কেন এত বিচ্ছেদ?

কাজী ইরিন: বিচ্ছেদ শব্দটা শুনতেই কেমন একটা খারাপ লাগা কাজ করে। অতি মর্মান্তিক একটা শব্দ। তবুও কেন এত বিচ্ছেদ প্রশ্ন জাগে মনে। সম্পর্কের বিচ্ছেদ যেন নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিচ্ছেদ কথাটির মধ্যে কতটা যন্ত্রণা লুকিয়ে থাকে, তা উপলব্ধি করার শক্তি যেন আমরা হারিয়ে ফেলেছি। বিচ্ছেদ কখনও দুটি মানুষের মধ্যে হয় না, এর সঙ্গে জড়িত থাকে আরও মানুষের স্বপ্ন।  বিবাহবিচ্ছেদ একসময় পশ্চিমা বিশ্বের সংস্কৃতি ও পুঁজিবাদী সমাজের একটি ব্যাধি বলে মনে করা হতো। কিন্তু এটা খুবই দুঃখজনক যে, আমরা আমাদের দেশে বিবাহিত জীবন অব্যাহত রাখার সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। বর্তমান সময়ে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা অহরহ ঘটছে, যা আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে বেমানান। মুসলিম আইন অনুযায়ী, বিবাহ একটি নাগরিক ও পারিবারিক চুক্তি এবং এই চুক্তির মাধ্যমে দম্পতি একটি সুন্দর পরিবার একসঙ্গে থাকার শপথ গ্রহণ করে। বিবাহ এমন একটি পবিত্র বন্ধন, যা স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং  বিশ্বাসের ওপর স্থায়ী হয়। খুব সুনির্দিষ্ট কারণে তালাক অনুমোদিত, কিন্তু এটি নিরুৎসাহিত, এমনকি কোরআনেও। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন এবং ১৯৭৪ সালের বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ নিবন্ধন আইন অনুসারে, জরুরি প্রয়োজনে বিবাহবিচ্ছেদ করা যেতে পারে; কিন্তু  এখন আমাদের দেশে বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিবাহবিচ্ছেদ কখনোই কাম্য হতে পারে না। দুঃখজনকভাবে এটা এখন আমাদের দেশে শহর থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলে হরহামেশাই ঘটছে।

জরিপে দেখা গেছে, গত কয়েক বছর ধরেই বিচ্ছেদের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিবিএস সূত্র অনুযায়ী, শুধু ঢাকা সিটি করপোরেশনে ২০১২ সালে ডিভোর্সের জন্য আবেদন করা হয় মোট ৭৪০২টি, ২০১৩ সালে ৭৭০৮টি, ২০১৪তে ৯০৪৫টি, পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯-এর প্রথম ১৮০ দিনে ৪ হাজার ৫০০ তালাকের আবেদন করা হয়েছিল। প্রতি ১ ঘণ্টায় একটি পরিবারকে ভাঙার জন্য একটি আবেদন সিটি করপোরেশনে জমা দেওয়া হচ্ছে। ২২ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখের একটি সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুসারে, জুন থেকে অক্টোবর ২০২০ পর্যন্ত মাত্র পাঁচ মাসে, বিবাহবিচ্ছেদের হার অনেক বেড়েছে। এই সময়ে প্রতিদিন ৩৯টি তালাক ছিল। প্রতি ৩৭ মিনিটে একটি তালাক। প্রতি মাসে গড়ে ১ হাজার ১৯৪ তালাক হয়। ২০২০ সালে বছরের প্রথম ৫ মাসে বিবাহবিচ্ছেদ ২৯.৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। চট্টগ্রামে প্রতিদিন ১৮টি তালাক হয়। সিলেট যেখানে প্রথম ১০ মাসে তালাকের আবেদন জমা ১০ গুণ বেশি হয়েছে। অন্য শহরগুলোতেও খুব বেশি তারতম্য হওয়ার সম্ভাবনা কম।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে বিবাহবিচ্ছেদের হার বেশি। আমরা যত উন্নত জীবনযাপনে করতে শুরু করছি, ততটাই আধুনিকতার ছোঁয়া লাগছে, সেই সঙ্গে সম্পর্কের মানে পাল্টে যাচ্ছে আমাদের কাছে। সম্পর্কের তুচ্ছ বিষয় থেকে শুরু করে যে কোনো বিষয় নিয়ে এখন একটা কথায় আমাদের মাথায় আসে বিচ্ছেদ”যেন সবকিছু নতুন করে শুরু হবে আবার। কিন্তু বিচ্ছেদের পর কোনো কিছু নতুন করে শুরু হয় না কয়েকটি জীবন থেমে যায়। হতে পারে শহরে মানুষের সংখ্যা বেশি, তাই বিচ্ছেদের হারটাও বেশি। বিবাহবিচ্ছেদ বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে শুধু একটি কারণ, বিচ্ছেদের জন্য দায়ী হতে পারে না। একে অপরের প্রতি বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা না থাকা এবং পারিবারিক কলহের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই বিচ্ছেদের দ্বারস্থ হতে হয়। বর্তমানে নারীরা তাদের অধিকার ও অবস্থান বিষয়ে সচেতন অধিকাংশ ক্ষেত্রে যা বিচ্ছেদের দিকে ধাবিত করে। এছাড়া স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতের অমিল দেখা দিলেও দেখা যায় অনেকেই না মানিয়ে বা সমঝোতায় না এসে বিচ্ছেদকে বেছে নেয়। অন্য নারী-পুরুষের প্রতি আসক্তির কারণেও বিবাহবিচ্ছেদ অন্যতম কারণ। স্ত্রীর প্রতি স্বামীর আধিপত্যবাদী মনোভাব। একটি যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়া এবং বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করে ফলে দেখা যায়, পারিবারিক কলহের সৃষ্টি হয় এবং বিচ্ছেদ হয়। এছাড়া পরিবারকে সময় না দেয়া, কর্মজীবী নারীরা পরিবারে বেশি সময় কাটাতে পারেন না যাকে অনেকেই বিবাহবিচ্ছেদের কারণ হিসেবে দেখেন। দাম্পত্য জীবনের ছোট ছোট ভুল মেনে নেয়ার প্রবণতা না থাকা, স্ত্রীকে যথাযথ ভরণপোষণ না দেয়া। যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে নির্যাতন করা, মাদকাসক্তি, পুরুষত্বহীনতা এবং বন্ধ্যাত্ব ইত্যাদি বিভিন্ন পারিপার্শিক কারণে বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে থাকে।

