দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

কেডিএস গ্রুপের রোষানল থেকে বাঁচতে এক বাবার আকুতি!

এক বছরে ২৫ মামলা দিয়ে হয়রানি

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামভিত্তিক কেডিএস গ্রুপের মালিকানাধীন কেওয়াই স্টিল মিলের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মুনির হোসেন খান। যার হাত ধরে এ প্রতিষ্ঠানটি উন্নতির শিখরে উঠেছে, তার বিরুদ্ধেই দেওয়া হলো একের পর এক ২৫টি মামলা। যে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার প্রসারের জন্য যিনি দিন-রাত কাটাতেন কারখানা কিংবা অফিসে, সেই প্রতিষ্ঠানেরই কর্তাব্যক্তির রোষানলে পড়ে তার দিন-রাত এখন কাটছে কারাগারের ভেতরে। এসব মামলায় যখনই তিনি জামিন পান, তখনই তার নামে দেওয়া হয় নতুন মামলা। শুধু মুনির হোসেন খানই নন, কেডিএস গ্রুপের এসব মামলার আসামি করা হয়েছে তার বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন খান ও তার ছোট ভাইকেও। অথচ তারা কখনও কেডিএস কর্মকর্তা ছিলেন না।

গতকাল সকালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন করে এসব তথ্য তুলে ধরেন চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেন খান। তিনি বলেন, ‘কেডিএস গ্রুপের আক্রোশে পড়ে গত এক বছর ধরে বিনা বিচারে জেলে আছে আমার সন্তান মুনির হোসেন খান। সে আমেরিকান পাসপোর্টধারী একজন নাগরিক। তার দাদা মুসলিম খান কলকাতা আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গ্র্যাজুয়েট। আমি মোয়াজ্জেম হোসেন খান ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের তৃতীয় ব্যাচের ছাত্র এবং চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমির দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র। আমি ক্যাপ্টেন মোয়াজ্জেম হোসেন খান হিসাবে সুপরিচিত। আমার ছেলে মুনির হোসেন চট্টগ্রামের সেন্ট প্লাসিডস স্কুলের ছাত্র। পরে ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ব্যাংক অব আমেরিকা ফ্লোরিডায় সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে ২০০৬ সাল পর্যন্তু চাকরি করে।’

মোয়াজ্জেম হোসেন খান বলেন, ‘২০০৭ সালে মুনির হোসেন তার স্কুলবন্ধু কেডিএস গ্রুপের কেওয়াই স্টিলসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম

 রহমানের অনুরোধে দেশে এসে কেওয়াই স্টিল মিলের নির্বাহী পরিচালক হিসাবে যোগদান করে। অল্প সময়ে কোম্পানির উন্নতির ফলে মুনির হোসেন খানকে নির্বাহী পরিচালকের পদ থেকে পেইড ডাইরেক্টর করা হয়। তখন এই কোম্পানির মূলধন ছিল ৩০০ কোটি টাকা, যা ২০১৮ সালে তা দাঁড়ায় এক হাজার ৫০০ কোটি টাকায়। তার রক্ত-ঘাম-মেধায় এই প্রতিষ্ঠান দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় টিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে (মুরগি মার্কা ঢেউটিন) পরিণত হয়। এতে মুনির হোসেনের এই সাফল্যের কথা স্টিল জগতে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। অথচ বন্ধুর অনুরোধে আমেরিকার মতো উন্নত দেশের জীবনযাপন, উন্নত দেশে সন্তানদের লেখাপড়া এবং সন্তান-সন্ততির উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা না ভেবে বাংলাদেশে এসে তার আজকের এই পরিণতি। তার দুই সন্তান ও স্ত্রী আজ অমানবিক জীবনযাপন করছে।’

মোয়াজ্জেম হোসেন আরও বলেন, কেডিএসের মতো বড় কোম্পানির ক্ষমতার কথা মাথায় রেখে ভয়ে আমার ছেলে আর কোনো প্রতিবাদ করেনি। তবে বিষয়টি উল্লেখ করে তার স্কুলবন্ধু সেলিম রহমানকে ২০১৮ সালের ১০ মে একটি ইমেইল করে। মেইলে সে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে জানতে চায়। তার সঙ্গে দেখা করতে চায়। কিন্তু কোনো উত্তর পায়নি। সেলিম রহমান ও খলিলুর রহমানের সঙ্গে বারবার দেখা করার অনুরোধ জানালেও তারা দেখা দিতে রাজি হননি। মেইলে আমার সন্তান তাদের আরও জানিয়েছে, সে সজ্ঞানে কখনও কোম্পানির স্বার্থবিরোধী কোনো কাজ করেনি এবং কাউকে করতেও বলেনি। কিন্তু তারা তার সঙ্গে কোনো ধরনের কথা বলতেও রাজি হয়নি। চিঠিতে মুনির হোসেন আরও উল্লেখ করে, সেলিম রহমানের নির্দেশেই ২০১৮ সালের ২০ জুন পদত্যাগপত্র মেইল ও রেজিস্ট্রি ডাকযোগে পাঠায় এবং ফোন করে দেখা করার চেষ্টা করে। ২০১৮ সালের ৪ ডিসেম্বর আরও একটি মেইল দেয়। ওই মেইলেও তাদের সঙ্গে দেখা করার আবেদন করে এবং তার সব পাওনা ও বকেয়া বেতনের জন্য আবেদন করে। বারবার ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করে। কিন্তু তারা কোনো সাড়া দেয়নি।

এরপর ২০১৯ সালে মুনির হোসেন অ্যাপোলো স্টিলের পরামর্শক হিসেবে যোগদান করে। কোম্পানিটি পরে মুনিরের নেতৃত্বে কেওয়াই স্টিলের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। এতে তারা আরও ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে। এই কোম্পানি ছেড়ে দেওয়ার জন্য নানা হুমকি দিতে থাকে। তাতে ব্যর্থ হয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি অংশকে ব্যবহার করা শুরু করে কেডিএস গ্রুপ।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, ২০১৯ সালের ২৫ নভেম্বর চট্টগ্রামের বায়েজিদ থানায় প্রথমে একটি গাড়ি চুরির মামলা দেয় মুনিরকে। মামলায় যে সময়টা উল্লেখ করা হয়েছে সে সময় মুনির ঢাকায় আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ছিল। ওই সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ স্কুল থেকে সংগ্রহ করে আদালতে জমা দেওয়া হয়। কিন্তু এই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এই মামলায় জামিনের জন্য উপস্থিত হলে তারা আরও দুটি ফৌজদারি মামলা দিয়ে তাকে জেলে পাঠায়। সেই থেকে মুনির জেলে আছে। তার একটি মামলায় জামিন হলে তার আগেই আরেকটি মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। গাড়ি চুরির মামলায় বায়েজিদ থানা পুলিশ তাকে তিনবার রিমান্ডেও আনে। তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের বায়েজিদ থানায় পাঁচটি, ঢাকার গুলশান থানায় একটি এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৯টি মামলা করেছে কেডিএস গ্রুপ। এসব মামলার মধ্যে মুনির এখন ১৯টিতে জামিনে আছে। বায়েজিদ থানার গাড়ি চুরির মামলা ছাড়া বাকি সব মামলা প্রায় একই রকম অভিযোগ। এসব হয়রানিমূলক মামলার কথা জানিয়ে বাংলাদেশস্থ আমেরিকান দূতাবাসে চিঠি দিয়েছি। নিত্যনতুন মামলায় মুনিরের পাশাপাশি তাকে ও মুনিরের ছোট ভাইকে আসামি করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..