সাক্ষাৎকার

কেন্দ্রীয় ব্যাংককে উদ্যোগী হতে হবে ইসলামী ব্যাংকিং আইন প্রণয়নে

মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সোনালী ব্যাংকে তার ক্যারিয়ার শুরু। এরপর ইসলামী ব্যাংকে কাজ করেছেন দীর্ঘ ৩০ বছর। গত পাঁচ বছর ধরে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ দায়িত্ব পালন করছেন সফলভাবে। চলতি বছরের অক্টোবরে কর্মজীবন থেকে অবসর নেবেন অভিজ্ঞ এ ব্যাংকার। সম্প্রতি তিনি শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন শেয়ার বিজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তানিয়া আফরোজ

শেয়ার বিজ: ৪০ বছরের ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে নিজের সাফল্য কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান: ১৯৭৮ সালে সোনালী ব্যাংকে কর্মজীবন শুরু হলেও বড় সময় কাটিয়েছি ইসলামী ব্যাংকে। মূল কাজগুলো এ ব্যাংকের সঙ্গেই করার সুযোগ হয়েছে। বাংলাদেশে শিল্পায়নের বিকাশে; বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প ও টেক্সটাইলশিল্পের উন্নয়নে বড় অবদান ছিল ইসলামী ব্যাংকের। এ অবদানের সঙ্গে আমি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম। ২০১৩ সালে আল-আরাফাহ্র দায়িত্ব নেওয়ার পর এ ব্যাংকের মুনাফা ও অন্যান্য পারফরম্যান্স দ্বিগুণ হয়েছে। শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক।

শেয়ার বিজ: একটা অভিযোগ রয়েছে যে, বাংলাদেশের শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলো সাধারণ ব্যাংকের মতোই কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ প্রশ্নে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক কতটা শরিয়াহ্ভিত্তিক?

হাবিবুর রহমান: অন্যান্য ব্যাংকের কথা বলতে পারব না। তবে আল-আরাফাহ্ শরিয়াহ্ আইন কঠোরভাবে মেনে চলে। আমাদের শরিয়াহ্ সুপারভাইজরি কমিটি স্বাধীনভাবে কাজ করে। এটি পরিচালক পর্ষদের একটি উপদেষ্টা কমিটি হিসেবে শরিয়াহ্ পরিপালনের বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে। আর আমাদের পর্ষদ নীতিগতভাবে এ কমিটির নির্দেশনাগুলো মেনে চলে। শরিয়াহ্ সুপারভাইজরি কমিটির নিজস্ব বিবেচনামূলক (ডিসক্রেশনারি) ক্ষমতা আছে। সে অনুযায়ী তারা নিরীক্ষা ও মন্তব্য করে। যেমন গত বছর শরিয়াহ্ সুপারভাইজরি কমিটি এ ব্যাংকের হিসাব নিরীক্ষা করে ৩৯ কোটি টাকার লেনদেন সন্দেহজনক (ডাউটফুল) ঘোষণা করেছে। এ টাকা আমরা আয়ে যোগ করতে পারিনি। হালাল আয়ের দায়বদ্ধতা থাকায় পরিচালনা পর্ষদ শরিয়াহ্ সুপারভাইজরি কমিটির এ সিদ্ধান্ত একবাক্যে মেনে নিয়েছে।

শেয়ার বিজ: দেশের বেশ কয়েকটি ব্যাংক কেন্দ্রীয়করণের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। অর্থাৎ শাখাগুলোকে তারা শুধু সেবাদান কেন্দ্র হিসেবে পরিচালনা করছে। এ পদ্ধতি আল-আরাফাহ্ ব্যাংকের জন্য কতটা উপযুক্ত?

হাবিবুর রহমান: কয়েকটি ব্যাংক শাখা ব্যাংকিংয়ের ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। তবে এ দেশের সংস্কৃতি কেন্দ্রীয়করণের জন্য এখনও প্রস্তুত নয়। আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে শাখা ব্যাংকিংই জনপ্রিয়। বর্তমানে আল-আরাফাহ্’র ১৫৮টি শাখা রয়েছে। আশা করি এ বছর এজেন্ট পয়েন্টের সংখ্যা ২০০তে পৌঁছবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং সেবাই আমাদের লক্ষ্য। আর আমরা মনে করি, দেশব্যাপী বিস্তৃত নেটওয়ার্ক না থাকলে প্রচারও কমে যায়।

শেয়ার বিজ: একদিকে সঞ্চয়পত্রের সুদহার বেশি; অন্যদিকে আমানতের সুদহার ছয় শতাংশে নামানোর নির্দেশ। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলো তারল্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক ব্যাংকই জামানতবিহীন ব্যবসা বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কমিশননির্ভর আয়ের দিকে ফোকাস দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

