প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

খেলাপি ঋণের অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় সতর্কতা

 

দেশে কয়লার যে চাহিদা, তার ৭০ শতাংশই আসে ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে, এ আমদানি পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করে মূলত সিলেট অঞ্চলের পাঁচটি শুল্ক স্টেশন তামাবিল, সুতারকান্দি, বড়ছড়া, চারাগাঁও ও বাগলী দিয়ে। এগুলোর মধ্যে প্রথম দুটি সিলেট ও শেষ তিনটি সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। বলা বাহুল্য, এ এলাকার ব্যাংকগুলোর ব্যবসা প্রধানত নির্ভর করে কয়লা, পাথর ও বালু ব্যবসার ওপর। এগুলোর মধ্যে কয়লা ও পাথর মূলত আমদানিনির্ভর। কয়লা আনা হয় দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া ও প্রতিবেশী ভারতের মেঘালয় থেকে। আর পাথর মেঘালয় থেকে আমদানির পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে কিছু সংগ্রহ করা হয় নদী থেকেও। সে কারণেই এখানকার কয়লা আমদানিকারকদের সুদিন থাকলে ব্যাংকগুলোও ভালো সময় পার করে। আবার কয়লা ও পাথর ব্যবসায়ীরা দুঃসময়ের মুখোমুখি হলে ব্যাংকেও পড়ে তার প্রভাব।

উদাহরণস্বরূপ ২০১৪ সাল-পরবর্তী অভিজ্ঞতা এখানে স্মরণ করা যেতে পারে। ওই বছরের মে মাসে ভারতের পরিবেশবাদী একটি সংগঠনের মামলার প্রেক্ষাপটে কয়লা রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দেশটির উচ্চ আদালত। এ নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকে দীর্ঘদিন। সে সময় এ পাশে বাংলাদেশের অনেক কয়লা ব্যবসায়ী পড়েন বিপাকে; দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত ইটভাটাগুলোর পাশাপাশি বিপাকে পড়তে হয় কয়লা আমদানি-সংশ্লিষ্ট অন্যদেরও।

এমন পরিস্থিতিতে সিলেট এলাকায় অবস্থিত ব্যাংকের শাখাগুলোয়ও বাড়তে থাকে খেলাপি ঋণ। কারণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের সিংহভাগই যুক্ত কয়লা ব্যবসায়। ওই অবস্থায় ব্যাংকের দায় পরিশোধ প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে তাদের জন্য। এর মধ্যে দুই বছর অতিবাহিত হলেও ওই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা যে সম্ভব হয়েছে, তা নয়। পরিস্থিতির জের এখনও টানতে হচ্ছে অনেক শাখাকে। ওই বিনিয়োগগুলো শ্রেণিকৃত বিনিয়োগে পরিণত হওয়ায় এর বিপরীতে প্রভিশন রাখতে গিয়ে নিট মুনাফা কমে আসছে অনেক শাখার।

বস্তুত এ পরিস্থিতি যে সংশ্লিষ্টদের ইচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্ট, তা নয়। কিছু বাস্তবতাও রয়েছে এর পেছনে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, কয়লা আমদানিকারকরা মূলত বাকিনির্ভর ব্যবসা করেন। পাওনা টাকা আদায়ের জন্য স্বভাবতই তাকে সরবরাহ রাখতে হয় স্বাভাবিক। সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে টাকা পাওয়া তাদের জন্য মুশকিল হয়ে পড়ে। ২০১৪ সালের মে মাসে ভারতের মেঘালয় থেকে কয়লা রফতানি বন্ধের পর এসব আমদানিকারকের অনেকের পক্ষে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়নি। তাই বাকি পাওনাও তুলতে পারেননি অনেকে। এখন সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চলে এমন কিছু মানুষ রয়েছেন, কয়লা ব্যবসায় যুক্ত হয়ে যারা হয়েছেন সর্বস্বান্ত। ব্যাংক ঋণের বোঝা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারছেন না তারা। এমন কিছু লোকের খবরও জানি, এলাকায় নিজের বাড়িতে পর্যন্ত থাকেন না। তাদের অবস্থান সম্পর্কে অবগত করতে বাড়িতে থাকা স্বজনরাও খুব একটা আগ্রহ বোধ করেন না।

অনেকের জানা, বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালিত হয় ইউসিপিডিসির নিয়ম মেনে। আমদানি করা পণ্যের ডকুমেন্ট পাওয়ার পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট এলসির বিল পেমেন্ট দিয়ে দিতে হয়। এক্ষেত্রে আমদানিকারক নগদ টাকা দিতে না পারলে ব্যাংকগুলো বাধ্য হয়ে বিনিয়োগ হিসাব খুলে বিল পেমেন্ট করে। কিন্তু স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করতে পারেননি সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকরা। আর তাই এসব বিনিয়োগ পরিণত হয়েছে খেলাপি বিনিয়োগে।

অনেকে হয়তো বলবেন, ব্যাংক তো পর্যাপ্ত সহযোগী জামানত না রেখে কোনো গ্রাহককে বিনিয়োগ দেয় না। এ ধরনের বিকল্প নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কারও এলসি খোলার কথা নয়। তাহলে ওই সময় দেওয়া বিনিয়োগ খেলাপি থেকে যাচ্ছে কেন? ব্যাংক কি পারে না বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি করে পাওনা আদায় করতে? এ প্রশ্নের সহজ উত্তর, পারে। তবে বাস্তবতা হলো, এ ধারায় এগোনোর জন্য প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পাশাপাশি সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থ উদ্ধার সময়সাপেক্ষ। কিছু ক্ষেত্রে দেখেছি, এটি করতে গিয়ে ব্যাংককে মুখোমুখি হতে হচ্ছে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার।

সম্প্রতি আবার শুরু হয়েছে কয়লা আমদানি। একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এতে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন আমদানিকারকরা। এ খবর তাদের জন্য হলেও ব্যাংকগুলোর জন্য স্বস্তির কি না, তা বিবেচনা সাপেক্ষ। এটা ঠিক, কয়লা আমদানি পুনরায় শুরু হওয়ায় কিছু খেলাপি ঋণ হয়তো উদ্ধার হবে। ডিসেম্বরের হিসাব সমাপনী ঘিরে কিছু ঋণ পুনঃতফসিলও হয়তো হয়েছে। ঋণের টাকা কিস্তিতে পরিশোধের পাশাপাশি এর মাধ্যমে পুনরায় ব্যবসার সুযোগও পাবেন কেউ কেউ। এও ঠিক, এ সময়ে ব্যাংকগুলোকে আবার সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের এলসি খুলতে হবে। এসব এলসির পেমেন্টও করতে হবে যথাসময়ে। এখানে এ বিষয়ও মনে রাখতে হবে, নির্দিষ্ট সময় পর মেঘালয়ের কয়লার বাংলাদেশে প্রবেশ বন্ধ হয়ে যাবে। অর্থাৎ তখন পুনরায় সৃষ্টি হতে পারে একই পরিস্থিতি। এখন ব্যাংকগুলো যদি আগের মতো নির্বিচারে এলসি খোলে এবং এর বিপরীতে পর্যাপ্ত অর্থনিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হয়, তাহলে এ এলসিগুলোই পুনরায় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে তাদের জন্য।

প্রশ্ন হলো, ব্যাংকগুলো তাহলে কী করবে? গ্রাহকের আবেদন পেলে এলসি খোলা থেকে কি বিরত থাকবে? এলসি খুললে সংশ্লিষ্ট শাখাও কমিশনসহ অনেক ধরনের আয় করে। এ ধরনের আয় থেকে কি তারা নিজেদের বঞ্চিত করবে? এক্ষেত্রে নিকট অতীতে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা মাথায় রাখতে হবে। আর মনে রাখতে হবে একটি তথ্য, কয়লা আমদানি চলবে আগামী বছরের মে মাস পর্যন্ত। এর সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে অনেক গ্রাহক টাকা দিতে পুনরায় হিমশিম খাবেন। কিন্তু বিল আসার পর নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংককে তো পেমেন্ট করতেই হবে। সেজন্য এলসি খোলার সময়ই ব্যাংকগুলোকে হতে হবে সতর্ক। কার এলসি খুললে বিল যথাসময়ে পাওয়া যাবে, কাকে বিনিয়োগ দিলে ব্যাংক ঝুঁকিতে পড়বে না, সে বিষয়ে ভাবতে হবে এখনই। এক্ষেত্রে গ্রাহকদের পারফরম্যান্স বিবেচনায় রাখলে সমস্যার সমাধান কিছুটা হলেও হবে বলে আশা করা যায়।

ব্যাংক খাতে এখন অলস অর্থ প্রচুর। বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কর্মকর্তাদের ওপর চাপ আছে অনেক ব্যাংকে। শুনেছি, কর্মকর্তাদের বিনিয়োগ গ্রাহক সংগ্রহ এবং বিনিয়োগের টার্গেটও নির্ধারণ করে অনেক ব্যাংক। তা পূরণে কর্মকর্তারাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়ে উঠছেন বেপরোয়া। ডিসেম্বর সমাপনী ঘিরে সেটা কিছুটা বেড়ে উঠেছিল বলেই মনে হয়। এক্ষেত্রে একটি বিষয় লক্ষ রাখা দরকার, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি বিনিয়োগও বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। গত ছয় মাসে ব্যাংক খাতে নতুনভাবে সৃষ্ট খেলাপি বিনিয়োগ যে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, সে কথা ভুলে গেলে চলবে না। আজ চাকরি রক্ষার্থে নির্বিচারে পর্যাপ্ত কাগজপত্র ও সহযোগী জামানত না নিয়ে যে বিনিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যথাসময়ে সেটি আদায় না হলে এর কিছুটা দায় কি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ওপর বর্তাবে না?

একজন ব্যাংকারের এটা সবসময় মনে রাখা দরকার, বিনিয়োগ বা ঋণ হিসেবে যে অর্থ গ্রাহককে দেওয়া হচ্ছে, তার মালিক ব্যাংক নয় জনগণ। আর যা-ই হোক, টার্গেট পূরণে পর্যাপ্ত সহযোগী জামানত নিশ্চিত না করে জনগণের অর্থ অন্যের হাতে তুলে দেওয়া সুবুদ্ধির পরিচায়ক নয়। শাখার মুনাফা বাড়ানোর জন্য ব্যবস্থাপকরাও ঝুঁকি নেন অনেক ক্ষেত্রে। ব্যাংক যেহেতু মুনাফামুখী প্রতিষ্ঠান, সেজন্য এটা তাদের নিতেই হয়। তবে এ ধরনের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিতে হবে ভেবেচিন্তে। আবার সতর্কতা অবলম্বন করতে গিয়ে পরীক্ষিত গ্রাহকদের বঞ্চিত করাকেও ‘ভালো’ ব্যবস্থাপকীয় গুণাবলি বলে অভিহিত করা হয় না।

 

লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা

[email protected]