প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

কোরবানি ও এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

আদনান মোরশেদ: আগামী ১০ জুলাই পালিত হতে যাচ্ছে মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। কভিড সংক্রমণ আবারও বাড়ছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার এরই মধ্যে সর্বসাধারণকে মাস্ক ব্যবহারসহ অন্যান্য বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য পরামর্শ দিয়েছে। ঈদকেন্দ্রিক যাতায়াত, কোরবানির পশুর হাটে লোকসমাগম বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঈদুল আজহার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানি করা। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী কোরবানির জন্য এ বছর দেশে গবাদিপশুর সরবরাহের সংখ্যা দুই লাখের বেশি বাড়ানো হয়েছে। এ বছর কোরবানির জন্য গরু, ছাগল, ভেড়া ও উট মিলিয়ে এক কোটি ২১ লাখ ২৪ হাজার ৩৮৯টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব কোরবানির একটা বড় অংশ ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় সম্পন্ন হবে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কোরবানির হাটে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করার জন্য নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া রোগগ্রস্ত পশু হাটে বিক্রি করতে দেয়া হবে না এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সদস্য নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

গতবারের মতো এবারও দেশের নাগরিকদের পশুর হাটে গিয়ে পশু কেনাকে নিরুৎসাহিত করার লক্ষ্যে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় কম-বেশি আটশ’র মতো পশু কেনার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এরই মধ্যে তাদের কাজ শুরু করেছে। এর মধ্যে সরকারি উদ্যোগে কম-বেশি ৫০০টি এবং বাকিগুলো বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে। এরই মধ্যে এসব অনলাইন মার্কেট প্লেসের মাধ্যমে কোরবানির পশু বিক্রি শুরু হয়েছে। প্রতিদিন কোরবানির পশু বিক্রি বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষের কাছে এটি জনপ্রিয় হচ্ছে। বেঙ্গল মিট, কিউকম ডটকম, ডিজিটাল হাট, প্রিয় শপ, দেশি গরু, ই-বাজার, আজকের ডিল ও বিক্রয় ডটকম এরই মধ্যে ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অনলাইনে কোরবানির পশু ক্রয়ের একমাত্র ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ডিজিটাল হাট ডেট নেট। বেঙ্গল মিট ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে কোরবানির পশু ক্রয় করে তাদের কোরবানি করার দায়িত্ব দেয়ার সুযোগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় সব বিধি পালন করে কোরবানি সম্পন্ন করে মাংস তাদের নিজ দায়িত্বে ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে পৌঁছে দিয়ে থাকে। ঢাকা শহরে এসব মাংস কোরবানির দিন সন্ধ্যার আগেই পৌঁছে দিয়ে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোরবানি দেয়া হলে সময় ও অর্থের সাশ্রয় হবে এবং কভিডকালে স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে। এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠান নিজ দায়িত্বে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করে থাকে বলে পরিবেশের জন্য এটা সহায়ক। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র এরই মধ্যে ডিজিটাল হাট থেকে পশু কেনার জন্য সিটি করপোরেশনের বাসিন্দাদের অনুরোধ করেছেন।

আমাদের দেশে সবাই মিলে উৎসবমুখর পরিবেশে কোরবানির পশু হাট থেকে কিনে বাসায় নিয়ে আসার সংস্কৃতি রয়েছে। কিন্তু আমাদের সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। দলবেঁধে পশুর হাটে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। লোকসমাগম যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। যত্রতত্র কোরবানি না দিয়ে কর্তৃপক্ষের নির্বাচিত নির্দিষ্ট জায়গায় কোরবানি দেয়া হলে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। এসব জায়গায় কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই সব ধরনের সহায়তার ব্যবস্থা করে থাকে। ফলে কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়াই কোরবানি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মোট ৭৫টি ওয়ার্ড রয়েছে। এগুলোকে ১০টি জোনে ভাগ করা আছে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মোট এলাকা প্রায় ১১০ কিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় এক কোটি ২০ লাখ। এখানে অনুমোদিত ডাস্টবিন আছে চার হাজার ১৫৫টি। পরিচ্ছন্নতা কর্মী আছে পাঁচ হাজার ৪০০। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের জন্য এরই মধ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করে সম্মানিত নাগরিকদের করণীয় সম্পর্কে বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার শুরু করেছে। যদিও তিন দিনের মধ্যে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের কথা বলা হয়, তবে কোরবানির দিনই অধিকাংশ বর্জ্য অপসারণের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মোট ৫৪টি ওয়ার্ড রয়েছে। এগুলোকে ১০টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। উত্তর সিটি করপোরেশনে মোট জনসংখ্যা কমবেশি এক কোটি। মোট আয়তন ১৯৬ বর্গকিলোমিটারের ও বেশি। সবমিলিয়ে কম-বেশি ১১ পরিচ্ছন্নতা কর্মিদল এবার কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের কাজে সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত থাকবে। কনটেইনার ক্যারিয়ার ৪৪টি, আর্ম রোল আটটি, কম্পপ্যাকটর ৪৬টি, খোলা ট্রাক ১৬২টি ও ড্রাম ট্রাক থাকবে ৩৪টি। এসব সরঞ্জাম ও জনবলের মাধ্যমে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। উত্তর সিটি করপোরেশনের সম্মানিত মেয়র এরই মধ্যে নগরবাসীর কাছে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের বিষয়ে সহায়তা চেয়েছেন। অবৈধ পশুর হাট যেন না বসে, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হয়েছে। পশু কোরবানির ক্ষেত্রে কোনোরকম সমস্যা যাতে না হয়, সেজন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে ।