হাবিবুর রহমান: বাজার পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, জনগণ ও দেশের স্বার্থ রক্ষা করে ব্যবসায়িক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। শুধু মুনাফা দেখলেই চলবে না। কোনো একটি ব্যবসায় ফোকাস বেশি দিলেও হবে না। সাম্প্রতিক তারল্য সংকট সাময়িক। ২০১৬ ও ২০১৭’র মাঝামাঝি পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি। এরপর থেকেই কিছু সংকট দেখা দিয়েছে। সংকটের সমাধান তো বাজার থেকেই করতে হবে। আমরা বিনিয়োগ একটু সংকুচিত করেছি। আমাদের আমানত প্রবৃদ্ধির চেয়ে ইতোমধ্যে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি বেশিই আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শ, এডি রেশিও কমিয়ে আনতে হবে। এদিকে খেয়াল রেখেই আমাদের সামগ্রিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
আমি মনে করি, তারল্য সংকট কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা হচ্ছে আমানতের অসম বণ্টন। বাজারে আমানত আছে। এতদিন সরকারি আমানতের ৭৫ শতাংশই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় কেন্দ্রীভূত ছিল। সরকারি সিদ্ধান্তে এসব আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় চলে আসবে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসবে।

শেয়ার বিজ: দেখা যায়, এদেশের অধিকাংশ ব্যাংকই ‘অ্যাড কনফারমেশন ফি’ দিয়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর সহায়তায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনা করে। এক্ষেত্রে আল-আরাফাহ্ ব্যাংক গত ২৩ বছরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্মাণে কতটা স্বয়ংসর্ম্পূতা অর্জন করেছে?

হাবিবুর রহমান: বর্তমানে তিন-চারশ কোটি টাকার এলসি এককভাবে খোলার সক্ষমতা আল-আরাফাহ্ ব্যাংক অর্জন করেছে। বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ক্রেডিট লাইন আছে। অর্থাৎ এ পরিমাণ অর্থ আমাদের পক্ষ হয়ে রফতানিকারককে দিয়ে দিতে বিদেশি ব্যাংকগুলো রাজি আছে। ফলে সব ধরনের বৈদেশিক বাণিজ্য করতে আমরা সক্ষম। বর্তমানে আমাদের ৩০ হাজার কোটি টাকার আন্তর্জাতিক ব্যবসা রয়েছে। আবার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্মাণে ক্রেডিট রেটিং একটি বড় মানদণ্ড। এ বছর আমরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রথম সারির রেটিং এজেন্সি মুডিসকে দিয়ে রেটিং করাতে যাচ্ছি। এতে রেটিং ভালো এলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা আরও বেড়ে যাবে।

শেয়ার বিজ: এদেশে শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকিং পরিচালনায় চ্যালেঞ্জের জায়গা কোনটি?

হাবিবুর রহমান: শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু গাইডলাইন থাকলেও পৃথক কোনো আইন নেই। ব্যাংকিং অ্যাক্ট অনুযায়ী আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছি। তবে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট কিছু আইন থাকলে আমাদের কার্যক্রমগুলো আরও সাবলীল হবে। যেমন: শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকের আয়ের ন্যূনতম ৭০ শতাংশ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিতরণের আশ্বাস থাকে। মুনাফার অনুপাত আমরা আগে ঘোষণা করতে পারি না, বছরান্তে গিয়ে ব্যাংকের লাভ-ক্ষতির অনুপাতে গ্রাহক তার মুনাফা পান। এ নিয়ে অনেক সময় গ্রাহকের সঙ্গে ব্যাংকের ভুল বোঝাবুঝি হয়। কিন্তু এ বিষয়ে আইনগত নির্দেশনা থাকলে গ্রাহক মুনাফা ও ক্ষতি দুইয়ের ভার নিতেই প্রস্তুত থাকত। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা হচ্ছে। আমি মনে করি, এ আইন প্রণয়ন এবং সংসদ থেকে অনুমোদনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককেই উদ্যোগ নিতে হবে।

শেয়ার বিজ: শেয়ার বিজের মধ্য দিয়ে মুক্তভাবে কিছু বলতে চান কী?

হাবিবুর রহমান: বর্তমানে অনেক ব্যাংকই শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকিংয়ে আগ্রহী। এজন্য অনেক কনভেনশনাল ব্যাংকই শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদনও করেছে। আমি মনে করি, আর যদি সাত-আটটি ইসলামী ব্যাংক আসত, তাহলে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বাজারটা আরও শক্তিশালী হতো।

শেয়ার বিজ: ধন্যবাদ আপনাকে।

হাবিবুর রহমান: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সর্বশেষ..