিমার মাধ্যমে কৃষি আয়ের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা এবং সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল থেকে কৃষি ও কৃষককে নিরাপত্তা বা সুরক্ষা প্রদান করা হয়ে থাকে। কৃষি ও শস্যবিমা একদিকে যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতিকে পুষিয়ে দিয়ে কৃষককে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে, অন্যদিকে কৃষিপণ্যের দামের পতনশীলতা থেকেও কৃষককে রক্ষা করে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শস্যবিমা পরিষেবার ব্যবস্থা রয়েছে, যা কৃষি ও কৃষককে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধানের প্রয়োজনীয় সাহায্য ও সহযোগিতা দিয়ে থাকে। এই ব্যবস্থা চালু থাকলেও প্রতিনিয়তই দেখা যায় দুর্যোগে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয় কৃষক। বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংঘবদ্ধ চক্রও কৃষকের করুণ অবস্থার জন্য কম দায়ী নয়। তাদের দৌরাত্ম্যে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম পায় না কৃষক। দেশের কৃষি ও কৃষকদের বাঁচাতে তাই ভেঙে দিতে হবে এই অসাধু সিন্ডিকেট। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সব কৃষককে নিয়ে আসতে হবে শস্যবিমার আওতায়। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। তাই কৃষকদের বাঁচিয়ে রাখতে না পারলে দেশ মহাসংকটের সম্মুখীন হবে। মনে রাখতে হবে‘কৃষি বাঁচলে বাঁচবে দেশ, গড়বে সোনার বাংলাদেশ।’

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়