দিনের খবর সারা বাংলা

ক্ষতির পরিমাণ ৩৮৭ কোটি টাকা রপ্তানিমুখী চিংড়ি খাতে ধস

সৈয়দ মহিউদ্দীন হাশেমী, সাতক্ষীরা: বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব ও নানামুখী প্রতিবন্ধকতার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে উৎপাদিত রপ্তানিমুখী চিংড়ি খাতে ব্যাপকভাবে ধস নেমেছে। কারখানায় মাছ ক্রয় বন্ধ ও রপ্তানি না হওয়ায় খামারিরা উৎপাদিত মাছ সঠিক দামে বিক্রি করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন। ফলে রপ্তানিমুখী এ পণ্যের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮৭ কোটি টাকা।

সরেজমিনে বিভিন্ন বাজার ও খামার ঘুরে দেখা যায়, বাগদা ও গলদা চিংড়ির যেমন দরপতন ঘটেছে অস্বাভাবিক হারে, তেমনি উৎপাদনও কমেছে। চিংড়ি খাত বাঁচাতে সরকারের দ্রুত প্রয়োজনীয় বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এ খাত সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, কভিড-১৯-এর কারণে ইউরোপসহ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি আদেশ একের পর এক বাতিল হওয়াসহ মাছ কোম্পানিগুলো ক্রয় বন্ধ করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সরকার ২০১৯-২০ অর্থবছরে হিমায়িত চিংড়ি থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছিল প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রকৃত আয় হয়েছিল ৩০ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ফলে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।

সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে হিমায়িত মাছের অর্ধেক যায় যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় দেশগুলোয়। তবে করোনা মহামারির কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ চার মাসে ২৯০টি হিমায়িত চিংড়ির ক্রয়াদেশ বাতিল করেছে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো, যার আর্থিক মূল্য প্রায় এক হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা। অথচ ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত রপ্তানির মাধ্যমে সাত হাজার ৩০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, রপ্তানি ও বিক্রি কমায় সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনাসহ দেশের উপকূলীয় এলাকার প্রায় পাঁচ লাখ চিংড়িচাষি ও মাছ প্রক্রিয়াকরণ কোম্পানিতে কর্মরত অন্তত ৫০ হাজার শ্রমিকের ভাগ্য অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফিশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) সূত্রে জানা যায়, দেশের হিমায়িত খাদ্য রপ্তানির বড় অংশই চিংড়ি। এ খাতে ৭০ শতাংশের ওপর আয় আসে চিংড়ি থেকে। দেশে প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর জমিতে চিংড়ির চাষাবাদ হয়। এর বার্ষিক উৎপাদন প্রায় দুই লাখ ৩০ হাজার টন। প্রক্রিয়াকরণের জন্য সারা দেশে রয়েছে ৭০টি প্রতিষ্ঠান। এই হিমায়িত খাদ্য বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে রপ্তানি হয়।

পরিসংখ্যানমতে, কয়েক বছর ধরেই হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানির আয় নি¤œমুখী। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চিংড়ি রপ্তানি করে আয় হয় ৩৯ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা। পরে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩৩ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩৬ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩৫ হাজার ৬৮ কোটি টাকা আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আয় নেমে আসে ৩৪ হাজার ২৪৪ কোটি টাকায়। আর ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা নেমে দাঁড়ায় ৩০ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকায়। পাঁচ বছরে এ খাতে রপ্তানি কমেছে ৯০৮ কোটি টাকা।

গলদা চিংড়ি হ্যাচারি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি শেখ শাফি আহমদ শেয়ার বিজকে বলেন, চিংড়ির উৎপাদন কমে যাওয়ার মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর নাব্য হ্রাস, পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও খামারে সঠিক সময়ে নদীর পানি না পাওয়া। এছাড়া মানসম্মত পোনা উৎপাদন না হওয়াও দায়ী। এ ছাড়া বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি রয়েছে। নতুন নতুন বাজার সৃষ্টিতে উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি।

আর রপ্তানিকারকরা বলছেন, হিমায়িত চিংড়িতে ভাইরাসের সংক্রমণ, মানসম্মত রেণু পোনার অভাব, বঙ্গোপসাগরে মাদার চিংড়ি আহরণে নিষেধাজ্ঞা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ কভিড-১৯-এর কারণে ধারাবাহিকভাবে কমছে চিংড়ির রপ্তানি আয়। এতে নানা কারণে সংকটে পড়েছে দেশের চিংড়ি রপ্তানির খাত।

উল্লেখ্য, দুই বছর ধরে সরকার মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে চিংড়িসহ সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করে আসছে। এ সময়ে হ্যাচারি মালিকরা সাগর থেকে মাদার চিংড়ি সংগ্রহ করতে না পারায় পোনা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চিংড়ি চাষি, রেণু পোনা উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীসহ চিংড়ি খাত সংশ্লিষ্টরা। এরই মধ্যে অনেক ঘেরে চিংড়ির উৎপাদন কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এ শিল্পের সুনাম ধরে রাখতে ও রপ্তানি বৃদ্ধি করতে সরাসরি সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তা না হলে আগামী দিনগুলোয় রপ্তানি বাণিজ্যে ব্যাপকভাবে ধস নেমে আসবে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..