প্রচ্ছদ শেষ পাতা

পানগাঁও আইসিটি : খরচ বেশি ও সময় অপচয় আসছে না কনটেইনার

রহমত রহমান: আমদানি-রফতানিতে গতিশীলতা আনতে ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা হচ্ছে কার্যক্রম। রফতানির ক্ষেত্রে বিল অব এক্সপোর্ট নোটিং করার তারিখেই শুল্কায়নসহ যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। শিল্পের কাঁচামাল দ্রুত খালাসে করা হচ্ছে না শতভাগ কায়িক পরীক্ষা। এতসব উদ্যোগ নেওয়ার পরও পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনালে (আইসিটি) ব্যবসায়ীদের আগ্রহ কম।
অতিরিক্ত জাহাজভাড়া, সময় অপচয়, যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা, সন্দ্বীপ-হাতিয়া চ্যানেলে নাব্যসংকট, কোয়ারেন্টাইন ও বিএসটিআই অফিস না থাকাসহ নানা সমস্যার বেড়াজালে আবদ্ধ এ আইসিটি। ফলে একদিকে টার্মিনালটি ঘিরে কাক্সিক্ষত রাজস্ব আহরণ বাড়ছে না। ব্যবসায়ীদের এ টার্মিনাল ব্যবহারে আগ্রহী করে তুলতে বেশ কয়েকটি সুপারিশ করেছে পানগাঁও কাস্টম হাউজ। সম্প্রতি কমিশনার ইসমাইল হোসেন সিরাজী এনবিআরে এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি দিয়েছেন।
সূত্র জানায়, সমস্যার বেড়াজালে আবদ্ধ থাকায় এ আইসিটিতে এক বছরের ব্যবধানে কনটেইনার আমদানি কমেছে ২৯৯টি, যেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এসেছে এক হাজার ২২৩টি। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এসেছে মাত্র ৯২৪। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ৯৮০ কোটি টাকার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৮৬০ কোটি টাকা। এছাড়া বিদায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা এক হাজার ১০২ কোটি টাকার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ৫৬০ কোটি টাকা।
চিঠিতে বলা হয়, পানগাঁও আইটিসির গতিশীলতা বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে গত ১৩ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চিঠি দেওয়া হয়। এছাড়া এ আইসিটি দিয়ে পণ্য আমদানি ও রফতানিতে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ এবং উৎসাহ প্রদানের জন্য বন্দর, বিআইডব্লিউটিএ, কার্গো ভেসেল অ্যাসোসিয়েশন, সামিট অ্যালায়েন্স, ফ্রেইট ফরোয়ার্ড অ্যাসোসিয়েশন, আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসহ স্টেকহোল্ডাদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় আলোচনা সভা হয়েছে।
সভায় তারা এ বন্দর ব্যবহারে বন্দর, কাস্টমস, জাহাজভাড়া, অতিরিক্ত সময় ব্যয়সহ নানা বিষয় তুলে ধরে পরামর্শ দিয়েছেন। এর মধ্যে প্রথমত শিপিং লাইন ও ফ্রেইট ফরোয়ার্ডের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তার মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পানগাঁও জাহাজে কনটেইনারের অতিরিক্ত ভাড়া ও সময় অন্যতম। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জাহাজ কনটেইনার দ্বারা পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত জাহাজ আসে না। ফলে সময় অপচয় হয় এবং চট্টগ্রাম বন্দরকে চার্জ দিতে হয়। আংশিক অপূর্ণ জাহাজ এলেও খালি যেতে হয়। ফলে কনটেইনারের বাড়তি ভাড়া দিতে হয়।
