দিনের খবর প্রথম পাতা

খেলাপি ঋণ আদায়ে বিশেষ পরিকল্পনায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক

শেখ আবু তালেব: খেলাপি ঋণের উচ্চহারে জর্জরিত রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএল। এতে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা ও খেলাপি থেকে আদায়ে বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে ব্যাংকগুলো। ইতোমধ্যে কিছুটা সফলতাও পেয়েছে। ব্যাংকাররা আশা করছেন, করোনা মহামারির মধ্যেও খেলাপি ঋণে কমেছে তিন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের। এবার বছর শেষে এ খাত থেকে আদায় গত অর্থবছরের চেয়ে বেশি হবে।

খেলাপি ঋণ আদায়ে এমন কথাই জানালেন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা। তারা বলছেন, করোনা মহামারির সময়েও ২০২০-২১ অর্থবছর শেষে খেলাপি ঋণ থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের আদায় হয়েছে ৭৯০ কোটি ১৬ লাখ টাকা। অর্থনীতির প্রায় সবগুলো সূচকই এখন ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। চলছে শিল্পের চাকা। এজন্য চলতি বছর শেষে খেলাপি ঋণ থেকে আদায় গতবারের চেয়ে সন্তোষজনক হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর হিসাবে সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরের (২০২০-২১) শেষ দিনে ছয় ব্যাংকের খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৮১৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে (২০১৯-২০) ছিল ৪২ হাজার ৬৬৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৫১ কোটি ২০ লাখ টাকা। মূলত ২০২০-২১ অর্থবছরে বেসিক, সোনালী ও বিডিবিএলের খেলাপি ঋণ আগের অর্থবছরের তুলনায় বেড়েছে। মূলত এ তিন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণেই সার্বিকভাবে বাণিজ্যিক ব্যাংকের সার্বিক খেলাপি ঋণ আগের অর্থবছরের তুলনায় বেড়েছে। তবে অন্য ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ আগের অর্থবছরের চেয়ে কমেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরের (২০২০-২১) জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএলের খেলাপি ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় করেছে ৭৯০ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এটি লক্ষ্যমাত্রার ৪৯ দশমিক ২৩ শতাংশ। ব্যাংকাররা বলছেন, গত অর্থবছরের প্রায় পুরোটা সময়েই করোনা মহামারির প্রকোপ ছিল। অধিকাংশ সময়ই বন্ধ ছিল শিল্পের চাকা। জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ ছাড়া সবগুলো খাত থেকেই অর্থপ্রাপ্তি অনিশ্চিত ছিল। এরপরও খেলাপি থেকে আদায় করতে পেরেছে ব্যাংকগুলো।

এবার খেলাপি ঋণ থেকে আদায় বাড়াতে ঋণ পুনঃতফসিল, এককালীন এক্সিট, ২৫ শতাংশ পরিশোধে নিয়মিত দেখানোসহ একাধিক সুবিধা নিয়ে মাঠে নেমেছেন কর্মকর্তারা। ঋণ আদায় কার্যক্রম সরাসরি প্রধান কার্যালয় থেকে তদারকি করা হচ্ছে। ত্রৈমাসিক রিপোর্টিংয়ের পাশাপাশি প্রতি মাসেই তথ্য হালনাগাদ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা।

প্রসঙ্গত, প্রতি অর্থবছরের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের আর্থিক সূচকগুলোর উন্নয়নে একটি সমঝোতা চুক্তি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকও সেই চুক্তি অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করে।

সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য বিভিন্ন সূচকের বিপরীতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। জানা গেছে, চুক্তি অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত খেলাপি ঋণ থেকে আদায়ে অগ্রণী ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে ৪০০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে (২০২০-২১) আদায় হয়েছিল ১৮৬ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায়ের হার ৪৬ দশমিক ৫০ শতাংশ।

এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস্-উল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘খেলাপি হওয়া ঋণ আদায়ে অগ্রণী ব্যাংক ১০০ দিনের বিশেষ কর্মসূচি নিয়েছি। খেলাপিদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও তাদের অনেক ছাড় দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এককালীন এক্সিটসহ ঋণ পুনঃতফসিলে তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ চলছে। করোনা মহামারির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছিল। এখন অর্থনীতি সচল হতে শুরু করেছে। ব্যাংকের সব পর্যায় থেকেই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। আমরা ভালো রেসপন্সও পাচ্ছি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। আমরা আশাবাদী, এ বছর শেষে আমাদের আদায় গতবারের চেয়ে বেশি হবে।

অপর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সোনালীকে চলতি অর্থবছরের (২০২১-২২) জন্য খেলাপি ঋণ থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে ৫০০ কোটি টাকা। গত জুনে শেষ হওয়া ২০২০-২১ অর্থবছরে ব্যাংকটি আদায় করতে পেরেছিল ৩৬৩ কোটি টাকা। আদায়ের হার ৮০ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতাউর রহমান প্রধান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘অর্থবছরের শুরুতেই করোনার প্রকোপ কিছুটা কমেছে। বর্তমানে শিল্প-কারখানাগুলো চলছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে। সোনালী ব্যাংক গত অর্থবছরেও খেলাপি থেকে আদায়ে ভালো অবস্থানে ছিল। এ বছরও আদায়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে আলোচনা চলছে। বর্তমানে আদায়ের হার কিছুটা কম হলেও বছরের শেষ দিকে এ হার বৃদ্ধি পাবে। আমরা আশা করছি, ভালো করতে পারবে সোনালী ব্যাংক। কর্মকর্তারা সেভাবেই তৎপরতা চালাচ্ছেন।’

এদিকে অপর দুই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক রূপালী ও জনতা ব্যাংকও খেলাপি ঋণ আদায়ে তৎপরতা চালাচ্ছে। তথ্য বলছে, খেলাপি থেকে আদায়ে গত ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য রূপালী ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪০ কোটি টাকা। আদায় করতে পেরেছে ৫৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা। আদায়ের হার ৩৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরেও ব্যাংকটির আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অপরিবর্তিত অর্থাৎ ১৪০ কোটি টাকাই রাখা হয়েছে। আর জনতা ব্যাংক গত ২০২০-২১ অর্থবছর শেষে ৪৫০ কোটি টাকার বিপরীতে আদায় করেছে ১২০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। আদায়ের হার ২৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন হার।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..