রাশেদ রুবেল : বাংলাদেশে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। প্রায় দুই যুগ আগের এই সংস্থাটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হলেও এখনও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রভাবে বলয়ে পরিচালিত হচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, অর্থপাচার রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে বিএফআইইউর সক্ষমতা ও স্বাধীনতা বাড়াতে হবে। এজন্য মৌখিক স্বায়ত্তশাসন নয়; দরকার কার্যকর পদক্ষেপ।
জানা গেছে, বিএফআইইউ ২০০২ সালের জুনে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে ‘এন্টি মানি লন্ডারিং ডিপার্টমেন্ট বা এএমএল’ নামে গঠিত হয়। পরে আবার এন্টি মানি লন্ডারিং ডিপার্টমেন্টের কাজের অধিকতর স্বাধীনতা এবং কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে ২০১২ সালে একটি আইনের মাধ্যমে ‘এন্টি মানি লন্ডারিং ডিপার্টমেন্ট’-এর নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) নামকরণ করা হয়। এরপর ২০১৫ সালের ১১ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির জারি করা এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ সংশোধন করা হয়। পরে ওই বছরের ২৬ নভেম্বর তা সংসদে আইনে পরিণত হয়। সংশোধিত আইনের অধীনেই প্রতিষ্ঠা পায় বিএফআইইউ। সংস্থাটির মূল দায়িত্ব হলো, দেশের আর্থিক খাতে সংঘটিত সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং মানি লন্ডারিং বা সন্ত্রাসে অর্থায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেলে তা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার (যেমন দুদক ও সিআইডি) কাছে পাঠানো। একই সঙ্গে বিদেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থাও রয়েছে।
আইন অনুযায়ী, বিএফআইইউ একটি কেন্দ্রীয় সংস্থা হিসেবে কাজ করে। স্বতন্ত্র হলেও এই সংস্থাটির কার্যালয় বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যেই অবস্থিত। সংস্থাটির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অফিসের স্থান, জনবল, তহবিল ও প্রশাসনিক সহায়তা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বিএফআইইউর প্রধান করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর পদ মর্যাদার কর্মকর্তাকে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ দুই বছরের জন্য বিএফআইইউর প্রধানকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে থাকে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের দাবি এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক ক্ষতি হচ্ছে বেতন, ভাতাসহ অনেক বিষয়ে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবির) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান শেয়ার বিজকে বলেন, ধারণাগত ভিত্তি ও বৈশ্বিক চর্চা অনুযায়ী সম্পূর্ণ স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিএফআইইউ পুরো ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অন্য সব প্রতিষ্ঠানের মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত থাকার কথা। তা না হলে বিএফআইইউ তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে সক্ষম হবে না।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিএফআইইউকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্তৃত্বাধীন করে রাখা হয়েছে। যার নেতিবাচক ফল ভোগ করতে হয়েছে কর্তৃত্ববাদী চোরতন্ত্রের আমলে ব্যাংক খাতের লুটপাটসহ অর্থ পাচারের মহোৎসব প্রতিরোধে ব্যর্থতার মাধ্যমে। বিএফআইইউকে তার যথাযথ ভূমিকা পালনে সক্ষম করার লক্ষ্যে নতুন সরকার তার রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠনের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে অবিলম্বে এই সংস্থাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের যেকোনো প্রকার প্রভাবের বাইরে রাখবে এবং সম্পূর্ণ স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিএফআইইউকে গড়ে তুলবে বলে মনে করেন টিআই নির্বাহী পরিচালক।
এদিকে, আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে বিএফআইইউর অফিস থাকলে আর্থিক লেনদেন-সংক্রান্ত তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা সহজ হয় বলে প্রথাগত দাবি রয়েছে। কারণ হিসেবে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি, মানিচেঞ্জার, স্টক এক্সচেঞ্জ, রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠান সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য বিএফআইইউকে জানাতে বাধ্য। তবে এ কাঠামোর কারণে বিএফআইইউ কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সে বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে বিএফআইইউ সাধারণত ব্যাংক হিসাবের নথি, তহবিল স্থানান্তরের রেকর্ড, স্থাবর সম্পদের তথ্য, বিমা চুক্তি, ব্রোকারেজ হিসাব ও অন্যান্য আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করে অপরাধের সূত্র খোঁজেন। তাদের মতে, সংস্থাটির কার্যকারিতা বাড়াতে বিভিন্ন সরকারি ডেটাবেসে সরাসরি প্রবেশাধিকার, উন্নত সফটওয়্যার ব্যবহারের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী তদন্ত সক্ষমতা বাড়ানো হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতার প্রয়োজনীতা নেই বলে দাবি করেছেন বিশ্লেষকরা।
প্রশাসনিক কাঠামোর কারণেও সংস্থাটির স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিএফআইইউর একজন কর্মকর্তা, যিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের সমমর্যাদার। প্রধান কর্মকর্তাকে প্রায় সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পূর্বানুমোদন নিতে হয়। প্রধান কর্মকর্তার অধীনে একজন নির্বাহী পরিচালক দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাহী পরিচালকের অধীনে দুজন পরিচালক কর্মরত থাকেন।
