আজকের পত্রিকা মত-বিশ্লেষণ

কোডিভ-১৯ সনাক্তকরনে প্রয়োজন সক্ষমতার সঠিক সমন্বয়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে বর্তমান বিশ্ব। কোভিড-১৯ নামের করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে গোটা বিশ্ব আজ থমকে গেছে। এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনও কোন কার্যকর টিকা আবিষ্কার হয়নি। এর নেই কোন সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা। তবে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব রোধে বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বেশি বেশি ল্যাব টেস্টের পরামর্শ দিয়েছে। যেহেতু করোনা ভাইরাস খুব দ্রুত একজন থেকে আরেকজনে ছড়ায় সেহেতু সংক্রমিত ব্যক্তিদের আলাদা করার জন্য ল্যাব টেস্ট করাটাই এখন প্রথম কাজ। পর্যাপ্ত টেস্টের অভাবে এখন সাধারণ সর্দিকাশির রোগীরাও হাসপাতালে চিকিৎসা পাচ্ছেন না।

সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডাক্তাররা রোগীদের চিকিৎসা দিতে নিজেদের নিরাপদ মনে করতে পারছেন না। সীমিত সংখ্যক বা শুধু বেছে বেছে নমুনা টেস্ট করার ব্যবস্থা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ল্যাব টেস্টের পরিধি আরো বাড়ানো এখন আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দেখা গেছে, ইতালি, স্পেন, আমেরিকার মত যেসব দেশ ব্যাপকহারে ল্যাব টেস্ট এর ভূমিকাকে অবজ্ঞা করেছে, সেসব দেশ এখন মহামারির মুখে নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে। আবার জাপান, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখেও ব্যাপকহারে ল্যাব টেস্ট করার মাধ্যমেই তারা এই রোগের প্রাদুর্ভাব এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে। আমাদের দেশেও প্রয়োজনীয় ল্যাব টেস্টের অভাবে করোনা ভাইরাসের প্রকৃত প্রাদুর্ভাব রহস্যজনকভাবে আশঙ্কাজনকই থেকে যাচ্ছে।

সরকার ইতিমধ্যেই আইইডিসিআর এর নেতৃত্বে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার জন্য আরটি-পিসিআর মেশিন স্থাপন করেছে। এই ক্রান্তিকালে সেইসব মেশিনে আরটি-পিসিআর রান করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সামনে এগিয়ে এসেছেন এদেশের দক্ষ ও প্রশিক্ষিত বায়োকেমিস্টরা। এখন দরকার সরকারের সক্রিয় উদ্যোগ ও সহযোগিতা। মাইক্রোবায়োলজি, বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজিতে উচ্চতর ডিগ্রিধারী এই সব গ্রাজুয়েটদের রয়েছে মলিকুলার লেভেলের যথেষ্ট জ্ঞান এবং আরটি-পিসিআর করার অভিজ্ঞতা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দেশের এই দুর্দিনেও আমাদের মাঝে সমন্বয়ের বড়ই অভাব রয়েছে। আর্থসামাজিক দিক বিবেচনায় বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মত যথেষ্ট সক্ষমতা আছে কিন্তু সেই সক্ষমতাগুলোর মাঝেও রয়েছে সমন্বয়ের যথেষ্ট অভাব।

এই দুর্দিনেও আমরা যদি সক্ষমতাগুলোর সঠিক প্রয়োগ করতে না পারি তাহলে আমাদের কপালে বড়ই নির্মমতা আসতে পারে। একটু চোখ মেলে তাকালে আমরা বেশ কিছু সক্ষমতা দেখতে পাবো। দেশের রিসার্চ ল্যাবগুলোতে খোঁজ নিলে গোটা দশেক আরটি-পিসিআর মেশিন খুঁজে পাওয়া যাবে। এই ল্যাবগুলোতে প্রতিনিয়ত আরটি-পিসিআর করা হচ্ছে। আবার দেশে সুনামধন্য বেশ কিছু বেসরকারি হাসপাতাল যেমন, স্কয়ার হাসপাতাল, বারডেম হাসপাতাল, ইবনে সিনা হাসপাতাল, ল্যাব এইড হাসপাতাল, মেডিনোভা হাসপাতাল ইত্যাদিতে মলিকুলার ল্যাব স্থাপন করা আছে। এসব ল্যাব গুলোতে প্রতিনিয়ত আরটি-পিসিআর রান করা হয়। বায়োকেমিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট এ উচ্চতর ডিগ্রিধারীরা এইসব ল্যাবগুলোতে দীর্ঘদিন যাবৎ কাজ করে আসছে। ইচ্ছে করলেই সরকার এই দুর্দিনে এইসব দক্ষ জনশক্তিকে কাজে লাগাতে পারে।

এদিকে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টদের পক্ষ থেকেও বেশকিছু দক্ষ বায়োকেমিস্টদের সমন্বয়ে গঠিত একটি  টিম মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। একদল দক্ষ জনশক্তি নিয়ে এই ক্রান্তিকালে তাঁদের দক্ষতা দিয়ে দেশের সেবা করার প্রতিশ্রুতি তাঁরা দিয়েছেন। ল্যাব টেস্টের পরিধি আরো বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ল্যাবকেও কাজে লাগানো যেতে পারে। ইতিমধ্যে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক করোনা সনাক্তকরনে নিজেদের সক্ষমতার কথা জানিয়েছেন। তাই এই মুহুর্তে সরকারের একটি বিশেষ ‘সেল’ তৈরি করা দরকার, যাদের কাজ হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের কাছে তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সুবিধা সম্বন্ধে তথ্য চাওয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে আরটি-পিসিআর মেশিনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আছে বলে জানা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ল্যাব না হলেও কিছু কিছু ল্যাবকে নির্দিষ্ট সরঞ্জাম দিয়ে নতুন এই ভাইরাসের উপস্থিতি টেস্ট করার জন্য প্রস্তুত করা যেতে পারে।

আমরা লড়ছি এক অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে। আমাদের হাতে সময় খুবই কম। দেশের স্বার্থে, নিজের স্বার্থে, নিজের পরিবারের স্বার্থে এখনই উচিত সবাইকে আল্লাহর উপর ভরসা করে যুদ্ধে নেমে পড়া। স্বাধীনতা যুদ্ধের ক্রান্তিকালে ঠিক যেভাবে এদেশের সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিডিআর, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রজনতা একযোগে একজোটে যুদ্ধ করে স্বাধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে এনেছিল ঠিক সেভাবেই সময় এসেছে এদেশের সকল শিক্ষক-গবেষক, ডাক্তার,  বায়োকেমিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, নার্স, মাঠ প্রশাসন সবাইকে যার যার মত মগজে বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতা নিয়ে একযোগে একচোখে আত্মবিশ্বাস আর করোনা বিহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে সামনে এগিয়ে আসতে হবে। আশাকরি অচিরেই আমরা করোনার গজব থেকে মুক্তি পাব, আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবো, মুক্ত বাতাসে ইচ্ছামত শ্বাস নিতে পারবো-ইনশাআল্লাহ।

মো. মতিউর রহমান 

বায়োকেমিস্ট ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর ঢাকা ।

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..