প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ক্রেতার অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে অনেকেই নিম্নমানের পণ্য বানাচ্ছে

শায়লা পারভীন: বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি এগিয়ে যাচ্ছে দেশটির অর্থনীতি। শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্রুত প্রসার হচ্ছে। কিন্তু সেভাবে এগোচ্ছে না দেশের ক্রেতাসেবা। যাকে আমরা কাস্টমার সার্ভিস বলি সেটা এদেশে নেই বললেই চলে। দেশের অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাস্টমার সার্ভিস বিভাগ নেই। যেসব প্রতিষ্ঠানে বিভাগটি রয়েছে, তার অবস্থাও দুর্বল। ব্যবসায়ীদের মনমানসিকতাও ক্রেতা বা ভোক্তাদের সেবার পক্ষে নয়। ফলে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছে ভোক্তা। পণ্য ও সেবা নিয়ে থেকে যাচ্ছে তাদের অসন্তুষ্টি। দেশের নামি-দামি অনেক প্রতিষ্ঠানের কাস্টমার কেয়ার বিভাগ রয়েছে। এ বিভাগে কিছু কর্মীও রয়েছেন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে সেবা পায় না ভোক্তারা। কাস্টমার সার্ভিসকর্মী অভিযোগ শুনবেন। তারপর নানা অজুহাতে সমস্যার সমাধান না করেই ফিরিয়ে দেবেন। এ কারণে বিক্রয়োত্তর সেবা নিয়ে বেশিরভাগ মানুষ অসন্তুষ্ট। অনেকেরই এ বিষয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই।

ঢাকার একটি সুপার শপ থেকে দুই লিটার দুধ কিনে বাসায় ফিরছেন গৃহবধূ শিল্পী। বাসায় আসার আগে দেখেন তার ব্যাগ ভিজে দুধ পড়ছে। এক লিটার প্যাকেটের অর্ধেক দুধ রাস্তায় পড়ে গেছে। পরের সপ্তাহে ব্র্যান্ড পরিবর্তন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আরেক কোম্পানির দুধ আনলেন। ফ্রিজে রাখার এক ঘণ্টা পর দেখলেন প্যাকেট চুইয়ে ফ্রিজের অন্যান্য পণ্য নষ্ট হয়েছে। সামান্য এ দুধ নিয়ে অভিযোগ করতে চান না তিনি। কারণ অভিযোগ করতে গেলে তাকে হাসির পাত্র হতে হবে। এ রকম নানা ভোগান্তিতে পড়ছে ভোক্তারা। এই ধরুন কোনো একটা নামি-দামি দোকান থেকে আপনি একটি শার্ট কিনলেন। দুবার ওয়াশ করার পর তার রং উঠে গেলো। আপনি শার্টটি নিয়ে দোকানে এলেন। রসিদসহ শার্টটি ফেরত দিতে চাইলেন। শত চেষ্টা করেও আপনি তা ফেরত দিতে পারবেন না। ফেরত তো দূরের কথা, ওই শার্টের পরিবর্তে অন্য একটি শার্টও আপনাকে দেবে না। ওরা যুক্তি হিসেবে দেখাবে আপনি এটি ওয়াশিং মেশিনে দিয়েছিলেন, গরম পানিতে ওয়াশ করেছেন এ রকম নানা যুক্তি খাড়া করবে। আপনার কথা একটুও বিশ্বাস করবে না তারা। এ বিষয়ে যদি আপনি মালিকের সঙ্গে কথা বলতে চান, তারা আরও বিরক্ত হবে। আকারে ইঙ্গিতে এমন ব্যবহার করবে, আপনি একটা জাত ছোটলোক। এটাই দেশের কাস্টমার সার্ভিস। পণ্য বা সেবা কিনলেন তো আপনি ফেঁসে গেলেন।

কিছুদিন আগে এক ভদ্রলোক একটি সুপার শপ থেকে আয়রন কিনেছেন। আয়রনটি কেনার এক মাস পরে এটি অকেজো হয়ে যায়। তিনি এটি মেরামতের জন্য সুপার শপে ফেরত দেন। সেখান থেকে ১৫ দিন পর খোঁজ নেওয়ার জন্য বলা হয়। ১৫ দিন পর তিনি সেখানে দেখা করলে বলা হয়, পরের সপ্তাহে আসুন। এভাবে চার সপ্তাহ ঘুরলেও তার আয়রনটি ঠিক হয়নি। অবশেষে তিনি চিৎকার করে তার অসন্তোষ ও অসহায়ত্বের কথা বলেন। এরপর লোকজন জড়ো হয়। বিষয়টি হেড অফিসে জানানো হয়। তারও এক মাস পরে তিনি তার আয়রনটি ফেরত পান। এই হলো দেশের কাস্টমার সার্ভিস।

মাইক্রোসফট ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোন কিনে অনেকেই ফেঁসে গেছেন। একই রকম অভিযোগ রয়েছে দেশি ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোন কোম্পানির বিরুদ্ধেও। মোবাইল ফোন বিক্রির আগে যেভাবে তারা হাসিমুখে কথা বলেন, বিক্রির পর তাদের সেবা নিতে গেলে তাদের চেহারায় ততটাই বিরক্তি দেখা যায়। আর কোনো কারণে বিক্রীত মাল ফেরত দিতে চাইলে আপনাকে অন্য কোনো গ্রহের মানুষ বলে মনে করবে। আমার জানামতে, দেশে কাস্টমার সার্ভিস নিয়ে কোনো আইন অথবা পলিসি নেই। কিন্তু এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের উন্নত দেশে। যুক্তরাজ্যের সেলস অব গুডস অ্যাক্ট ২০১৫ অনুযায়ী, যে কোনো পণ্য ফেরত দেওয়া ক্রেতার অধিকার। এ অধিকার অনুযায়ী ২৮ দিন পর্যন্ত আপনি পণ্যটি ফেরত দিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে আপনি পণ্যটি ব্যবহার করতে পারবেন না। এ আইনকে আমলে নিয়ে সেদেশের পণ্যবিক্রেতারা বিনা বাক্যব্যয়ে পণ্য ফেরত নিয়ে টাকা দিয়ে দেন।

ব্রিটেনের দামি জুতার ব্র্যান্ড ক্লার্ক। বিশ্বে এ ব্র্যান্ডটি বেশ নামকরা। ক্লার্কের জুতায় কোনো ধরনের সমস্যা হলে এক বছরের মধ্যে তা ফেরত দিয়ে নতুন এক জোড়া জুতা পাওয়া যায়। আর এ সুযোগ নিয়ে অনেকই জুতা কিনে এক বছর যাচ্ছেতাইভাবে ব্যবহার করেন। এক বছর শেষ হওয়ার আগে কোনো রকম একটু সমস্যা হলে রসিদসহ চলে যান সেই নির্দিষ্ট দোকানে। সমস্যার কথা বলেন। দোকানের বিক্রেতা একাধিকবার দুঃখ প্রকাশ করে ওই দামের পছন্দের একটি জুতা দিয়ে দেন। যুক্তরাজ্যের বাঙালি প্রবাসীদের অনেকেই এটি করেন। ক্রেতা সন্তুষ্টি দিতে ক্লার্কসহ অনেক ব্র্যান্ড এ ধরনের সেবা দিয়ে থাকে। এতে কিন্তু ওই কোম্পানিগুলো দেউলিয়া হয়ে যায় না। বরং তাদের ব্যবসা বাড়ে, সুনাম বাড়ে।

বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্যের ইতিহাস কম করে হলেও পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ সাল থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য চলে আসছে। যিশুখ্রিষ্টের জšে§র এক হাজার বছর আগে থেকেই নৌপথে ব্যবসা-বাণিজ্য চালু হয়। তখন থেকেই ক্রেতার সন্তুষ্টি বিধানে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। বলতে গেলে তখন থেকেই কাস্টমার সার্ভিসের বিষয়টি ব্যবসায়ীদের মাথায় আসে। তবে ১৭৬০-১৮২০ সাল পর্যন্ত শিল্পবিপ্লবকালীন এটির ব্যাপক প্রসার লাভ করে। ১৮৭৬ সালে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের টেলিফোন আবিষ্কারের পর এটি আরও বিস্তৃত হয়। মানুষ টেলিফোনের মাধ্যমে পণ্যের গুণাগুণ সম্পর্কে জানতে পারে। পাশাপাশি টেলিফোনেই পণ্যের নানা সমস্যা সম্পর্কে অভিযোগ আকারে জানাতে পারে।

খুশি মনে কাস্টমারের সেবা দিতে আনন্দ পায় বিশ্বের প্রায় সব নামি-দামি প্রতিষ্ঠান। এটাকে তারা ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করে। মাইক্রোসফটের কর্ণধার বিল গেটস বলেছেন, ‘ইয়োর মোস্ট আনহ্যাপি কাস্টমারস আর ইয়োর গ্রেটেস্ট সোর্স অব লার্নিং’। অপর আমেরিকান উদ্যোক্তা জিম রন মনে করেন, একজন ক্রেতার সমস্যা মনোযোগ দিয়ে শুনে তার সমাধান করা ১০ হাজার ডলার বিজ্ঞাপনের চেয়ে বেশি কার্যকর।

অনেক দেশেই গ্রাহকসেবার মান একটি কোম্পানির ভালো-মন্দ যাচাইয়ের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু আমাদের দেশে সে সংস্কৃতি এখনও চালু হয়নি। আমাদের কাস্টমাররা পণ্যের গুণগতমান নিয়ে সচেতন নয়। পণ্য কেনার পর তা খারাপ হলে ভাগ্যকে দোষ দিয়ে ঘরে বসে থাকে। এজন্য বিক্রেতার কাছে যাওয়া ও অভিযোগ আকারে তা উপস্থাপন করতে অনেকেই লজ্জা বোধ করে। সরকার ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে ‘জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর’ প্রতিষ্ঠা করলেও সেখানে রয়েছে নানা সমস্যা। এর অন্যতম হলো অসচেতন ভোক্তা। ভোক্তারা ভেজাল, নি¤œমানের পণ্য ভোগ করলেও অভিযোগ করতে চায় না। পণ্যের পেছনে অর্থ ব্যয় করলেও তার গুণ বা মান নিয়ে তাদের ভ্রুক্ষেপ নেই। এ কারণে দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীরা আরাম-আয়েশে ব্যবসা করে যাচ্ছেন। ১৬ কোটি ভোক্তার দেশে যে যেভাবে পারছে পণ্য উৎপাদন করে আকর্ষণীয় মোড়কে বিপণন করছে। এজন্য তারা কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন ব্যয় করছে। কিন্তু ক্রেতার সন্তুষ্টি তাদের মাথায় নেই। তাদের অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে অনেকেই নি¤œমানের পণ্য উৎপাদন করছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভোক্তা। এ অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। সেক্ষেত্রে বাড়াতে হবে ক্রেতা সচেতনতা। বর্জন করতে হবে নি¤œমানের পণ্য। পরিবারের ভেতর থেকেই ক্রেতা সন্তুষ্টির বোধ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি ক্রেতা সন্তুষ্টির জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই গুণগত মানের পণ্য তৈরিতে উদ্বুদ্ধ হবেন উৎপাদকরা। পাশাপাশি ক্রেতা সন্তুষ্টিও অগ্রাধিকার পাবে।

 

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত