দিনের খবর শেষ পাতা

খতিয়ে দেখা হচ্ছে বংশাল শাখা ব্যবস্থাপকের সম্পৃক্ততা

ঢাকা ব্যাংকে চার কোটি টাকা লোপাট

নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যাংকের ভল্ট থেকে টাকা সরেছে ধীরে ধীরে, কিন্তু প্রতিদিন ঠিকই হিসাব মিলিয়ে রাখা হয়েছে কাগজে-কলমে। সেই তথ্য ও প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো অর্থের হিসাব বিবরণীতেও মিল রাখা হয়েছে। এসব কাগজে স্বাক্ষর রয়েছে ঢাকা ব্যাংকের বংশাল শাখা ব্যবস্থাপক আবু বকর ছিদ্দিকের। কিন্তু প্রায় চার কোটি টাকা লোপাটের ঘটনায় তাকেই আসামি করা হয়নি।

মামলার এজহারে শাখা ব্যবস্থাপকের নাম না থাকলেও ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা দেখা হচ্ছে এবং তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এজন্য শাখা ব্যবস্থাককেও নজরদারিতে রেখেছে ঢাকা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তকারী দল ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গতকালও শাখা ব্যবস্থাপককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। বিষয়টি একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে।

জানা গেছে, ঢাকা ব্যাংকের বংশাল শাখা থেকে তিন কোটি ৭৭ লাখ টাকা লুটের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় ১৭ জুন সন্ধ্যায় ব্যাংকের ভল্টের নগদ টাকা যাচাই করে দেখার পরে। যে পরিমাণ অর্থ নগদ হিসেবে থাকার কথা, বাস্তবে তা নেইÑশাখা পর্যায়ে এমন গুঞ্জন ওঠে। বিষয়টি প্রধান কার্যালয় জানার পরে তদন্তে পাঠানো হয় অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগের একটি দলকে।

তারাই নিরীক্ষা শেষে নগদ অর্থের পরিমাণ যাচাইয়ে নামে। তখন দেখা যায়, অভিনব কৌশলে ৫০০ টাকার নোটের বান্ডিলের ভেতরে ১০০ টাকার বান্ডিল। আবার এক হাজার টাকার বান্ডিলের ভেতরে ৫০০ টাকার বান্ডিল রয়েছে। টাকার বান্ডিল ভেঙে গুনতে গেলে বেরিয়ে আসে প্রকৃত চিত্র।

গুনে দেখা যায়, এভাবে ব্যাংকের ভল্টে তিন কোটি ৭৭ লাখ ৬৬ হাজার টাকার কোনো হদিস নেই। গত বছরের আগস্ট থেকে ঘটনার তারিখ পর্যন্ত সময়ে অর্থ সরিয়ে ফেলার ঘটনাটি সংঘটিত হয়। এ পরিমাণ অর্থ লোপাট হওয়ার ঘটনায় প্রাথমিকভাবে ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডের বংশাল শাখার ম্যানেজার (অপারেশন) এমরান আহম্মেদ এবং সিনিয়র অফিসার ও ক্যাশ ইনচার্জ রিফাতুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। ঘটনাটি বর্তমানে দুদক তদন্ত করছে।

গতকাল দুদকের একটি দল ঢাকা ব্যাংকের বংশাল শাখা পরিদর্শন করে। এ সময় তদন্ত দলের সদস্যরা ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। অর্থ লোপাটের বিষয়টি কবে জানা গেছে, কার কী দায়িত্ব, ভল্টের চাবি কার কার কাছে থাকে, কীভাবে নগদ অর্থের হিসাব মেলানো হয় প্রভৃতি বিষয়ে শাখা ব্যবস্থাপককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদকের তদন্ত দল।

