প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

কোরবানি হোক শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য

সুমাইয়া আক্তার: কোরবানি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আত্মিক ইবাদত। সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুমিনের ওপর কোরবানি ওয়াজিব। মুসলিম উম্মাহর সর্বজনীন দুটি উৎসবের মধ্যে অন্যতম হলো ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। ঈদুল আজহা মূলত নিজেকে আল্লাহর কাছে সমপর্ণের শিক্ষা দেয়।

‘কোরবানি’ আরবি শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ হলো নৈকট্য, সান্নিধ্য ও আত্মত্যাগ। মহান আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের আশায় নির্ধারিত তারিখের মধ্যে হালাল কোনো পশু আল্লাহর নামে জবাই করাকে ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় কোরবানি বলা হয়। কোরবানি নতুন কোনো প্রথা নয়। বরং এটা আদিকাল থেকে প্রচলিত। আমরা যে প্রথা অনুসারে কোরবানি করি তা এসেছে মূলত মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.) এর থেকে। 

আমাদের বর্তমান সমাজে কোরবানি দেয়া আল্লাহর সন্তুষ্টির বদলে একটা  প্রতিযোগিতায় চলে গেছে। কোরবানির প্রথা শুরু হয়েছিল মূলত আল্লাহর প্রিয় নবী হযরত ইবরাহিম (আ.) কে পরীক্ষা করার জন্য যখন তাকে তার প্রাণ প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) কে জবেহ করার ঘোষণা দেন সেখান থেকে। আল্লাহ তার বান্দার তার প্রতি ভালোবাসার পরীক্ষা নিতে গিয়ে দেখলেন, তার বান্দা তার সন্তুষ্টির জন্য নিজের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় পুত্রকে হত্যা করতেও নাকচ করেননি। সে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিম বান্দার ওপর কোরবানি ওয়াজিব করেছেন।

এখন মানুষ কোরবানি দিতে গিয়ে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। তারা ভুলে যায়, কোরবানি দিতে হয় শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কে কার চেয়ে বড় পশু কিনল, কে সংখ্যায় বেশি পশু কোরবানি দিল, কার গরু দেখতে বেশি মোটাতাজা, কার গরুর গোশতের পরিমাণ বেশি হবে কারটা কম হবে এগুলো নিয়ে যেন এক অসম প্রতিযোগিতায় মেতে উঠে মুসলিমরা। অনেকেতো আবার  কোরবানির পশু নিয়ে পাড়া বা মহল্লার রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে দাম বলে বেড়ায়। আবার এমনও অনেক লোক আছে যারা কোরবানির ঈদ এলেই পাড়া বা মহল্লার সবার কোরবানির পশুর দাম জানতে ও কার পশুর গোশতের পরিমাণ কেমন হবে তা হিসাব করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অথচ কোরবানির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানুষের মনের পশুত্বকে হত্যা করে মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তোলা। আর সেখানে আমরা মনুষ্যত্বকে হত্যা করে পশুর পরিচয় দিচ্ছি।

প্রত্যেক কোরবানিদাতার অন্তরে হযরত ইবরাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.) এর মতো আত্মত্যাগ ও আত্মনিবেদনের শিক্ষা থাকতে হবে। নয়তো কোরবানির হাকিকত অর্জন হবে না।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন যে, – হে নবী আপনি বলুন  আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মরণ বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে।” (সূরা আনআম: ১৬২)

পবিত্র কোরআনে আরও ইরশাদ করা হয়েছে, -আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানি নির্ধারণ করেছি যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুষ্পদ জন্তু জবাই করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।” (সূরা হজ্জ:৩৪)

তাই কোরবানির পশু কিনতে গিয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া, দাম বলে বেড়ানো এগুলো একেবারেই অনুচিত কাজ। অনেকে কোরবানির পশুর দাম উল্লেখ করে ফেসবুকে পশুর ছবি শেয়ার করে যা মূলত কোরবানির আসল উদ্দেশ্যকে নষ্ট করে এক ধরনের অহংকারমূলক প্রচারণা প্রকাশ করে। কোরবানির পশুতে কত কেজি গোশত হয়েছে তা হিসাব করতে যাবেন না। পশু কিনে জিত হয়েছে না ঠক এসব আলোচনা করাও ঠিক না। কারণ কোরবানির পশুর কোনো দাম হয় না। এটা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা। কেউ পশুর  দাম জানতে চাইলে বলুন আল্লাহ যা সামর্থ্য দিয়েছেন তার মধ্যেই কেনার চেষ্টা করেছি। কোরবানি বলতে কেবল পশু জবাইকেই বুঝায় না। কোরবানির গোশত যথাযথভাবে তিন ভাগে গরিব, মিসকিন ও  আত্মীয়স্বজনের মাঝে বিতরণ করতে হবে এবং যথাযথ সংরক্ষণ করতে হবে। শুধু সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ফ্রিজ কিনলে কোরবানির আসল উদ্দেশ্য বিনষ্ট হবে। কোরবানির বিনিময়ে সওয়াব পেতে হলে অবশ্যই কোরবানি হতে এবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। যেভাবে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘কোরবানি পশুর রক্ত-মাংস কিছুই আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, পৌঁছায় শুধু তাকওয়া।’ (সূরা হজ্জ : ৩৬)।  অতএব তাকওয়া তথা খোদাভীতি লাভের উদ্দেশ্যেই এ কোরবানি। আর প্রকৃত কোরবানি হলো নিজ আত্মার আমিত্বকে জবাই করা, আত্মার কলুষতা, অহংকারকে জবাহ করা।

লোক দেখানোর উদ্দেশ্যেও নয়, গোশত খাওয়ার জন্যও নয়, কোরবানি দিতে হবে শুধুই আল্লাহর হুকুম পালনের জন্য। কোরবানির পশু অবশ্যই হালাল টাকায় কিনতে হবে। কারণ হারাম টাকায় কেনা পশু কোরবানি দিলে তা কবুল হবে না। কোরবানির পর পশুর রক্ত ও বর্জ্য নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। কোরবানির পশুর সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার বা পশুর গোশত কাটার মুহূর্তের ছবি ফেসবুকে শেয়ার করা যাবে না। মনে রাখবেন কোরবানি শুধুই সৃষ্টিকর্তার জন্য আর তিনি তা প্রত্যক্ষ করছেনই,  মানুষকে দেখানোর জন্য না। এই ঈদে আমাদের বিশেষ করে গরিব,  অসহায়দের প্রতি দৃষ্টি রাখতে হবে। আমাদের কোনো প্রতিবেশী যেন কোরবানির গোশত থেকে বঞ্চিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

মহান আল্লাহ আমাদের কোরবানি দেয়ার সামর্থ্য দিয়েছেন বলেই আমরা কোরবানি দিতে পারছি। এমনও অনেক মানুষ আছে যাদের বছরে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একটা কোরবানি দেয়ার সামর্থ্য নেই। মহান আল্লাহ আমাদের সহিহ্ নিয়তে যথাযথভাবে কোরবানি দেয়ার তৌফিক দিন এবং আমাদের কোরবানি কবুল করে নিন।

শিক্ষার্থী

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়