সারা বাংলা

ক্ষতিপূরণের আশায় নরসিংদীতে সড়কের পাশে স্থাপনা নির্মাণ

ঢাকা-সিলেট চার লেন প্রকল্প

শরীফ ইকবাল রাসেল, নরসিংদী: চলতি বছরই শুরু হওয়ার কথা ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ। এজন্য অধিগ্রহণ করা হবে সড়কের দুপাশের জমি। এ খবরে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় নরসিংদীতে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দু’পাশে রাতারাতি গড়ে উঠছে স্থাপনা। কয়েকটি চক্র নিম্নমানের কাঁচামাল ব্যবহার করে নির্মাণ করছে এসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতর সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (একনেক) অনুমোদন দিয়েছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প। মহাসড়ক উন্নীতকরণের এই প্রকল্পের নরসিংদী অংশে রয়েছে ৫২ কিলোমিটার এলাকা। চলতি বছর থেকেই শুরু হওয়ার কথা রয়েছে এই কাজ। মহাসড়ক আইন অনুযায়ী সড়কের দুপাশের ১০ মিটার দূরত্বে স্থাপনা নির্মাণের নিয়ম রয়েছে।
স্থানীরা জানান, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেন প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের সময় সরকারের তরফ থেকে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ লাভের আশায় মহাসড়কের দুপাশে নির্মিত হয়েছে শতাধিক স্থাপনা। এসব স্থাপনার মধ্যে রয়েছে বাড়িঘর, মার্কেট ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বিগত চার-পাঁচ মাস ধরে চলছে এসব বহুতলবিশিষ্ট নিম্নমানের স্থাপনা তৈরির কাজ। স্থানীয় প্রশাসন ও সড়ক কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞার পরও চলছে বেশকিছু স্থাপনার নির্মাণকাজ। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ীসহ স্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এসব স্থাপনা নির্মাণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষাভাবে সহায়তা দিচ্ছে। নিম্নমানের কাঁচামাল দিয়ে রাতারাতি গড়ে ওঠা এসব স্থাপনার ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া জমি অধিগ্রহণের সময় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সরকার।
মহাসড়কের শিবপুর উপজেলার চৈতন্যা এলাকার একটি ভবন নির্মাণকাজে নিয়োজিত এক শ্রমিক জানান, তিনতলা এই ভবনটির মালিক শিবপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ খানের পুত্রবধূ। উপজেলা চেয়ারম্যানের ছেলে তাপস তা তদারকি করছেন। কারখানা গড়ে তোলার জন্য ভবনটি নির্মাণ করা হচ্ছে বলে জানান ওই শ্রমিক। নির্মীয়মাণ আরেকটি ভবনের এক শ্রমিক জানান, চারতলার এই ভবনের নিচে গরুর খামার হবে, ওপরে হবে কমিউনিটি সেন্টার, আন্ডারগ্রাউন্ডে হবে গরুর খামার। ভাড়াও দেওয়া হবে। এক মাস আগে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু করা হয়।
একইভাবে মহাসড়কের শিবপুরের কারারচর থেকে ভৈরব পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলা স্থাপনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন প্রভাবশালীরা। তবে ঠিক কী উদ্দেশ্যে এসব ভবন নির্মিত হচ্ছে, সে সম্পর্কে কিছুই জানেন না স্থানীয়রা।
আবুল হোসেন নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, কিছুদিন ধরে রাতারাতি এসব ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। একতলা থেকে চারতলাবিশিষ্ট এসব ভবন নির্মিত হচ্ছে মহাসড়কের জমি অধিগ্রহণের সময় অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণের আশায়। এতে মহাসড়কের জমি অধিগ্রহণের সময় সরকারের বাড়তি অর্থ ব্যয় হবে। প্রকৃত জমির মালিকরা একটা নির্দিষ্ট কমিশন পেলেও সরকারের মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেবে জড়িত এসব চক্রের সদস্যরা।
স্থানীয়রা আরও জানান, সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল জমির মালিকরা না জানলেও এসব চক্র জমির মালিকদের সঙ্গে কমিশনের চুক্তিতে স্থাপনা গড়ে তুলছে। বাড়িঘর বা ভবন তৈরির জন্য সংশিষ্ট স্থানীয় সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হয়, কিন্তু এসব ভবন অনুমোদন ছাড়াই হচ্ছে। এতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কতিপয় লোকজনও জড়িত থাকতে পারে, না হলে এসব ভবন কীভাবে নাকের ডগায় রাতারাতি গড়ে উঠছে? সরকারের অর্থ বাঁচাতে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
নরসিংদী সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মোফাজ্জল হায়দার জানান, সড়কের পাশের আগের অবস্থা ভিডিও রেকর্ডিং করে প্রকল্প পরিচালকের দফতরে পাঠানো হয়েছে। চলমান এসব অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধে ১৬৪টি স্থাপনা মালিককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট উপজেলা ও পৌর কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে, যাতে এসব স্থাপনার নির্মাণকাজ বন্ধ করা হয়। মহাসড়ক আইনের শর্ত উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তি টানিয়ে সতর্ক করা হচ্ছে।
নরসিংদীর ডিসি সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন জানান, ভবনগুলোর বিষয়ে পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ অনুমোদন দিয়ে থাকে। তিনি গত উন্নয়ন সমন্বয় সভায় বলে দিয়েছেন, পৌরসভা ও উপজেলা যাতে আবশ্যিকভাবে অনুমোদনবিহীন ভবনগুলো অপসারণের ব্যবস্থা নেয়। এছাড়া এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন (ভিডিওসহ) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

সর্বশেষ..