সূত্র জানায়, ধীরে ধীরে টাকা লোপাটের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। বিষয়টি শাখা ব্যবস্থাপক অবহিত ছিলেনÑএমনটি ধরে নিয়েই তদন্ত করা হচ্ছে। এজন্য তাকেও নজরদারিতে রেখেছে দুটি তদন্ত দলই। এজন্য শাখা ব্যবস্থাপককে ছুটিতে বা অন্য কোথাও না যেতে নিষেধ করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, অভ্যন্তরীণভাবে ঢাকা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ইন্টারনাল অডিট অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স বিভাগের প্রধানের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এ ঘটনায়। কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত সব তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। এ তথ্যর ওপর ভিত্তি করে পরে আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবে ঢাকা ব্যাংক। এ কমিটি লোপাট হওয়া অর্থ সরিয়ে নিতে জড়িতদের দায় নির্ধারণ করবে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. এমরানুল হক গতকাল শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এ ঘটনায় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছে। দুদকও তদন্ত করছে। আপাতত যাদের দায়িত্বে ভল্ট পরিচালিত হতো তাদের নামেই মামলা দায়ের করা হয়েছে। এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে আরও নাম বেরিয়ে এলে তাদের নামও এজহারে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সে ক্ষেত্রে বংশাল শাখা ব্যবস্থাপকের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাকেও বাদ দেয়া হবে না। টাকা কীভাবে গেল, কারা কারা সম্পৃক্ত প্রভৃতি বিষয় নিবিড়ভাবে যাচাই করে দেখা হচ্ছে।’

দায়িত্বশীল সূত্রমতে, এ ঘটনায় লাভবান শাখা ব্যবস্থাপকসহ আরও কয়েকজন লাভবান হয়েছেন বলে বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। ম্যানেজার (অপারেশন) মামলার আসামি হওয়ায় তিনি এখন ব্যাংকে নেই। এ মুহূর্তে শাখা ব্যবস্থাপককেও সরিয়ে নিলে ব্যাংক পরিচালনায় গ্রাহকদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে। তাই এ মুহূর্তে শাখা ব্যবস্থাপককে সরিয়ে নেয়নি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। যেকোনো সময়ে তাকে অব্যাহতি দেয়া হবে।

এদিকে গতকালই বংশাল শাখায় নতুন অপারেশন ম্যানেজার নিযুক্ত করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তিনি গতকালই ব্যাংকশাল শাখায় যোগ দিয়েছেন। সূত্র জানায়, ব্যাংকিং পরিচালনা পদ্ধতি অনুযায়ী, শাখা পরিচালনা, কর্মীবাহিনীর জবাবদিহি, কর্মবণ্টন ও তদারকি করেন শাখা ব্যবস্থাপক। তার কাছেও ভল্টের চাবির একটি সেট থাকে। তার স্বাক্ষর ছাড়া ক্যাশ হিসাব চূড়ান্ত করা হয় না। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত এ ঘটনায় তাকে দায়ী করা হয়নি। তা নিয়েও গুঞ্জন রয়েছে ব্যাংক কর্মকর্তাদের মাঝে।

এতো বড় অঙ্কের অর্থ লোপাটের বিষয়টি হঠাৎ কীভাবে সামনে এলো, এতদিন ভল্টের রাখা অর্থের হিসাব কীভাবে মিলল, তা যাচাই না করেই শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে আপনি কীভাবে প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করলেনÑএ প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি শাখা ব্যবস্থাপক আবু বকর ছিদ্দিক। তিনি শুধু বলেছেন, ‘বিষয়টি দুদক তদন্ত করছে। আমি কোনো কথা বলব না।’

এদিকে অর্থ লোপাটের ঘটনা শুনে অনেক গ্রাহকই ব্যাংকে গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। গতকাল সকাল থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলনে গ্রাহকদের বেশ চাপ ছিল। দীর্ঘ সময়ে লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা তুলতে দেখা গেছে। অনেকেই ব্যাংকে ফোনে কথা বলেই আসছেন ব্যাংকে।

গতকাল দেখা যায়, ঢাকা ব্যাংকের বংশাল শাখায় প্রবেশের আগে সবার পরিচয় ও শাখায় আসার কারণ জানতে চাচ্ছেন গেট খোলার দায়িত্বে থাকা প্রহরী। পরিচয় নিয়ে ভেতর থেকে অনুমতি নিয়ে আসছেন তারা। ভেতর থেকে অনুমতি পেলেই তাকে ব্যাংকে ঢুকতে দিচ্ছেন।

পুরান ঢাকার ব্যবসায়িক এলাকা হিসেবে পরিচিত বংশাল। আয়রন শিট, প্লাস্টিক উপকরণ, ম্যাট, গাড়ির পার্টস, মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ খুচরা ও পাইকারি হিসেবে সারাদেশে বিক্রি হয় এখান থেকে। এজন্য ব্যবসায়িক লেনেদেনও বেশি হয়। গতকাল বংশালে থাকা বেসরকারি আরও কয়েকটি ব্যাংক ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে গ্রাহক চাপ খুব একটা নেই।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..