মত-বিশ্লেষণ

তারা কেন বেছে নেন এমন পথ!

দেশের তৃতীয় সারির একজন মডেল অভিনেত্রীর ঈদ শুভেচ্ছা বার্তা। শুধু জামা পরে পায়জামা ছাড়া অশ্লীল ভঙ্গিতে ফেসবুক লাইভে তিনি দেশবাসীকে পবিত্র ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। তা দেখে দর্শকরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন কমেন্ট বক্সে। কমেন্ট দেখতে দেখতে হতবাক হলাম। লাইভ শেষে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে তিনি দর্শকদের প্রতিক্রিয়ার পাল্টা জবাব দিয়েছেন কুরুচিশীল ও নোংরা ভাষায়!

এটি একজন মডেল বা অভিনেত্রীর কথা। কিন্তু বর্তমানে ফেসবুক, ইউটিউবে এমন শত শত মডেলকন্যার উত্থান ঘটেছে, যাদের সস্তা জনপ্রিয়তার মাপকাঠি হলো লাইক, কমেন্ট ও ভিডিও ভিউয়ের পরিমাণ। নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটানোর এসব কথিত মডেল অভিনেত্রীদের জালে সহজেই পা ফেলছে উঠতি বয়সের যুবকেরা। আবার এসব কতিপয় কথিত অভিনেত্রীরা নিজেদের অর্ধ-উলঙ্গ ও বিকৃত অঙ্গভঙ্গিতে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় ছড়িয়ে দেন। এসবে লাইক, কমেন্টস আর শেয়ার করে বিকৃত আনন্দ লাভের চেষ্টা করে থাকে তরুণসমাজ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এমন অন্ধকার পথের পথিক কথিত অভিনেত্রীরা?

মূলত এমন কাজ করে থাকেন দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির মডেল বা অভিনেত্রীরা। যখন তারা কাজ পান না, হতাশায় ভোগেন, তখন এমন মরীচিকার রঙিন স্রোতে গা ভাসিয়ে দেন। এসব কর্মকাণ্ডে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলেও তারা তা গায়ে মাখেন না। কারণ সিংহভাগ অভিনেত্রী সমাজের সঙ্গে মেশেন না, সাধারণ মানুষ থেকে সবসময় দূরে থাকেন। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে বা তার কোনো কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হলে এটিকে তিনি জনপ্রিয়তার পাল্লায় মেপে থাকেন।

সাম্প্রতিক সময়ে ওয়েব সিরিজের নামে মিনি পর্ন তৈরির যে অপচেষ্টা শুরু হয়েছিল, এসবেও মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন দেশের দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির এসব । সবচেয়ে মজার বিষয় সমালোচনা সৃষ্টিকারী ও নৈতিকতার অবক্ষয়কারী অভিনেত্রীরা এহেন অপকর্মকে সংস্কৃতির শিল্প হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আত্মগৌরবে ভুগে থাকেন। অথচ হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিতে কখনোই অশ্লীলতার অনুপ্রবেশ ঘটেনি। আগে নাটক ও সিনেমা তৈরি হতো বাস্তবিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে, যার সঙ্গে সমাজজীবনের মিল পাওয়া যেত। মা, বাবা, সন্তান ও পরিবারের সদস্যরা মিলে একত্রে বসে রুচিশীল সাংস্কৃতিক শিল্পকর্ম উপভোগ করতেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে সমাজের পোকাস্বরূপ কতিপয় পরিচালক ও অভিনেত্রীদের জন্য পুরো সংস্কৃতি অঙ্গন কলুষিত হয়ে পড়েছে। আবার নাটক বা সিনেমায় আইটেম গানের নামে যে অপসংস্কৃতির চর্চা হচ্ছে সেটিও লজ্জাজনক। ভিনদেশি সংস্কৃতির করাল থাবা দেশীয় রুচিশীল ও ঐতিহ্যবাহী সামাজিক সংস্কৃতির ধারাকে বিলীন করে দিচ্ছে। এটির মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবের কল্যাণে। সেখানে ভিউ ও লাইক-কমেন্টের বিবেচনায় যেমন সেলিব্রিটি বনে যাওয়া যায়, তেমনি সঙ্গে থাকে আয়ের উৎস। আবার সুস্থ ধারার সংস্কৃতিকে অসুস্থ করার যে প্রয়াস চলছে, সেটির ক্ষেত্রেও প্রথম সারির অভিনেতা, অভিনেত্রী, পরিচালক ও প্রযোজকের নীরব ভূমিকা অনেকাংশে দায়ী।

একথা বলতেও দ্বিধা নেই যে, বাংলাদেশের কতিপয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিবিদরা নারী ও মদকে চিত্তবিনোদন ও ভোগ্যপণ্যের বস্তু হিসেবে পরিগণিত করে থাকেন। সামাজিক যোগযোগমাধ্যম কিংবা ওয়েব সিরিজের নামে মিনি পর্নগ্রাফি তৈরির মাধ্যমে প্রভাবশালী মহলে নিজেদের পরিচয় করিয়ে দেওয়াও মূলত মূল উদ্দেশ্য থাকে বিপথগামী এই মডেলদের।

হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাসের সুস্থ সংস্কৃতিকে দূষিত হওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে। এজন্য দর্শকসহ সর্বস্তরের নাগরিকের ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। সংস্কৃতি বিনিময়ের নামে দেশীয় সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার যে পাঁয়তারা চলছে, তা রুখে দিতে হবে।

আখতার হোসেন আজাদ

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..