এসএমই

কেওড়ায় রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা

বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার পূর্বে বিষখালী ও পশ্চিমে বলেশ্বর নদী। দুই নদী ও সাগরের মোহনায় হরিণঘাটা ও লালদিয়া বন। সুন্দরবন সংলগ্ন হরিণঘাটার মধ্য দিয়ে দুই ঘণ্টা পায়ে হেঁটে বন পার হলেই চোখে পড়ে লালদিয়া। বনের পূর্ব প্রান্তে সমুদ্র সৈকত, যা নজর কাড়ে সবার। এছাড়া রয়েছে সবুজে ভরা কেওড়া গাছ। এ গাছের সঙ্গে আমরা কম-বেশি সবাই পরিচিত। বনাঞ্চলের উঁচু গাছগুলোর মধ্যে কেওড়া অন্যতম। এ গাছ উপকূলীয় এলাকার পরিবেশের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
কেওড়া উপকূলীয় অঞ্চলে পরিচিত একটি ফল। সুন্দরবনের সহজলভ্য এ ফল উপকূলীয় মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। সবুজ রঙের ফলটির ওপরের মাংসাল অংশ স্বাদে টক। এ ফলে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে। এর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ব্যাপক। কেওড়া রক্তে কোলেস্টেরল ও শরীরের চর্বি কমাতে সহায়তা করে। এতে কিছু এনজাইম রয়েছে, যা বিশেষত বদহজমে ব্যবহৃত হয়।
টক স্বাদের ফলটি বহুকাল আগে থেকেই বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জনপ্রিয় খাদ্য। কাঁচা ফল লবণসহকারে খাওয়া যায়। এ ফল দিয়ে কেওড়াজল তৈরি করা হয়, যা বিভিন্ন রান্নায় ব্যবহৃত হয়। কেওড়ার চাটনি, টক আর ডাল রান্না করে রসনা মেটান অনেকে। এছাড়া ফলটি যে কোনো মানুষের স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব রাখতে সক্ষম। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয় এ ফল। অনেক সময়ে রফতানিও করা হয়।
সুন্দরবনে উৎপন্ন মধুর একটি বড় অংশ আসে কেওড়ার ফুল থেকে। তাই এ গাছটি হয়ে উঠতে পারে লবণাক্ততায় আক্রান্ত কর্দমাক্ত জমির বিশেষ ফসল। এ গাছ উপকূলীয় মাটির ক্ষয় রোধ করে মাটিকে দৃঢ় করে। উর্বর করে জমি। নানাভাবে মাটিকে রক্ষার পাশাপাশি লবণাক্ত পরিবেশের উন্নয়ন ঘটাতে পারে। কেওড়া গাছের শ্বাসমূল মাটির ওপরে উঠে আসে, প্রচুর ফল ধরে গাছে। কেওড়া ফল দেখতে অনেকটা ডুমুরের মতো। হরিণঘাটাসহ বিষখালী ও বলেশ্বর নদের তীরবর্তী বনাঞ্চলের কয়েক হাজার বানর ও হরিণ কেওড়া গাছের পাতা ও ফল খেয়ে বেঁচে থাকে।
সরকারিভাবে এ ফলটি বিক্রি অবৈধ হলেও অনেকে গোপনে অবৈধভাবে কেওড়া পাচার করে। অবশ্য অনেক দরিদ্র পরিবার এ ফল আহরণ ও বিক্রি করে সচ্ছল হয়েছে। প্রতি বছর এ বর্ষা মৌসুমে পাথরঘাটা থেকে প্রচুর ফল বিক্রি করা হয়ে থাকে। তবে এর বাণিজ্যিক উৎপাদনে সরকারি বৈধতা পেলে কেওড়া গাছ ও ফল ঘিরে নতুন শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ সেলের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কেওড়ার ফলে রয়েছে প্রায় ১২ শতাংশ শর্করা, চার শতাংশ আমিষ, এক দশমিক পাঁচ শতাংশ ফ্যাট, ভিটামিন ‘সি’ ও এর নানা ডেরিভেটিভ। ফলটি পলিফেনল, ফ্লাভানয়েড, অ্যান্থোসায়ানিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও আনস্যাচুরেটেড ওমেগা ফ্যাটি এসিড, বিশেষ করে লিনোলেয়িক এসিডে পূর্ণ। তাই মনে করা হয়, ফলটি শরীর ও মনকে সতেজ রাখার পাশাপাশি নানা রোগ প্রতিরোধে কার্যকরী। চায়ের মতো এ ফলটিতে ক্যাটেকিনসহ বিভিন্ন ধরনের পলিফেনল প্রচুর পরিমাণে রয়েছে।
আমলকী, আপেল ও কমলা ফলের তুলনায় বেশি পরিমাণ পটাশিয়াম, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেশিয়াম ও জিংক রয়েছে কেওড়ায়। বাংলাদেশে প্রাপ্ত ফলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পলিফেনল রয়েছে আমলকীতে, এরপরই কেওড়ার অবস্থান। ফলটিতে সমপরিমাণ আপেল ও কমলার তুলনায় বেশি পলিফেনল ও পুষ্টি উপাদান রয়েছে। পলিফেনল ডায়াবেটিস, ক্যানসার, আর্থ্রাইটিস, হৃদরোগ, এলার্জি, চোখের ছানি, বিভিন্ন ধরনের প্রদাহ সৃষ্টিতে বাধা দেয়। এ ফলে রয়েছে ডায়রিয়া ও ডায়াবেটিস প্রতিরোধী এবং ব্যথানাশক গুণাগুণ। ফলটি ডায়রিয়া, আমাশয় ও পেটের পীড়ার জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়াকে দমন করে। তাছাড়া এ ফলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পালমিটিক এসিড, অ্যাস্করবাইল পালমিটেট ও স্টিয়ারিক এসিড, যা খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও তৈরি খাদ্য সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়।
বন বিভাগের পাথরঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, জোয়ার-ভাটা হয় এমন চরভরাটি জমিতে যদি বাণিজ্যিকভাবে কেওড়া চাষ করা যায়, তাহলে একদিকে বাঁধ, পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের পাশাপাশি এর কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। ফল বাজারে বিক্রি করে অধিক লাভবান হওয়া সম্ভব। এখন পর্যন্ত কেওড়া গাছ ও ফল পাচার-বিক্রি আইনত দণ্ডনীয়। সরকার বাণিজ্যিকভাবে এটি চাষের ঘোষণা দিলে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মানুষের জীবনযাত্রায় অর্থনীতির নতুন দিগন্তের সূচনা হতে পারে।

ইমরান হোসাইন, পাথরঘাটা (বরগুনা)

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..