আমদানি করা পণ্যের জাহাজ সরাসরি পানগাঁও আসে না। চট্টগ্রাম বন্দরে মাদার ভেসেল হয়ে ফিডার ভেসেল ও পরে লাইটার ভেসেলে পানগাঁও আসে। ফলে পানগাঁও বন্দরে পণ্য পৌঁছাতে গড়ে ৮-১০ দিন অতিরিক্ত সময় লাগে। এতে আমদানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আরও বলা হয়, মার্কস লাইন ছাড়া অন্য কোনো শিপিং লাইনের অফিস পানগাঁওয়ে নেই। ফলে ঢাকা শহরের বিভিন্ন শিপিং লাইনের অফিস থেকে ডেলিভারি অর্ডার কপি গিয়ে আনতে হয়। এতে সময় নষ্ট হয়, পণ্য খালাসে দেরি হয়। দ্বিতীয় অন্যতম বন্দরের সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা, সন্দ্বীপ-হাতিয়া চ্যানেলে নাব্যসংকট, বাল্ক হ্যান্ডলিংয়ে সক্ষমতার অভাব, হলেজ চার্জ এবং নেই কোনো স্ক্যানার। কনটেইনার স্ক্যানার, রেডিয়েশন ডিটেক্টর ও ভারী পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে পর্যাপ্ত ফর্কলিফট ও যন্ত্রপাতি না থাকায় দ্রুত ও সঠিকভাবে পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হয় না। হাতিয়া ও সন্দ্বীপ চ্যানেলে নাব্যসংকটের কারণে বিভিন্ন এলাকায় ডুবোচরের তৈরি হয়েছে। ফলে পানগাঁও বন্দরে পণ্যবাহী জাহাজ আসার পথে আটকে পড়ে।
চিঠিতে বলা হয়, ২০১৮ সালের নভেম্বরে সন্দ্বীপ চ্যানেলে ডুবোচরে আঘাত লেগে তিনটি এবং চলতি বছরের মে মাসে ৪৩টি কনটেইনার নদীতে পড়ে যায়। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আমদানিকারকরা এখানে পণ্য আনতে রাজি হন না। এছাড়া বুড়িগঙ্গায় নাব্যসংকট রয়েছে। নাব্যসংকট কাটাতে জরুরি ভিত্তিতে ড্রেজিং করা প্রয়োজন। ব্যবসায়ীরা এ বন্দর দিয়ে বাল্ক আমদানিতে আগ্রহী হলেও এ বন্দরের সেই সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। এ বন্দরে হলেজ চার্জ দিতে হয় বলে ব্যয় বেড়ে যায়। ফ্রি টাইম ও পোর্ট চার্জ আরও কমানো প্রয়োজন। এ বন্দরের জন্য আধুনিক স্ক্যানার প্রয়োজন। সাময়িকভাবে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে একটি স্ক্যানার দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেটি সচল না থাকায় আনা হয়নি।
কাস্টম হাউজের সীমাবদ্ধতার বিষয়ে বলা হয়, কাস্টমসের জন্য বন্দরে খুবই সামান্য জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে কর্মকর্তাদের জায়গা হয় না। এছাড়া আটক করা পণ্যের জন্য কোনো গোডাউন নেই। হাউজের কোনো নিজস্ব জমি নেই। ফলে নিজস্ব ভবন নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ বন্দর দিয়ে বেশিরভাগ বাণিজ্যিক পণ্য আমদানি হয়। স্ক্যান করতে না পারায় রাজস্ব ঝুঁকি থাকে। নিজস্ব রাসায়নিক ল্যাব না থাকায় পণ্য দ্রুত খালাসে সমস্যা হয়। এছাড়া এ বন্দরে কোয়ারেন্টাইন ও বিএসটিআই’র নিজস্ব অফিস না থাকায় রিপোর্টের জন্য অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়। বিপজ্জনক পণ্যের রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য চট্টগ্রাম থেকে নৌ কর্মকর্তাদের আসতে হয়। চিঠিতে বন্দর ও কাস্টমসের গতিশীলতা আনার জন্য দ্রুত এসব সমস্যা সমাধানের সুপারিশ করা হয়।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি নৌ প্রতিমন্ত্রী পানগাঁও আইসিটি পরিদর্শন শেষে জানিয়েছেন, শিগগিরই পানগাঁও আইসিটি পুরোদমে চালু হবে। ২০১৩ সালে বুড়িগঙ্গার তীরে প্রায় ৮৯ একর জমির ওপর পানগাঁও আইসিটির উদ্বোধন করা হয়। টার্মিনালের জেটির দৈর্ঘ্য ১৮০ মিটার ও প্রস্থ ২৬ মিটার। এর কনটেইনার ধারণক্ষমতা তিন হাজার ৫০০ টিইইউস। দুটি মোবাইল হারবার ক্রেন, দুটি স্ট্র্যাডেল ক্যারিয়ার, দুটি সাইড লিফটার, দুটি ট্রাক্টর টেইলার, তিনটি কার্গো ক্রেন এবং ১২টি ফর্কলিফট দিয়ে কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হচ্ছে। পানগাঁও-চট্টগ্রাম রুটে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চারটি জাহাজ চলাচল করছে। বিআইডব্লিউটিসি’র দুটি জাহাজকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কলকাতা থেকে সরাসরি পানগাঁও আইসিটি চলাচলের জন্য নৌকল্যাণ অধিদফতরের একটি জাহাজ ও মেরিন ট্রাস্টের কয়েকটি জাহাজ যাতায়াত করছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..