বিচ্ছেদের কারণ যাই হোক না কেন, খুব সহজেই চিন্তা করা যায় যে, ডিভোর্সের পরিণতি কতটা ভয়াবহ। এই বিবাহবিচ্ছেদ শিশুদের জীবনকে নষ্ট করে দেয় যদি শিশু থেকে থাকে। বিবাহবিচ্ছেদের এই সংস্কৃতি একদিকে পারিবারিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, অন্যদিকে শিশুদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে। বিবাহবিচ্ছেদ একটি অসম্মানের বিষয় যা নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একটি পবিত্র বন্ধন তালাকের মাধ্যমে সম্পূর্ণরূপে অসম্মানিত হয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যারা তালাকপ্রাপ্ত হয় তাদের সমাজে তুচ্ছ চোখে দেখা হয়। কিন্তু বিবাহবিচ্ছেদে নারীরাই সমাজ দ্বারা হয়রানির শিকার বেশি হয়। এর ফলে অনেক নারী তাদের মানসিক সমস্যায় ভুগে থাকে, এমনকি নারীরা তাদের দ্বিতীয় বিয়ের সময় অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়। সমস্যা নারী-পুরুষ উভয়ের হলেও আমাদের সমাজে এখনও বিবাহবিচ্ছেদের জন্য নারীদের দায়ী করা হয়। একটা বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে সমাজ যতটা নারীকে দোষারোপ করে ঠিক ততটা যদি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে তারা আঙুল তুলতে, তাহলে হয়তো বিচ্ছেদের পরিমাণটা কমে যেত। সমাজকে রক্ষণশীল হতে হয় তার মানে এই নয় নতুনত্বের ছোঁয়ায় পাল্টে যাবে সম্পর্কের মানে।

বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন এবং অবশ্যই এর মূল্য দিতে শিখতে হবে। ধর্মীয়, নৈতিক, সামাজিক ও আইনগতভাবে তালাকের অনুমতি থাকলেও সভ্য সমাজে অহঃরহ তালাক সংস্কৃতি অব্যাহত রাখা উচিত নয়। অতএব স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই ডিভোর্স এড়াতে প্রচেষ্টা করা প্রয়োজন। স্বামী এবং স্ত্রী উভয়েরই বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, একে অপরকে সহযোগিতা করার মনোভাব রাখতে হবে। উভয়ের ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার মনোভাব থাকতে হবে। তাদের তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তর্ক করা উচিত নয় এবং সামান্য ভুল বোঝাবুঝি থাকলেও নিজেকে সংযত করার জন্য ধৈর্য ধরতে হবে। তাহলেই বিবাহবিচ্ছেদের হার কমে আসবে।

আমাদের সম্পর্কের মানেটা গভীরভাবে বুঝতে হবে। বিচ্ছেদের আগে অবশ্যই আমাদের পরিবার-পরিজনের কথা মাথায় আনতে হবে। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক নয় বরং একজন দায়িত্বশীল সন্তান, পিতা-মাতা হয়ে উঠতে গেলে সম্পর্কের মূল্য বুঝতে পারাটা জরুরি। বিচ্ছেদ রোধ করার দায়িত্ব শুধু সেই দুজন মানুষের নয়, আমাদের সমাজের কিছু দায়িত্ব রয়েছে। সমাজকে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে। মানুষ পারিপার্শ্বিকতা থেকে শিক্ষা নেয়। সমাজ যদি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় বিচ্ছেদের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হয়, তাহলে মানুষ আরেকবার ভাববে একটা সম্পর্ক নষ্ট করার আগে। সবার সচেতনতাই পারে একটা সম্পর্ক অটুট রাখতে, বিবাহ নামক শব্দটাকে অক্ষুন্ন রাখতে। সবাইকে সম্পর্কের প্রতি যতœশীল হতে হবে, তাহলেই বিচ্ছেদ নামক শব্দের অবসান ঘটবে আমাদের সমাজ থেকে।

শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ..