আসাদুজ্জামান রাসেল, রাজশাহী : শীতের আগমনী বার্তায় রাজশাহীর গ্রামীণ পথঘাটে খেজুরগাছের চাচা-ছিলার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন হাজার হাজার গাছি। এই ঐতিহ্যবাহী পেশা শুধু স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ নয়, বরং রাজশাহীর অর্থনীতির একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি। চলতি ২০২৪-২৫ মৌসুমে খেজুরের গুড় থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যা গত বছরের ১৪১ কোটি টাকার রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই খাতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, জেলায় মোট ১১ লাখ ১১ হাজার ৩৪৩টি খেজুরগাছ ৫৪৩ হেক্টর জমিতে ছড়িয়ে আছে। প্রতিগাছ থেকে শীতকালে (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) গড়ে ২০-২৫ কেজি রস সংগ্রহ হয়, যা থেকে ৮-১০ কেজি গুড় তৈরি করা যায়। এ হিসাবে চলতি মৌসুমে মোট গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৮ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বাঘা, দুর্গাপুর, চারঘাট ও পুঠিয়া উপজেলা সব চেয়ে অগ্রগামী। শুধু বাঘা উপজেলাতেই ২৫ কোটি টাকার গুড় উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে।
খেজুরের গুড় তৈরির প্রক্রিয়া ঐতিহ্যবাহী এবং বেশ কঠিন শ্রমের ও সময়সাপেক্ষ। গাছিরা রাতের অন্ধকারে ভোররাতে গাছে উঠে রস সংগ্রহ করেন, যা স্কালে জ্বাল দিয়ে ঘন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিগাছের জন্য ২০০-৩০০ টাকা করে নেয়া হয়। দুর্গাপুরের পলাশবাড়ী গ্রামের লুতফর রহমান বলেন, আমার ১৫০টি গাছ থেকে মৌসুমে ১৫ লাখ টাকারও বেশি আয় হয়। এটাই আমাদের বছরের মূল আয়।
কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. উম্মে সালমা জানান, এবার আবহাওয়া অনুকূল থাকলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। ২০০ কোটি টাকারও বেশি আয় হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
রাজশাহীর খেজুর গুড়ের বাজার শুধু স্থানীয় নয়, দেশব্যাপী বিস্তৃত। প্রধান হাটগুলো যেমন পুঠিয়ার বানেশ্বর (শনি-মঙ্গলবার), ঝলমলিয়া (সোম-বৃহস্পতিবার) ও বাঘাহাটে প্রতি সপ্তাহে ২৫০ টন পাটালি গুড় ও ১০০ টন লালি (ঝোলা গুড়) গুড় বেচাকেনা হয়। এসব হাট থেকে গুড় পরিবহনে কয়েক হাজার ভ্যানচালকের কর্মসংস্থান হয়। তারপর ট্রাকে করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। বানেশ্বর বাজারের ব্যবসায়ী রেজা বলেন, প্রতি কেজি গুড় ১৩০-১৫০ টাকায় বিক্রি করছি। শুধু ঢাকায় প্রতি সপ্তাহে ২০-৩০ টন পাঠানো হয়।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনলাইনে বেচাকেনাও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দুইশর বেশি তরুণ উদ্যোক্তা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও ই-কমার্স সাইটে খাঁটি গুড় বিক্রি করছেন। অনলাইনে বেচাকেনায় জড়িত ব্যবসায়ী সোহেল বলেন, প্রতিদিন ১ টন গুড় অনলাইনে বিক্রি হয়। দাম ৪৫০-৫০০ টাকা কেজি, কারণ খাঁটি গুড়ের চাহিদা বেড়েছে।
এই প্ল্যাটফর্মগুলোয় শুধু বিক্রি নয়, ব্র্যান্ডিংও হয়েছে। বাঘা উপজেলার উম্মে কুলসুমের ‘রাজশাহী পিওর জ্যাগারি’ ভেজালমুক্ত গুড় সারা দেশে সরবরাহ করছে ২৫০-৩০০ টাকা কেজি দরে, যা বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী হাটের স্বাভাবিক দামের দ্বিগুণ। বানেশ্বর বাজার ব্যবসায়ী সমিতির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য বলেন, অনলাইনের কারণে আমাদের বাণিজ্য ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এখন ক্রেতারা সচেতন, খাঁটি গুড় চান।
