মত-বিশ্লেষণ

কৃষ্ণপুর গণহত্যা দিবস আজ

কাজী সালমা সুলতানা: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তার দোসররা যে গণহত্যা চালিয়েছিল, তা ইতিহাসে বিরল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম। মাত্র ৯ মাসে ৩০ লাখ মানুষ পৃথিবীর কোনো যুদ্ধে জীবন দেয়নি। শুধু তাই নয়, হত্যার সঙ্গে নির্যাতন করা হয়েছে ছয় লাখেরও বেশি নারীকে। এছাড়া নিপীড়িত হয়েছে অসংখ্য মানুষ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ-দেশীয় দোসররা কত ঘরবাড়ি ভস্মীভূত করেছিল তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কত যে নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তারও হিসাব পাওয়া কঠিন ছিল। এসব হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশই ঘটেছে রাজাকার, আলবদর, আলসামসদের সহায়তায়। এক রাষ্ট্রের নাগরিক হলেও পাকিস্তানিদের পক্ষে সম্ভব ছিল না দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটানো। এমনি একটি নারকীয় গণহত্যা ঘটে ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জের কৃষ্ণপুরে। এই দিনে পাকহানাদার বাহিনী হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার হিন্দু এলাকা কৃষ্ণপুর গ্রামে ১২৭ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে ব্রাশফায়ার করে নির্মমভাবে হত্যা করে। রাজাকারের সহযোগিতায় এই হত্যাকাণ্ডে আহত হয়েছিলেন শতাধিক ব্যক্তি। এত লাশ একসঙ্গে সৎকারের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় পাশের নদী দিয়ে লাশ ভাসিয়ে দিয়েছিলেন স্থানীয় নারীরা। সেই বিভীষিকাময় দিনের কথা মনে করে আজও অনেকের মন কেঁপে ওঠে।
কৃষ্ণপুর গ্রামটি লাখাই উপজেলার হবিগঞ্জ জেলার শেষ প্রান্তে অবস্থিত। লাখাই থানা থেকে কৃষ্ণপুর গ্রামের দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণে। যোগাযোগের তেমন ভালো মাধ্যম ছিল না। বর্ষায় নৌকার আর শীতকালে হেঁটে চলাচল করতে হতো। গ্রামে শতকরা ৯৫ ভাগ লোকই শিক্ষিত, হিন্দুধর্মাবলম্বী অনেক। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ছয় মাস কৃষ্ণপুর গ্রামের লোকরা সাধারণভাবে জীবনযাপন করেছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় গ্রামটি প্রত্যন্ত এলাকায় হওয়ায় অনেক হিন্দু শরণার্থী হিসেবে কৃষ্ণপুর গ্রামে আশ্রয় নেয়।
যদিও পাকিস্তানি দখলদারি সেনাবাহিনী হবিগঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং লাখাই পর্যন্ত এসে পৌঁছে যায়, তবে তারা কৃষ্ণপুরের দিকে অগ্রসর হয়নি। ১৯৭১ সালের আগস্টে, পাকিস্তানি দখলদারি সেনাবাহিনী বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার অন্তর্গত এলাকা পর্যন্ত হিন্দুদের ওপর গণহত্যাসহ যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত হয়।
১৮ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা থেকে ৫টার দিকে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার পাক সেনা ক্যাম্প থেকে একটি স্পিডবোট ও আট থেকে ১০টি বাওয়ালি নৌকায় করে ১০ থেকে ১৫ জনের পাকহানাদার
বাহিনী ওই গ্রামে আসে। পাকহানাদাররা দুটি স্পিডবোটে করে দুটি দলে আসে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় লাখাই উপজেলার মুড়াকরি গ্রামের লিয়াকত আলী, বাদশা মিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার ফান্দাউকের আহাদ মিয়া, বল্টু মিয়া, কিশোরগঞ্জের লাল খা, রজব আলী, সন্তোষপুরের মোর্শেদ কামাল ওরফে শিশু মিয়ার নেতৃত্বে ৪০ থেকে ৫০ জনের একদল রাজাকার-আলবদর। আর তাদের পরামর্শেই এ গ্রামে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। গ্রামে ঢুকে একটি দল নৌকা থেকে নেমে নির্বিচারে গুলি ছুড়তে শুরু করে। অন্য দলটি তখন গ্রাম এবং নৌকা পাহারা দিতে থাকে। চণ্ডীপুরে মাত্র ১৬টি পরিবারের বাস ছিল। কৃষ্ণপুর এবং পার্শ্ববর্তী চণ্ডীপুর গ্রামটি হিন্দু অধ্যুষিত ছিল। সে গ্রামের সব বাসিন্দাকে একই লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়। ৪৫ জন হিন্দু এতে মারা যায়। এ গণহত্যায় মাত্র দুজন ব্যক্তি বেঁচে যায়। লালচাঁদপুর এলাকায় মধু নমঃশূদ্রের বাড়িতে ৪০ জন হিন্দুকে বেষ্টন করে রাখা হয়। তাদের সবকিছু লুটপাটের পর একই লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।
সে রাতে পাকবাহিনী অন্তত ১৩১ পুরুষকে স্থানীয় কমলাময়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে। পরে আগুন দিয়ে গ্রামের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং লুটপাট করে। এ ছাড়া গ্রামের নিরীহ নারীদের সম্ভ্রমহানি করে। এ হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতন সেদিন বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলে। ওই সময় গ্রামে ঢুকে রাজাকাররাও গুলি চালাতে থাকে এবং গ্রামে লুটপাট শুরু করে। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বন্দুকের মাথা টিকিয়ে গ্রামবাসীদের নগদ টাকা-পয়সা এবং স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে যায়। রাজাকারদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা পুরো গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়। হানাদারদের হাত থেকে বাঁচতে গ্রামের শত শত নারী-পুরুষ মজা পুকুরে কচুরিপানার নিচে আশ্রয় নেন। হানাদাররা চলে গেলে তারা হত্যাযজ্ঞ স্থল থেকে লাশগুলো উদ্ধার করে স্থানীয় বলভদ্র নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে গ্রাম ত্যাগ করেন। এদিন হানাদারদের গুলি খেয়েও মৃতের ভান করে মাটিতে পড়ে থেকে প্রাণে রক্ষা পান প্রমোদ রায়, নবদ্বীপ রায়, হরিদাস রায় ও মন্টু রায়। তারা সারা জীবনের জন্য বিকলাঙ্গ হয়ে পড়েন। ওইদিন নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে হানাদারদের গুলিতে নিহতদের লাশের সৎকার না করে স্থানীয় বলভদ্র নদীতে ফেলে দিয়ে সবাই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। হানাদার বাহিনীর গুলিতে বাম হাত হারানো মন্টু রায় ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে না ফেরার দেশে চলে যান।
তবে স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এখানকার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কিংবা আহত মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম নেই গুলি খেয়েও বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের। নিহত শহীদের স্মরণে নির্মাণরত বদ্ধভূমির কাজও গত দুই বছরের সমাপ্ত হয়নি। আজও দিবসটি সরকারিভাবে দিবসটি পালন করা হয় না। ২০১৭ সালে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে দুই লাখ টাকা অনুদান নিয়ে ও গ্রামবাসীর কাছ থেকে চাঁদা তুলে নির্মাণ হচ্ছে স্মৃতিস্তম্ভ। এতেও খুশি শহীদ পরিবারের লোকজন।
২০১০ সালের ৪ মার্চ বেঁচে যাওয়া হরিদাস রায় হবিগঞ্জ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে লিয়াকত আলী এবং অন্যান্য রাজাকারদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ১২ আগস্ট ২০১০, কৃষ্ণপুর গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম মামলা হিসেবে সিলেট বিভাগ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দ্বারা গৃহীত হয়।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যারা স্বজন-সম্পদ হারিয়েছেন, তাদের দুঃখ-যন্ত্রণা কখনও ভুলে যাওয়ার নয়।
এমন অসংখ্য হত্যাকাণ্ড ঘটেছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে। অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত
আমাদের মহান স্বাধীনতা। আজকের এই দিনে
গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি কৃষ্ণপুর গণহত্যার শিকার সেসব শহীদকে।

কৃতজ্ঞতা: ১৯৭১ গণহত্যা ও নির্যাতন আর্কাইভ ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ট্রাস্ট

গণমাধ্যমকর্মী

সর্বশেষ..