দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

কেউ সারা জীবন চাকরি করবে আর কেউ বেকার থাকবে!

মোহাম্মদ আবু নোমান: যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি না পেয়ে লাখ লাখ বেকারের রাতের ঘুম হারাম হয়ে রয়েছে পরিবারের ভরণ-পোষণের চিন্তায়। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো রেজাল্ট করে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেওয়ার পরও বয়সের অজুহাতে যখন কেউ চাকরিতে প্রবেশ করতে পারে না, তখন এ সুন্দর পৃথিবীটা তার জন্য কবর এবং নিজেকে জিন্দা লাশ মনে হওয়াই স্বাভাবিক। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫৭ হাজারের বেশি শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এনটিআরসিএ প্রতিবছর পরীক্ষা নিয়েও নিয়োগের বেলায় নানা রকম টালবাহানা করায় লাখ লাখ নিবন্ধনধারী বেকার কষ্টে দিন পার করছেন। সরকারি চাকরিতে ঢোকার বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩৫ বছর করার দাবিতে গত কয়েক বছর ধরেই আন্দোলন করে আসছে বিভিন্ন সংগঠন। তবে শেষ পর্যন্ত তা সরকারের সাড়া পায়নি। কভিড-১৯ মহামারির মধ্যে গত ২৫ মার্চ যাদের বয়স ৩০ বছর পূর্ণ হয়েছে, সম্প্রতি তাদেরও সরকারি চাকরিতে আবেদনের সুযোগ দিয়েছে সরকার।

করোনায় চাকরিপ্রত্যাশীদের বয়সে ছাড়

করোনা দুর্যোগের মধ্যে চাকরিপ্রত্যাশীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বয়সের ক্ষেত্রে পাঁচ মাস ছাড়ের সরকারি সিদ্ধান্ত শুধু যৌক্তিকই নয়, আশাপ্রদও বটে। এর মাধ্যমে করোনা প্রাদুর্ভাবের মধ্যে প্রায় পাঁচ মাস সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না হওয়ায় ত্রিশোর্ধ্ব হাজারো চাকরিপ্রত্যাশীর বর্ধিত সময়ে চাকরির আবেদনের সুযোগই তৈরি হবে না; একই সঙ্গে তাদের পরিবারও উপকৃত হতে পারে। একই সঙ্গে সরকার পাঁচ মাস ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে যে সদিচ্ছা প্রদর্শন করেছে, চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা যৌক্তিক ও স্থায়ীভাবে বাড়িয়ে সে পথ আরও প্রশস্ত করতে পারে। ২৫ মার্চের আগে যেসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সার্বিক প্রস্তুতি শেষ করেও তা প্রকাশ করতে পারেনি, সেসব নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে গত ২৫ মার্চ পর্যন্ত যাদের বয়স ৩০ পূর্ণ হয়েছে তাদেরও আবেদনের সুযোগ দিতে বলা হয়েছে। সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ‘এটা খুবই জটিল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কোনো না কোনো জায়গা থেকে সীমারেখা টানতেই হবে। তাই যারা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কোনো উদ্যোগ নেয়নি, তাদের জন্য এই সুযোগ দেওয়া যৌক্তিক মনে হচ্ছে না। যেসব প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞপ্তির জন্য ছাড়পত্র নিয়ে রেখেছিল, শুধু তাদের জন্যই এই সুযোগ রাখাটা যুক্তিযুক্ত মনে করা হচ্ছে। আর উম্মুক্তভাবে সবার জন্য এই সুযোগ রাখতে গেলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা আছে।’ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা চাকরিপ্রত্যাশীদের বয়সে ছাড়ের বিষয়টিকে খুবই জটিল মনে করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করছেন। এর আগে কেউ কেউ বলেছিলেন, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ালে পেনশনজনিত অনেক জটিলতা হবে। ভালো কথা! বেকারত্ব সমস্যার কারণে কি দেশে মোটেই কোনো বিশৃঙ্খলা, জটিলতা ও পারিবারিক অশান্তি তারা অনুভব করেন না? ভুলভাল যুক্তি দেখিয়ে মেধাবী তরুণদের ন্যায্য অধিকার হরণ ও তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎকে নষ্ট করার অধিকার কারও নেই।

চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধি

অনেক পরিবার বসতভিটা বিক্রি করে ছেলেমেয়েকে পড়ালেখা করিয়েছেন। এখন রাষ্ট্র বলে দিল তোমার বয়স ৩০, অতএব তুমি বাতিল! ডিগ্রির কোনো মূল্য নেই! ৩০ বছর হলে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করা যাবে না, এটা অমানবিক নয় কি? তাহলে এসব বেকার কী করবে? কোথায় যাবে? তাদের বিকল্প কী? তারা কি রাষ্ট্রের নাগরিক নয়? রাষ্ট্র তাদের কোনো দায়িত্ব নেবে না? চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়িয়ে অবসরের বয়স কমিয়ে ৫৮ বছর করলে ক্ষতি কী? এতে দ্বিগুণ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি সরকারি কর্মকাণ্ডেও গতি বাড়বে। এমন তো নয় যে, দেশে ৫০ লাখ চাকরি আছে, আর বেকার মাত্র ৩০ লাখ! পড়াশোনা শেষ করার পর সরকারি চাকরির বাজার বুঝতে বুঝতেই কোনো শিক্ষার্থীর বয়স ৩০ বছর হয়ে যায়। সরকার যেমন করোনার প্রভাব বিবেচনায় বয়সে ছাড় দেওয়ার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তেমনি যৌক্তিকতার বিচারে স্থায়ীভাবে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির বিষয়ে ভাবাও প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। বিশ্বের অনেক দেশেই সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। এ দেশেও বয়সসীমা বৃদ্ধি করা হলে কারও ক্ষতির আশঙ্কা তো নেই-ই, বরং যারা সরকারি চাকরিতে নিজেদের মেধা প্রয়োগ করতে চান, তাদের বাড়তি সুযোগ সৃষ্টি হবে।

প্রবেশ অবসরের বয়স

বর্তমানে শিক্ষিত যুবকদের সংখ্যার তুলনায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকায় চাকরিপ্রার্থীরা কয়েকবার চেষ্টা করার সুযোগ প্রত্যাশা করে। এ ধরনের সুযোগ সৃষ্টি করতে সরকারের কোনো অসুবিধা থাকার কথা নয়। পাঠাভ্যাসবিমুখতার এ সময়ে চাকরিপ্রার্থী যুবসম্প্রদায় কর্মসংস্থানের আশায় যে জ্ঞানচর্চা শুরু করে, তাতে উৎসাহিত করা ভালো দিক। অবসরের পর রাষ্ট্রদূত, আমলা ও উপদেষ্টাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে বয়সের বালাই নেই; কিন্তু যোগদানের বয়সে এত জটিলতার বিষয় আসে কেন? কেউ সারা জীবন চাকরি করবে, আর কেউ বেকার থাকবে! এক দেশে তো দুই আইন চলতে পারে না! চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর দরকার নেই! আর যারা চাকরিতে আছেন, তাদের বেতন দফায় দফায় বাড়ানোই চলতে থাকুক! বয়স হলে মানুষের কাজের গতিও কমে যায়। চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়াতে জটিলতা থাকলে পূর্ণ অবসরেরও একটা নির্দিষ্ট বয়সসীমা কেন করা হয় না? বয়োজ্যেষ্ঠরা অবসরে গেলে অপেক্ষাকৃত তরুণ চাকরিজীবীদের পদপ্রাপ্তি তথা পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হয়। বয়োজ্যেষ্ঠরা দীর্ঘদিন পদ ধরে রাখলে তরুণেরা আরও বেশি সময় পদোন্নতিবঞ্চিত থাকবে। যুবসম্প্রদায়ের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র ও সময় প্রসারিত করার উদ্দেশ্যে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩২ বা ৩৫ বছরে উন্নীত করা অযৌক্তিক নয়। অবসরের সময় বাড়লে সংগত কারণে চাকরিতে নতুনদের প্রবেশের সুযোগ কমে আসে। এজন্য বয়োজ্যেষ্ঠদের সেবা একটি যৌক্তিক বয়স পর্যন্ত পেতে এবং নতুন প্রজন্মের জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে চাকরি থেকে অবসরের বয়স ৫৮ বছর করা যেতে পারে।

সংসদের মেয়াদ পাঁচ থেকে ১০ বছর

গত নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষমতাসীনরা বয়স বাড়ানোর বিষয়টি রেখেছিলেন। এখন নির্বাচন শেষ! সরকার আমলাতান্ত্রিক তন্ত্রমন্ত্রের গোলকধাঁধায় ডুবে প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষিত বেকার ও কোটি শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক ও সময়ের জনপ্রিয় দাবিকে অগ্রাহ্য করে ছাত্রদের বিরুদ্ধেই অবস্থান করছে। সরকারি চাকরিতে প্রবেশে বয়সসীমা ৩০ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩৫ বছর করার একটি বেসরকারি সিদ্ধান্তের প্রস্তাব এর আগে প্রত্যাখ্যান করেছে জাতীয় সংসদ। ২০১৯ সালের ২৫ এপ্রিল বগুড়া-৭ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রেজাউল করিম (বাবলু) ওই প্রস্তাবটি এনেছিলেন। কিন্তু ‘না’ বোধক কণ্ঠভোটেই তার প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়। প্রবাদ আছে ‘অভাগার দু’চোখ যেদিকে যায়, সাগর শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে যায়!’ লাখ লাখ তরুণ ও যুবকের ভবিষ্যৎ একটি (পরিকল্পিত!) ‘না’ বোধক ধ্বনিতেই নিঃশেষ করে দেওয়া হলো? তখন যদি সংসদের মেয়াদ পাঁচ থেকে ১০ বছর করার প্রস্তাব উত্থাপন করা হতো, তাহলে কণ্ঠভোটে পাস হতে ‘দেড় সেকেন্ড’ও লাগত কি! রেজাউল করিম তার বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘বিশ্বের ১৯২টি দেশের মধ্যে ১৫৫টি দেশে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৫৫ বছর, কোথাও কোথাও ৫৯ বছর পর্যন্ত। দেশে এখন শিক্ষিত বেকার ২৮ লাখের বেশি। শিক্ষিত বেকার পরিবারের জন্য বোঝা। শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের জন্য আন্দোলন করেছিল। এখন চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর জন্য আন্দোলন করছে। চাকরি না পেয়ে অনেক যুবক মাদকসেবন, ছিনতাই ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ বছর করা উচিত হবে।