এজন্য নগরবাসীকে সচেতন করতে প্রচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রচারপত্র মুদ্রণসহ সম্মানিত কাউন্সিলরদের সঙ্গে সমন্বয়পূর্বক পশু জবেহ করার স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। ৫৪টি ওয়ার্ডের মাংস ব্যবসায়ী নির্বাচন করে প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং নগরবাসীর মধ্যে লিফলেট বিতরণ শুরু হয়েছে। অঞ্চলভিত্তিক সম্মানিত কাউন্সিলর, সহঃপ্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এবং পিডাব্লিউসিএসপি’র সঙ্গে সমন্বয়সভা করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। জনসচেতনতামূলক শোভাযাত্রা, টেলিভিশন, রেডিও, পত্রিকা ও গাড়ির সাহায্যে জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য ব্যাপক কার্যক্রমসহ মসজিদে ইমামদের মাধ্যমে খুতবায় আলোচনার জন্য অনুরোধ করে পত্র পাঠানো হয়েছে। আজ (৩ জুলাই) থেকে ওয়ার্ডভিত্তিক বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্যে পরিবহন চালক ইউনিয়ন ও স্ক্যাভেঞ্জার্স অ্যান্ড ওয়াকার্স ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে সভা করে তাদের মতামতের ভিত্তিতে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে। বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহকারী পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার মাধ্যমে তাদের দায়িত্ব ও লক্ষ্য বুঝিয়ে দেয়া হবে। ৫ জুলাইয়ের মধ্যে ওয়ার্ডভিত্তিক বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্যে তদারকির জন্য মনিটরিং টিম গঠন ও কন্ট্রোল রুম স্থাপন করে বর্জ্য রাখার ব্যাগ, ব্লিচিং পাউডার এবং স্যাভলন বিতরণ সম্পন্ন করা হবে। ঈদুল আজহার আগের দিন প্রত্যেক অঞ্চলে অতিরিক্ত যানবাহন বরাদ্দকরণ ও পশু জবেহ করার স্থানসহ ল্যান্ড ফিল প্রস্তুত করা হবে। ঈদের দিনের কার্যক্রম হিসেবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র বেলা ২টায় সংবাদমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে পশু বর্জ্য অপসারণের উদ্বোধন করবেন।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ গণযোগাযোগ অধিদপ্তর ও তথ্য অধিপ্ততর এ প্রচার কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। উত্তর সিটি করপোরেশনে ‘সবার ঢাকা’ নামে একটি অ্যাপ চালু আছে। এটি ডিএনসিসির সিটিজেন এনগেজমেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যাটফর্ম। এ অ্যাপটি ব্যবহার করে উত্তর সিটি করপোরেশনের সম্মানিত নাগরিকরা তাদের এলাকার সমস্যা বা মতামত মেয়রকে জানাতে পারেন। উত্তর সিটি করপোরেশন তিন দিনের মধ্যে বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও কোরবানির দিনই অধিকাংশ বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। কোরবানির যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হবে, তা অপসারণের দায়িত্ব শুধু দুই সিটি করপোরেশনকে দিলে হবে না, এজন্য ব্যক্তিগত পর্যায়েও অনেক কিছু করণীয় আছে। পশুর মাংস কাটার সময় বর্জ্যগুলো সিটি করপোরেশন থেকে সরবরাহকৃত ব্যাগে ভরে সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানে রাখতে হবে। এছাড়া কোরবানি দেয়ার স্থানগুলোয় সিটি করপোরেশনের দেয়া ব্লিচিং পাউডার দিয়ে নিজ দায়িত্বে পরিষ্কারের ব্যবস্থা করতে হবে।

কোরবানিদাতার অবহেলা ও অসচেতনতা কোরবানির পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী। মনে রাখা দরকার বর্জ্য অপসারণের প্রথম দায়িত্ব কোরবানিদাতার। যত্রতত্র কোরবানির বর্জ্য ফেলে পরিবেশ নষ্ট করে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য। ইসলাম পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার ধর্ম। সিটি করপোরেশন থেকে এ কভিড মহামারি, চিকনগুনিয়া ও ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হওয়ায় নগরবাসীকে সচেতন করতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, মাস্ক পরা, বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণে পশুর জন্য কেনা খড়কুটো নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলতে হবে। পশু রাখার জায়গা ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। পশু জবাইয়ের পর রক্ত ও ময়লা ব্লিচিং পাউডার ও পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। অযথা পানির অপচয় করা যাবে না। যে পোশাক পরে পশু জবাই করা হয়েছে বা মাংস কাটা হয়েছে, সেগুলো ভালো করে পরিষ্কার করতে হবে। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত জায়গায় বর্জ্য রাখতে হবে। চারপাশ যেন দুর্গন্ধ ও জীবাণুমুক্ত থাকে, সে ব্যপারে সতর্ক থাকতে হবে।

হাতে গ্লাভস ও মুখে মাস্ক অবশ্যই পরতে হবে। কোরবানি ও পশুর মাংস কাটার সময় অযথা ভিড় করা যাবে না। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। পশুর চামড়া দ্রুত বিক্রি অথবা দান করে দিতে হবে। নগরবাসীদের সহায়তায় গতবারের মতো এবারও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন দ্রুততম সময়ের মাধ্যমে পশুর বর্জ্য অপসারণ করতে সক্ষম হবেÑএটাই জনপ্রত্যাশা।

পিআইডি নিবন্ধ