এদিকে, পরিচালকদের তত্ত্বাবধানে আটজন অতিরিক্ত পরিচালক কাজ করেন। এসব অতিরিক্ত পরিচালক প্রশাসন, নীতি, বিশ্লেষণ, পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধান, অভিযোগ তদারকি এবং তথ্য বিনিময় করেন। আবার নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হয় এবং নিয়োগ ও পদায়ন সবই বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকিতে থাকে। বিগত দিনে গভর্নরদের ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যম হিসেবে বিএফআইইউকে দেখা যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে কখনও কখনও জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী শেয়ার বিজকে জানান, এক সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অফিস ছিল। এখন বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অফিস আছে। কোথায় অফিস, কি কাজ করছে তা বিষয় না, কে কি কাজ করছেন সেটাই এখানে মুখ্য বিষয়।
তিনি আরও বলেন, বিএফআইইউ নিয়ে মূল বিষয়টি হলো তারা কতটুকু দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে। বিএফআইইউর সক্ষমতা কতটুকু বেড়েছে। দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে নিজেদের কর্মকাণ্ড ঠিক মতো পরিচালনা করছে কিনা। তাদের দায়িত্ব কতটুকু বেড়েছে, দায়বদ্ধতা বেড়েছে কিনা বা স্বচ্ছতা বেড়েছে কি না? এসব নিয়ে দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করলেই তাদের সক্ষমতা প্রকাশ পাবে।
অর্থপাচার সাধারণত সীমান্ত অতিক্রম করে সংঘটিত হয় এবং এতে জটিল আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অবৈধ অর্থের উৎস গোপন করা হয়। অপরাধীরা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব, তহবিল স্থানান্তর, স্থাবর সম্পদ ক্রয়, বিমা পলিসি, শেয়ারবাজার বিনিয়োগসহ নানা উপায়ে অর্থের উৎস আড়াল করার চেষ্টা করে। এসব লেনদেনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অপরাধ শনাক্ত করতে প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষ বিশ্লেষণ।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর্থিক খাতের অপরাধীরা এখন অত্যাধুনিক কৌশল ব্যবহার করছে। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে তদন্ত চালিয়ে এসব অপরাধ দমন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এজন্য বিএফআইইউকে আরও আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং বিস্তৃত তথ্যভান্ডার দিয়ে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সব অস্বাভাবিক লেনদেনই যে মানি লন্ডারিংয়ের সঙ্গে যুক্ত, তা নয়। আবার অনেক সময় খুব সাধারণ লেনদেনের মধ্যেও বড় ধরনের অর্থপাচারের সূত্র লুকিয়ে থাকতে পারে। এ কারণে উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষ বিশ্লেষণ ছাড়া এসব শনাক্ত করা কঠিন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান শেয়ার বিজকে বলেন, বিএফআইইউ একটি স্বাধীন সংস্থা। তারা সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক কার্যাবলি সম্পাদন করে থাকেন। এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো বলয় নেই। বরং বিএফআইইউর কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অফিস ও জনবলসহ অনেক খরচ যাচ্ছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। সরকারের প্রয়োজন হলে বিএফআইইউকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত করতে পারে। সবই সরকারের স্বদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে।
এ বিষয়ে বিএফআইইউর প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন শেয়ার বিজকে জানান, নতুন দায়িত্ব, অগ্রাধিকার ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিএফআইইউর সক্ষমতা রয়েছে। এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তিনি বলেন, রাষ্ট্র আমার ওপর যে আস্থা রেখেছে, সেটিকে আমি বড় দায়িত্ব হিসেবেই দেখছি। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ এখন শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পৃক্ত। তাই পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে কাজ করতে চাই।
বিআইএফইউর প্রধান মামুন আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানে আমরা যে বাংলাদেশ পেয়েছি, তাতে এখন আমরা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। এই বাংলাদেশে আমরা অর্থপাচার কোনোভাবেই মেনে নেব না। অনেক হয়েছে, অ্যানাফ ইজ অ্যানাফ। অর্থপাচার এ জাতি আর মানবে না। জনগণের সম্পদ যেন কোনোভাবে পাচার না হয় সে জন্য আমাদের সজাগ থাকতে হবে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট একটি শক্তিশালী ও আইনসম্মত কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত সংস্থা। এই সংস্থার নতুন করে কোনো আইন করার প্রয়োজন নেই। শুধু আইন প্রয়োগ করে কাজ করে প্রমাণ দিতে হবে বলে জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার নিয়ে জনমনে যে উদ্বেগ রয়েছে, তা দূর করতে বিএফআইইউর কার্যকর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দৃশ্যমান ফলাফল ও শক্তিশালী তদন্তের মাধ্যমে সংস্থাটিকে প্রমাণ করতে হবে যে অর্থপাচার প্রতিরোধে তারা সক্ষম। অর্থপাচার এখন আন্তর্জাতিক ও ক্রমবিবর্তিত একটি অপরাধ। তাই প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তদন্ত পরিচালনার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, দৃশ্যমান ফলাফল দেখিয়ে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজের অগ্রগতি তুলে ধরেই সংস্থাটিকে প্রমাণ করতে হবে যে অর্থপাচার প্রতিরোধে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post