খেলাপি ঋণের রাস টানা জরুরি

কয়েক বছর ধরে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। সাধারণ মানুষের ধারণা, ঋণখেলাপি ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের উপযুক্ত শাস্তি না হওয়ায় প্রতি বছর অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ বাড়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনায় লোকসানের কারণে ঋণগ্রহীতা খেলাপি হতেই পারেন। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হচ্ছেন অনেকে। মামলা করেও এ ঋণ আদায় করা যাচ্ছে না। সাধারণত যাচাই-বাছাই না করে ঋণ দেয়ায় খেলাপি ঋণ বাড়ছে বলে ধারণা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালকরা নিজ ব্যাংক থেকে না নিয়ে অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন।

গতকাল শেয়ার বিজে ‘এখনও চলছে বিশেষ সুবিধা: ফের এক লাখ কোটি টাকা ছাড়াল খেলাপি ঋণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন ঋণ আদায়ে অবস্থাপনার কথাই সামনে এসেছে। কভিডকালে ঋণ পরিশোধে অনেক নিয়ম শিথিল করা হয়। এতে গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ফের এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ডিসেম্বর শেষে শৈথিল্য উঠে গেলে খেলাপির পরিমাণ আরও বাড়বে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ এক হাজার ১৫০ কোটি ৩০ লাখ টাকা, আগের প্রান্তিকে যা ছিল ৯৯ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। সুতরাং এক প্রান্তিকেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে এক হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা। আর গত তিন প্রান্তিকে বেড়েছে ১২ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। গত ৩১ ডিসেম্বর ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ছিল ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অনেক ব্যাংক ঋণ দেয়ার সময় ঝুঁকি পর্যালোচনা ছাড়াই আমানতের চেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে। পাশাপাশি ঋণগ্রহীতাদের অনেকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অথবা প্রভাবশালী কারও সহায়তায় ঋণ পেয়েছে। আবার একইভাবে তারা ঋণ ফেরত না দেয়ার সুযোগ নিয়েছে। ফলে পুরোনো অনাদায়ী ঋণ আদায় তো হচ্ছেই না, বরং নতুন করে দেয়া ঋণও খেলাপি হচ্ছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বরাবরই বলছে, অনাদায়ী ঋণ আদায়ে তাদের নানা পদক্ষেপ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নিলেও খেলাপি ঋণ ক্রমেই বাড়ছে। খেলাপি ঋণের সঙ্গে যারা জড়িত এবং যেসব নিয়ম মেনে ঋণ দেয়ার কথা, পরিপালিত হয়েছে কি না, তা তদারক করে বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে এবং বিভিন্ন সময় তা করাও হচ্ছে। কোনো ঋণের ক্ষেত্রে এক টাকা খেলাপি হলেও ওই গ্রাহকের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে জানানো বাধ্যতামূলক। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জমা দিতে হচ্ছে। ক্রেডিট কার্ডে ঋণ নিয়ে কেউ এক টাকার খেলাপি হলেও সে তথ্য থাকছে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি)। প্রায় প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বাড়ছে, অথচ নিয়ন্ত্রক সংস্থা তার কারণ খোঁজেনি কিংবা প্রতিকারে ব্যবস্থা নেয়নি। নিলে খেলাপি ঋণ বাড়ে কীভাবে। ডিসেম্বরের পর শৈথিল্য উঠে গেলে খেলাপির পরিমাণ আরও বাড়বে, কোনো সন্দেহ নেই। রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করলে খেলাপি ঋণের রাস টেনে ধরা সম্ভব বলেই আমরা মনে করি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯১  জন  

সর্বশেষ..