খেজুরগুড়ের খাত এখন রাজশাহীর গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড। কৃষি অধিদপ্তরের হিসাবে, এই খাতে ৪৯ হাজার ৭১১ জন চাষি, ৬৪৪ জন ব্যবসায়ী ও ২১ হাজার ৮৫৬ অন্যান্য কর্মী জড়িত। সব মিলিয়ে অর্ধ লাখের বেশি মানুষ এ খাতে সম্পৃক্ত। শীতের ছয় মাসে গাছিরা বছরের খরচ মেটান। বাকি সময়ে অন্য ফসল চাষ করে বাড়তি আয় করেন। চারঘাটের আবদুর রহমানের ১৫০ গাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা আয় হয়। নারীরা রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরিতে জড়িত পুঠিয়ার দিলারা বেগম বলেন, ‘প্রতিদিন ৫০০ টাকা পাই, মৌসুমে ৩০ জনের মতো আমরা কাজ করি।’
অনলাইন খাতে শিক্ষিত বেকার যুবকরা প্রবেশ করছেন। উদ্যোক্তা এনামুল হক বলেন, ‘হাটে শতাধিক টন খেজুরগুড় বিক্রি হয়, যা হাজারো পরিবারকে স্থিতিশীল করে।’ পরিবহন খাতেও ভ্যান ও ট্রাক মালিকরা মাসে লক্ষাধিক টাকা আয় করেন। এই কর্মসংস্থান গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাস করে, নারীর ক্ষমতায়ন হয়।
সূত্রমতে, গত মৌসুমে (২০২৩-২৪) রস ও গুড় থেকে ১৪১ কোটি ৮২ লাখ টাকা আয় হয়েছে। চলতি মৌসুমে লক্ষ্য ১৫০-২০০ কোটি টাকা। অনলাইনের আয় যোগ করলে ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
হাটে ১২০-১৫০ টাকা কেজি দরে, আর অনলাইনে ২৫০-৩০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। শুধু বাঘা হাটেই ৫০-৫৫ কোটি টাকা লেনদেন হয়। এই আয় স্থানীয় ব্যাংকিং, বাজার ও পরিবহন খাতকে উজ্জীবিত করছে। রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চার জেলা মিলিয়ে ২৪৬ কোটি টাকার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে খাতটিতে ভেজাল ও বিরূপ আবহাওয়ার চ্যালেঞ্জও কম নয়। চিনিমিশ্রিত ভেজাল গুড়ের প্রাদুর্ভাব বাজারের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে। একাধিক কৃষি কর্মকর্তা জানান, ভেজাল রোধে সচেতনতা বাড়ানো দরকার। আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে গাছের সংখ্যা কমছে; প্রায় সব এলাকায় এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। সরকারি সহায়তায় গাছ রোপণ ও প্রশিক্ষণ যেমন প্রয়োজন, তেমনি সঠিকভাবে গাছের পরিচর্যা দরকার। আবার রস সংগ্রহের জন্য গাছের যে অংশ কাটা হয়, তাকে স্থানীয় ভাষায় ‘মাথী’ বলে। এই মাথী অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে কাটা হয়, তা না হলে গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং উৎপাদন কম হয়।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই প্রাচীন শিল্প শুধু স্থানীয় অর্থনীতিই নয়, গ্রামীণ কর্মসংস্থানেও বড় অবদান রাখছে। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও পর্যটনÑএই তিন ক্ষেত্রের সমন্বয়ে রাজশাহীর ‘খেজুর শিল্প’ টেকসই উন্নয়নের এক নতুন অধ্যায় খুলে দিতে পারে।
অন্যদিকে খেজুর গাছের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। জলবায়ু পরিবর্তন, শ্রমিক সংকট এবং জ্বালানিনির্ভর উৎপাদন পদ্ধতির কারণে অনেক চাষি পেশা পরিবর্তন করছেন। পাশাপাশিই রাসায়নিক দ্রব্য বা চিনিমিশ্রিত গুড়ের কারণে ক্রেতাদের আস্থা কমছে।
রাজশাহীর খেজুর গুড় এখন সীমান্ত ছাড়িয়ে যাচ্ছে। থার্ড পার্টির মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানি শুরু হয়েছে। ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিদেশ থেকে অর্ডার পাচ্ছি; আমের মতো গুড়ও রপ্তানি হবে। বিভিন্ন তথ্যসূত্রের মতে, এই বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে বিদেশি বাজার জয় করা সম্ভব। সরকারের পরিকল্পনায় জিআই ট্যাগিং ও প্রসেসিং ইউনিট স্থাপন হলে আয় দ্বিগুণ হবে। খেজুরের গুড় শুধু একটি পণ্য নয়, রাজশাহীর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার প্রতীক। এই খাতকে আরও শক্তিশালী করে গ্রামীণ উন্নয়নের নতুন অধ্যায় রচিত হতে পারে।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post