প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা আনুন

সরকার ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন ধরনের আয়বর্ধক কর্মসূচির মাধ্যমে নানামুখী ব্যবস্থা নিয়েছে। ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’র শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার কথা বলা হয়েছে, যদিও এখন পর্যন্ত পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুরা (চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও ওঁরাও) নিজেদের ভাষায় প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নে নেয়া প্রকল্প সন্তোষজনক হলেও আয়বর্ধক কর্মসূচি তেমন সাফল্য পায়নি। অথচ তাদের প্রধান সমস্যা হলো আর্থিক সমস্যা। সচ্ছল ও স্বাবলম্বী করা গেলে তাদের হয়তো নিদারুণ অর্থকষ্টে মানবেতর জীবনযাপন করতে হতো না। সরকার তাদের জীবনমান উন্নয়নে প্রকল্প নিয়েছে। কিন্তু প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের অনিয়ম-দুর্নীতিতে তা ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

‘সমতলের অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প: চাঁদপুরে দুই ভেড়া-বকনায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর উন্নয়ন’ শীর্ষক যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গতকালের শেয়ার বিজে, তা সরকারের কর্মসূচির অংশ বলা যাবে না।

প্রতিবেদন বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘সমতল ভূমিতে বসবাসরত অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পে অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পার্বত্য জেলা বাদ দিয়ে সমতল অঞ্চলের ২৯ জেলার ২১০ উপজেলায় বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকদের নিয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রকল্পে চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, কক্সবাজার, খুলনা, সাতক্ষীরা, বরগুনা, পটুয়াখালী অঞ্চলের রাখাইন, ত্রিপুরা, মুণ্ডা, বুনো এবং বকবানিয়া জনগোষ্ঠীর লোকদের উপকূলীয় দক্ষিণাঞ্চল-৪-এর আওতাভুক্ত করা হয়। শুরু থেকেই চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলায় নানা অনিয়মের মধ্যেই প্রকল্পের কার্যক্রম চলতে থাকে। সুফলভোগী নির্বাচনে বেঞ্চমার্ক সার্ভে (প্রশ্নপত্র জরিপ) পদ্ধতি অবলম্বন করে তালিকা তৈরির কথা থাকলেও শ্রীপুর ও সাহাপুর থেকে ২৯ জেলে পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে শাহরাস্তি উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে জমা দেয়। তারপর নানা অনিয়মের মধ্য দিয়েই প্রকল্প চলতে থাকে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে শাহরাস্তি উপজেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও আমিষের চাহিদা পূরণের সুযোগ সৃষ্টি করা কতটা সম্ভব, সে প্রশ্ন উঠেছে।

আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী স্বতন্ত্র সংস্কৃতির হলেও তারা এ দেশেরই নাগরিক। তারা মূল জনগোষ্ঠীর অংশ। দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের এ জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে, উন্নয়নের বাইরে রেখে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। যুগ যুগ ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলসহ অন্য কয়েকটি অঞ্চলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও জাতিসত্তা বসবাস করলেও সমতল এলাকায়ও তাদের বসত রয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা তেমন পায় না তারা। বেশিরভাগ লোকই বাস করে খাস জমিতে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের সুবিধা তারা পাননি। সবচেয়ে বড় কথা, তারা কর্মঠ ও সহজসরল। পরনির্ভরশীলতা তাদের পছন্দ নয়। কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার লোভের শিকার হয়ে নৃ-গোষ্ঠীর উন্নয়নে গৃহীত প্রকল্পের সুফল তারা পাবেন না, এটি দুঃখজনক। উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে এসব প্রকল্পের সুফল পাবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী।