প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

কেন্দ্রীভূত ঋণে বাড়ছে: ঝুঁকি নতুন ব্যাংকগুলোর

 

শওকত আলী: একটি নির্দিষ্ট খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে নতুন প্রজন্মের বেশিরভাগ ব্যাংকের ঋণ বিতরণ। কোনো কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এটি প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি। সেসব ঋণের আবার অধিকাংশেই পর্যাপ্ত জামানতের অভাব রয়েছে। এতে ব্যাংকগুলো দিন দিন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।

জানা গেছে, নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে পুরোনো ব্যাংকের তুলনায় বেশি সুদে আমানত গ্রহণ করছে। ব্যাংকগুলোর ৮০ শতাংশ আমানত উচ্চ সুদে গ্রহণ করা। এতে করে তাদের তহবিল ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। আবার যেসব ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে তার বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানতের অভাব রয়েছে। সেই ঋণগুলো আবার একটি নির্দিষ্ট খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে একটি খাতেই ৭০-৮০ শতাংশ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এতে ব্যাংকগুলো ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ইউনিয়ন ব্যাংক, এনআরবি ও ফারমার্স ব্যাংকের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি বেশি। এছাড়া ৯টির মধ্যে পাঁচটি ব্যাংক রয়েছে যাদের শীর্ষ ১০ আমানতকারীর রয়েছে ৩০ শতাংশ আমানত।

প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, নতুন ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের ৪০ শতাংশ ঋণ রয়েছে শীর্ষ ২০ গ্রহীতার কাছে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর এসব শীর্ষ গ্রহীতা কোনো কারণে টাকা ফের না দিলে বা খেলাপিতে পরিণত হলে বড় ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়বে ব্যাংকগুলো। আর পুরোনো ব্যাংকগুলোর মতো গতানুগতিক ধারায় ঋণ বিতরণ করায় সামনের দিনগুলোয় এসব ব্যাংক বেশি সমস্যার মধ্যে পড়বে বলে জানা গেছে। চার বছরের মাথায় ধীরে ধীরে ব্যাংকগুলোর খেলাপি বেড়েই চলেছে। এটা ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী ঋণ বিতরণের ফল বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ব্যাংকগুলো ঝুঁকিভিত্তিক ঋণের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণে হিমশিম খাবে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তারা ব্যাসেল-৩-এর আওতায় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে।

এছাড়া নতুন ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম শুরুর তিন-চার বছরের মাথায় বড় ঋণে জালিয়াতির তথ্য উঠে আসে। প্রথমে ফারমার্স ব্যাংকের ৪০০ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির তথ্য জানতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। আরও বিভিন্ন ঋণ বিতরণে অনিয়ম ঘটতে থাকে ব্যাংকটিতে। বারবার নির্দেশনা দেওয়া সত্ত্বেও তারা কথা না শোনায় বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রথম ফারমার্স ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়।

একইভাবে পরিচালনা পর্ষদে দ্বন্দ্ব, ঋণ জালিয়াতি, পরিচালকদের বেনামে ঋণ গ্রহণের নানা চিত্র উঠে আসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে। এরই মধ্যে এ ব্যাংক থেকে ৩০১ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি ও অন্য একটি ব্যাংকের বড় চেয়ারম্যানের বড় অঙ্কের ঋণ জালিয়াতির তথ্য পায় বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে ব্যাংকটির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য সম্প্রতি একজন পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ নতুন ৯ ব্যাংকের দুটিতেই চরম বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে ইতোমধ্যে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, নতুন ব্যাংকগুলোর যেসব ঋণ রয়েছে সেগুলোর মধ্যে অনেক ঋণই রয়েছে যেগুলো অন্য ব্যাংক থেকে টেক ওভার বা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। যেসব ঋণের রিস্ক ওয়েট বা ঝুঁকি অনেক বেশি। এগুলো গ্রাহকদের অনৈতিক সুবিধা  দেওয়ার জন্যই করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূরুল আমিন বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে। আমরা সেগুলো পরিপালন করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। এ মুহূর্তে এর থেকে বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।’

এছাড়া এনআরবি গ্লোবাল, এনআরবি কমার্শিয়াল এবং এনআরবি ব্যাংক তিনটিকে যে উদ্দেশ্যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল এখন পর্যন্ত তার কোনোটাই পূরণ করতে পারেনি তারা। প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঞ্চয় দেশের বিনিয়োগে আনার লক্ষ্যে বেসরকারি খাতে এ তিনটি নন-রেসিডেন্স বাংলাদেশি বা এনআরবি ব্যাংকের লাইসেন্স দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈদেশিক বাণিজ্য ও ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়ানোর নানা পরিকল্পনার কথা বলে ২০১৩ সালে কাজ শুরু করে ব্যাংকগুলো। তবে প্রায় চার বছর হয়ে এলেও এক্ষেত্রে আশানুরূপ কোনো অগ্রগতি নেই। বরং অন্য নতুন ব্যাংকের তুলনায় পিছিয়ে আছে প্রবাসীদের মালিকানার এ তিন ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ফারমার্স ব্যাংক আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ সাড়ে ১০ শতাংশ, সাউথ বাংলা ৭ শতাংশ,  এনআরবি গ্লোবাল ৮ শতাংশ, এনআরবি কমার্শিয়াল ৮ শতাংশ, এনআরবি গ্লোবাল ৮ শতাংশ, এনআরবি সাড়ে ৭ শতাংশ, মেঘনা ৭ শতাংশ ও মিডল্যান্ড ব্যাংক ৭ শতাংশ সুদে আমানত গ্রহণ করে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সেটারই একটা খেসারত দিতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও দিতে হবে। মোট কথা, এতগুলো ব্যাংকের প্রয়োজন কতটা, সেটা একটু দেখা উচিত। তা না-হলে, একজন আরেকজনের কাস্টমার নিয়ে টানাটানি করতেই থাকবে।’

উল্লেখ্য, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৫৫৮ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এ খেলাপির পরিমাণ ছিল ১৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় খেলাপি বেড়েছে তিনগুণ।