সারা বাংলা

ক্রেতাশূন্য শম্ভুগঞ্জ চামড়ার হাট

এম ইদ্রিছ আলী, ময়মনসিংহ: বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সর্ববৃহৎ চামড়া ক্রয়-বিক্রয় কেন্দ্র শম্ভুগঞ্জ চামড়ার হাট ক্রেতাশূন্য। নেই তেমন কোনো হাঁকডাক। চামড়া নিয়ে অপেক্ষায় আছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিখ্যাত চামড়ার হাট শম্ভুগঞ্জ। সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার বসে এ হাট। এ হাটে ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর ও টাঙ্গাইল থেকে চামড়া বিক্রি করতে আসেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। গত শনিবার হাটে গিয়ে দেখা গেছে, বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত কোরবানির চামড়া নিয়ে এসে স্তূপ করে রেখেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা, কিন্তু বিক্রির জন্য ক্রেতা পাচ্ছেন না। ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়েছে পুরো চামড়ার বাজার। এ বছর কোরবানি মৌসুমে সবচেয়ে কম দামি ও চাহিদাহীন পণ্যে পরিণত হয়েছে চামড়া। দুটি খাসির চামড়া ২০-২৪ টাকা বিক্রি করে চামড়াপ্রতি ১০ টাকা খাজনা দিয়ে আসল টাকার যা থাকে তা দিয়ে এক কাপ চা খাওয়া যায় না বলে অভিযোগ করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা।
লবণের দাম বেশি, চাহিদা অপ্রতুল, বড় ট্যানারি ব্যবসায়ীদের নাক সিটকানো ভাবের পাশাপাশি বাজারে ক্রেতার অভাব থাকায় কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বৃহত্তর ময়মনসিংহের খুচরা চামড়া ব্যবসায়ীরা। দু-এক ট্যানারি মালিক ও সাধারণ ব্যবসায়ী বাজারে এলেও প্রতিটি চামড়ার দাম হাঁকছেন কেনা দামের চেয়ে ৩০০-৪০০ টাকা কম। ফলে বড় অঙ্কের লোকসানে পড়ার আতঙ্কে আছেন সুদে টাকা ধার নিয়ে চামড়া কেনা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি স্থায়ী ব্যবসায়ীরাও। ঈদের বেশ কয়েক দিন কেটে গেলেও চামড়া বিক্রি করতে পারছেন না তারা।
স্থানীয় খুচরা চামড়া ব্যবসায়ী সন্টু রবিদাস জানান, প্রতিটি খাসির চামড়া ১০ থেকে ১২ টাকায় কিনেছেন। প্রতি চামড়ায় লবণ, খাজনা, শ্রমিক খরচসহ দাম পড়ে ৩৮-৪০ টাকা। ট্যানারির ক্রেতারা প্রতিটি চামড়ার দাম বলেন ১০ থেকে ১২ টাকা। যদি দুটি চামড়া ২৪ টাকায় বিক্রি করেন, তাহলে দুটি চামড়ায় ২০ টাকা খাজনা দিয়ে বাকি টাকায় এক কাপ চায়ের দাম হয় না।
নেত্রকোনার হিরনপুর থেকে চামড়া বিক্রি করতে আসা উজ্জ্বল রবিদাস জানান, তিনি ৫০টি চামড়া ১৪০ টাকায় বিক্রি করেছেন। ঈশ্বরগঞ্জ থেকে চামড়া বিক্রি করতে আসা রিপন মিয়া জানান, ২৫-৩০ ফুট একটি চামড়া কিনেছেন ৩০০ টাকায়। প্রতি চামড়ায় লবণ, পরিবহন, জিলানী, লেবার ও খাজনাসহ মোট দাম হয় ৫৫০-৬০০ টাকা। ট্যানারির মালিকরা চামড়াপ্রতি দাম বলেন ৩০০-৩৫০ টাকা। সুদের ওপর টাকা নিয়ে এত টাকার চামড়া কিনেছেন। এত ঘাটতি হলে পথে বসতে হবে।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়ি থেকে চামড়া বিক্রি করতে আসা খুচরা ব্যবসায়ী জামাল মিয়া জানান, তিনি প্রায় আড়াই লাখ টাকার গরুর চামড়া কিনেছেন। বাজারে চামড়ার যে দাম, তাতে দেড় লক্ষাধিক টাকা লোকসান হবে।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া থেকে আসা কৃষ্ণপাল নামে এক ব্যবসায়ী জানান, তিনি আড়াই লাখ টাকার চামড়া কিনেছেন। এখন মনে হচ্ছে, অর্ধেকই লোকসান হবে।
আলী আকবার নামে এক ব্যবসায়ী জানান, তিনি ৯ লাখ টাকার চামড়া কিনে বাজারে নিয়ে এসেছেন, কিন্তু ক্রেতা না থাকায় বিক্রি করতে পারছেন না। কেউ কোনো দামই করছেন না।
চামড়া ব্যবসায়ী রঞ্জিত রবিদাস জানান, তিনি সুদে ধার নিয়ে ১৫ লাখ টাকার চামড়া কিনেছেন। এখন তিনি মহাবিপাকে পড়েছেন। এই চামড়া বিক্রি করতে না পারলে তার বাঁচার কোনো পথ থাকবে না।
শেরপুর থেকে আসা চামড়া বিক্রেতা মজিবুর রহমান জানান, প্রতিটি চামড়া কেনার পর লেগে থাকা মাংস ছাড়ানো জন্য খরচ হয় ১০০ টাকা, লবণ ১৫০ টাকা, জমা দিতে হয় ৫০ টাকা তারপর রয়েছে যাতায়াত ভাড়া। এতে ৩০০ টাকা কেনা চামড়ায় প্রায় খরচ পরে ৭০০ টাকা। কিন্তু বাজারে এলে পাইকার পাই না। যাও দু-একজন আছেন তারা দাম বলছেন কেনা দামের চেয়েও কম। এই অবস্থায় চামড়া কিনে এবার বড় বিপদেই পড়তে হয়েছে।
শম্ভুগঞ্জ বাজারের ইজারাদার মাহবুবুল হক বাবলু সরকার জানান, গরুর চামড়াপ্রতি ৫০ টাকা ও খাসির চামড়াপ্রতি ১০ টাকা খাজনা ধার্য করা হয়েছে। তবে গতবারের তুলনায় চামড়া বেচাকেনা অনেক কম। তারা এক কোটি ৭০ লাখ টাকায় বাজারের ডাক নিয়েছেন, তা উঠবে বলে মনে হয় না।
রিলায়েন্স ট্যানারির ক্রেতা আবু তাহের জানান, সরকার-নির্ধারিত গরুর প্রতি ফুট চামড়া ৩৫-৪০ টাকায় কিনছেন। তবে খুচরা ব্যবসায়ীদের ফাঁদে ফেলে কম দামে চামড়া কেনার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।
রহমান লেদার প্রোডাক্টসের স্বত্বাধিকারী আবদুর রহমান জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার চাহিদা কম, তাই চামড়ার দামও কম। তাছাড়া ব্যাংক থেকে যে পরিমাণ লোন ট্যানারি মালিকদের দেওয়ার কথা ছিল, তা দিচ্ছে না বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

সর্বশেষ..