পড়াশোনা করে কী লাভ?

চাকরিতে প্রবেশের বয়স না বাড়ানোয় এই লেখকের কাছে এক চাকরিপ্রার্থী বলেন, ‘মাঝে মাঝে দুঃখ হয়, কী জন্য রাজনীতিতে ঢুকলাম না। পড়াশোনা করে কী লাভ? লেখাপড়া শেষ করে বয়স ৩০ হয়েছে বলেই আমরা ইনভেলিড হয়ে গেলাম; আর ৮০-৯০ বছরেও এমপি, মন্ত্রী ও উপদেষ্টা হওয়া যায়! লেখাপড়া ও চাকরি করার চিন্তা বাদ দিয়ে চেয়ারম্যান, এমপি ও মন্ত্রী হওয়ার চিন্তা করাই ভালো ছিল! কেননা সেখানে বয়সের হিসাব নেই। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে আরও বলেন, যারা সরকারি চাকরি করেন তাদের সব দাবিই মেনে নেওয়া হয়, অথচ হাজার হাজার বেকারের একটিমাত্র দাবি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ করা, সেটা আর মানা গেল না। সরকার রোহিঙ্গাদের প্রতি যতটুকু দরদ দেখিয়েছে, শিক্ষিত বেকার যুবকদের ওপর ততটুকু দরদও দেখায়নি।’

সরকারি অফিসে টাকার ব্যাগের লেনদেন

দেশে এখন মেধার চেয়ে বয়সের দাম, টাকার দাম, খালুর দাম ও মামার দাম বেশি। খুঁটির জোরওয়ালা বড় পরিচয়ধারী কতিপয় অদক্ষ, অলস ও অসৎ লোকজন বোঝেন, সরকারি চাকরি একবার হলেই সারা জীবন নিজে ও পরিবার নিয়ে আরামে কাটিয়ে দেওয়া যাবে। এজন্য বিভিন্ন পরিচয়ে সরকারি অফিসে চলে টাকার ব্যাগের লেনদেন ও দলীয়করণ। অফিসে ঢুকতে দলীয় স্লোগান ও বের হতে টাকা আর ‘স্লোগানের শিল্পীদের’ জনসেবার কোনো তোয়াক্কা করতে হয় না। টাকা দিয়ে ঢুকলে তার একমাত্র মিশন থাকে সুদে-আসলে সেই টাকা তুলে নেওয়া এবং রাজনীতির পরিচয়ে অসৎদের নিয়ে রাজত্ব ও দলীয় বলয় কায়েম করা। এভাবেই সরকারি অফিসকে বানানো হচ্ছে দলীয় লোকদের অভয়ারণ্য রাজধানীর মতিঝিলের সরকারি ব্যাংক ও অফিসগুলোর দেয়ালে কিংবা আশেপাশে দলীয় পোস্টার ও ব্যানারের বিস্তারই তার প্রমাণ।

রাজনীতিকদের ছেলেমেয়েরা বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে সেখানেই সেটেল্ড হয়ে যাচ্ছে, না হয় দেশে এসে কোনোরকম প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করেই পোষ্য কোটায় চাকরি পেয়ে সোনার চামচ মুখে গুঁজে বসে আছে। অভ্যন্তরীণ প্রমোশন ও সব পরীক্ষা সবার জন্য উম্মুক্ত না হলে দলীয় ও অলস লোকের অভয়ারণ্য এভাবে চলতেই থাকবে। এমপি, মন্ত্রী, আমলা ও মামু-খালুর জোরে জীবনে শুধু একটি পরীক্ষা দিয়েই চিরস্থায়ী নিয়োগ কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। যারা সংসদে আছেন, তাদের ছেলেমেয়েদের চাকরির জন্য কারও দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় কি? আমলা, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের ছেলেমেয়েদের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেওয়া হোকÑতখনই দেখা যাবে, বাবার সাহায্য ছাড়া কত দূর যেতে পারে!

ফিল্যান্স লেখক

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..