প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

কোরিয়ার ঋণে মিটারগেজ কোচ-ইঞ্জিন কেনায় পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তি  

 

ইসমাইল আলী: সারা দেশের মিটারগেজ রেলপথকে ক্রমান্বয়ে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ২০১৩ সালে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর পর থেকে মিটারগেজ রেলপথ নির্মাণে কোনো প্রকল্প অনুমোদন করা হয়নি। এতে আগামীতে মিটারগেজ ইঞ্জিন-কোচের চাহিদা কমবে। এছাড়া ৮০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন ও ৬০০ কোচ কেনা প্রক্রিয়াধীন। তাই কোরিয়ার ঋণে নতুন করে মিটারগেজ ইঞ্জিন-কোচ কেনার প্রস্তাবে আপত্তি তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।

গত ৬ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির বৈঠকে এ আপত্তি তোলা হয়। এতে বলা হয়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে ২০০ মিটারগেজ কোচ ও অপর একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ১০০টি মিটারগেজ কোচ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এছাড়া ৩৫০টি মিটারগেজ কোচ পুনর্বাসন করা হচ্ছে। অপরদিকে ৭০টি ও ১০টিসহ মোট ৮০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন সংগ্রহে দুটি প্রকল্প চলছে। জাপানের অর্থায়নে ২০১৬ সালে ১১টি ও ২০১৪ সালে ৯টি মিটারগেজ ইঞ্জিন সংগ্রহ করা হয়েছে। নতুন সব রেলপথ ব্রডগেজ লাইন করা হচ্ছে। বিদ্যমান মিটারগেজ লাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে কোরিয়ার ঋণে ১৫০টি মিটারগেজ কোচ ও ২০টি ইঞ্জিন সংগ্রহের যৌক্তিকতা বা প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কি নাÑসে ব্যাপারে প্রশ্ন উঠেছে।

উল্লেখ্য, কোরিয়ার ঋণে ১৫০টি মিটারগেজ কোচ ও ২০টি ইঞ্জিন কেনায় ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। এর মধ্যে এক হাজার ৪৮০ কোটি টাকা ঋণ দেবে কোরিয়া। বাকি ৪০১ কোটি টাকা সরকারের তহবিল থেকে চাওয়া হয়েছে।

এদিকে ইঞ্জিন-কোচ কেনায় পরামর্শক নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এছাড়া বিদেশে প্রশিক্ষণে তিন কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এগুলোর যৌক্তিকতাও জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি ইঞ্জিন-কোচের দাম বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি বলেও আপত্তি ওঠে।

পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তির জবাবে রেলওয়ে জানায়, টেন্ডারার্স ফিন্যান্সিংয়ের আওতায় যেসব কোচ ও ইঞ্জিন সংগ্রহের প্রকল্প রয়েছে। তবে বিষয়টি রেলওয়েতে নতুন ধারণা। এছাড়া এ ধরনের ঋণের শর্ত কঠিন বিধায় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত নয়। এদিকে রেলওয়ে চলমান মিটারগেজ কোচ ও ইঞ্জিনের বেশিরভাগের আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে এবং সার্ভিসেও চলাচলের অনুপযোগী। তবে নতুন ইঞ্জিন-কোচের অভাবে সেগুলো সার্ভিস থেকে বাদ দেওয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া পুরোনো ইঞ্জিন-কোচের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অনেক বেশি। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ বাজারে পাওয়া যায় না।

রেলওয়ে আরও জানায়, বর্তমানে সারা দেশে রেলপথের দৈর্ঘ্য দুই হাজার ৮৭৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে মিটারগেজ রেলপথ রয়েছে এক হাজার ৮০৮ ও ডুয়েলগেজ ৬৯৪ কিলোমিটার। ট্রেন পরিচালনার সুবিধার্থে ও আন্তর্জাতিক রেলওয়ে কানেকটিভিটি সম্প্রসারণের জন্য সরকার এরই মধ্যে মিটারগেজকে ব্রডগেজ বা ডুয়েলগেজে রূপান্তরের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তবে বিশাল এ রেল নেটওয়ার্ক রূপান্তরের কাজটি দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রক্রিয়া। এটি বাস্তবায়নে কয়েক দশক লাগবে। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ট্রেন পরিচালনার জন্য মিটারগেজ কোচ ও ইঞ্জিনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এছাড়া ডুয়েলগেজে রূপান্তরের পরও মিটারগেজ ট্রেন চালানো যাবে। তাই এ ধরনের কোচ ও ইঞ্জিনের দরকার হবে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, সারা দেশে বেশিরভাগ রেলপথ এখনও মিটারগেজ। এছাড়া ডুয়েলগেজ পথেও মিটারগেজ ট্রেন পরিচালনা করা হয়। তবে মিটারগেজ কোচের ৪৮ শতাংশ ও ইঞ্জিনের ৭৮ শতাংশ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়েছে। আর পর্যায়ক্রমে সারা দেশে ডুয়েলগেজে রূপান্তর ও মিটারগেজ পুরোপুরি তুলে দিতে কমপক্ষে ৫০ বছর লাগবে। এজন্য মিটারগেজ ইঞ্জিন ও কোচের দরকার আছে।

প্রকল্পটির পরামর্শক নিয়োগের আপত্তির বিষয়ে রেলওয়ে জানায়, প্রকল্পটি কোরিয়ার অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে। এজন্য গত বছর অক্টোবরে ঋণচুক্তি সই করা হয়েছে। আর ঋণচুক্তির শর্তের পরিপ্রেক্ষিতে কোচ ও ইঞ্জিনের স্পেসিফিকেশন তৈরি, বিশদ ডিজাইন, দরপত্রের ডকুমেন্ট তৈরি ও ম্যানুফ্যাকচারিং সুপারভিশনের কাজের জন্য পরামর্শক নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া প্রকল্পটির ঋণের সুদহার দশমিক শূন্য এক শতাংশ। তাই এজন্য খুব বেশি ঋণের বোঝা টানতে হবে না।

ইঞ্জিন-কোচের দাম বেশি যুক্তি দেখিয়ে পরিকল্পনা কমিশন জানায়, মিটারগেজ কেনার যেসব প্রকল্প চলমান, তাতে ব্যয় হচ্ছে গড়ে (ভ্যাট-কর ছাড়া) সাড়ে তিন কোটি টাকার কম। অথচ কোরিয়ার ঋণে কোচ কেনায় ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে চার কোটি টাকার বেশি। আবার গত বছর ইঞ্জিন কেনায় গড়ে ব্যয় হয়েছে ২৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ কোটি টাকা।

এর জবাবে রেলওয়ে জানায়, প্রকল্পটির জন্য ২০১৫ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই পরিচালনা করা হয়। এর ভিত্তিতে প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ইঞ্জিন ও কোচের দাম প্রাক্কলন করা হয়েছে। তবে ঋণচুক্তির শর্তমতে দেশটি থেকেই সবগুলো ইঞ্জিন-কোচ কিনতে হবে। তাই ব্যয় বেশি হলেও কিছু করার নেই।