প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

খেলাপি ঋণ কমাতে ‘বিশেষ বিবেচনা’!

ফরহাদ জাকারিয়া: সংবাদপত্রের খবরে প্রকাশ, খেলাপি ঋণ আদায়ে ‘বিশেষ’ গ্রাহকদের ‘বিশেষ বিবেচনা’র উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। এ সিদ্ধান্তের আওতায় একজন গ্রাহকের কাছে সুদে-আসলে পাওনা বাবদ ৩৬০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যে ১৩০ কোটি টাকা সুদ মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনও পেয়েছে ব্যাংকটি। এত বড় অঙ্কের সুদ মওকুফের নজির দেশের ব্যাংকিং খাতে সাম্প্রতিক কালে আর রয়েছে কি না, জানা নেই। এ নিয়ে নানা সমালোচনা যেমন হচ্ছে, তেমনই উঠছে প্রশ্ন।

সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ঠিক কী বিবেচনায় একজন গ্রাহকের এত বিপুল অঙ্কের সুদ মওকুফ করল? কেন্দ্রীয় ব্যাংকইবা তা অনুমোদন দিল কোন বিবেচনায়? সুদ মওকুফে বিশেষ বিবেচনার জন্য যাদের বাছাই করা হচ্ছে, তাদের নির্বাচনের মানদণ্ড কী? যে গ্রুপ অব কোম্পানির এ পরিমাণ টাকা মওকুফের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, তার চেয়ারম্যান যদি একটি রাজনৈতিক দলের সাবেক সংসদ সদস্য না হয়ে অন্য কোনো দলের হতেন, তাহলে কি এমন সুযোগ পেতেন? সন্দেহ নেই, সোনালী ব্যাংকে বড় অঙ্কের ঋণখেলাপি আরও অনেকে রয়েছেন, যারা ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের। এখন একইভাবে তারাও যদি সুদ মওকুফের জন্য আবেদন করেন, তাদেরও কি বিবেচনা করা হবে ‘বিশেষভাবে’?

কোনো গ্রাহক ব্যবসায় লোকসান করলে পরিচালনা পর্ষদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনসাপেক্ষে ব্যাংক তার সুদ মওকুফ করতে পারে। প্রত্যেক ব্যাংকই খেলাপি গ্রাহকের সুদ বা আরোপিত জরিমানা কমবেশি মওকুফ করে। কিছু ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে এটা করতে হয়। আরোপিত সুদ মওকুফ করে দিলে উল্লিখিত পরিমাণ খেলাপি ঋণ কমে যায় হিসাব থেকে। তাতে এ বাবদ সঞ্চিতিও রাখতে হয় না। ব্যাংক খাতে এটা নিয়মিত ঘটনা। সম্ভবত সেজন্য ছোট অঙ্কের মওকুফ নিয়ে খুব বেশি কথা হয় না। কিন্তু ১৩০ কোটি টাকা অঙ্কের দিক থেকে কম নয়। তাই এ নিয়ে কথাও হচ্ছে বেশি। ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞরা যেমন বলছেন, তেমন অন্যরাও।

এমন কার্যক্রমের ব্যাপারে ব্যাংকের নীতিও থাকে। তবে সব সময় একই নীতির অনুসরণ করা যৌক্তিক কি না, সে ব্যাপারেও রয়েছে প্রশ্ন। কারণ ব্যাংকের এ ধরনের কার্যক্রমে অন্যরা উৎসাহিত হয়। বিশেষত যারা অভ্যাসগত খেলাপি এবং রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী, তারা এটাকে নেন সুযোগ হিসেবে। দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ এখন আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় এ সমস্যা আরও বেশি। ‘বিশেষ বিবেচনার’ আওতায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি এরকম আরও কত গ্রাহকের সুদ মওকুফ করেছে, তা অবশ্য জানা যায়নি। প্রশ্ন হলো, একজন গ্রাহকের ব্যাপারে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের এমন সিদ্ধান্ত কি এখন অন্যদেরও উৎসাহিত করবে না? আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওই গ্রাহকের কাছে যে পরিমাণ টাকা পাওয়া সম্ভব ছিল এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সে সম্ভাবনাও কি শেষ হয়ে গেল না?

খেলাপি ঋণ কমাতেই ব্যাংকটির কর্তৃপক্ষ নিয়েছে এমন উদ্যোগ। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠবে এ সময়ে যারা সুদ মওকুফের আবেদন করবেন, তাদের সবাইকে কী বিবেচনায় নেওয়া হবে? বস্তুত ওই গ্রাহককে ঋণ হিসেবে যে বিপুল মূলধন জোগানো হয়েছিল, এর বিপরীতে আমানতকারী গ্রাহককে ইতোমধ্যে সুদ পরিশোধ করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ঋণ গ্রাহকের কাছে পাওনা যদি মওকুফ করা হয়, আমানতকারী গ্রাহককে সুদ বাবদ পরিশোধিত অর্থ সমন্বয় করা হবে কীভাবে? রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের যে মূলধন ঘাটতি রয়েছে, সেটা কারও অজানা নয়। চলতি অর্থবছরের বাজেটে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে মূলধন জোগানোর জন্য প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে, আমানতকারীকে সুদবাবদ পরিশোধকৃত এ টাকাও কি সমন্বয় করা হবে করের টাকা থেকে? জনগণের টাকা থেকেই যদি তা সমন্বয় করা হয়, তাহলে এ খেলাপি গ্রাহককে এত বিপুল পরিমাণ সুদ মওকুফ করা হলো কেন?

কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে যখন ঋণ দেওয়া হয়, তা মুনাফাসহ ফেরত আসবে কি না তখনই সেটা বিবেচনায় নেওয়া উচিত। উল্লিখিত গ্রাহককে ঋণ প্রদানে যারা যুক্ত, তারা এ বিবেচনা যথাযথ ধারা অনুসরণে করেছিলেন কি না, কে জানে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে এক্ষেত্রে শিথিলতার উদাহরণ রয়েছে অনেক। গ্রাহককে ঋণ প্রদানের ব্যাপারে ওই প্রক্রিয়ায় যুক্ত কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন কী ছিল সুদ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেটা কি খতিয়ে দেখা হয়েছে? এও কি খতিয়ে দেখা হয়েছে, ঋণ প্রস্তাব প্রক্রিয়াকরণে যুক্ত কর্মকর্তারা গ্রাহকের কাছে কোনো অবৈধ সুবিধা নিয়েছিলেন কি না? সঙ্গত কারণেই এসব বিষয় এখন খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ অবৈধ সুবিধা নিয়ে গ্রাহককে যারা ঋণ পাইয়ে দিয়েছেন, খেলাপি হওয়ার পর একই রকম সুবিধা নিয়ে তারাই যে সুদ মওকুফে তাকে সহায়তা করছেন না, সেটাইবা কে বলতে পারে! দেশের ব্যাংক খাতের অন্য প্রতিষ্ঠানে এমন উদাহরণও তো রয়েছে।

কোনো খেলাপি গ্রাহক যদি এভাবে পার পেয়ে যায়, তাহলে এর প্রভাব পড়ে ঋণ প্রস্তাব প্রক্রিয়াকারী কর্মকর্তাদের মধ্যেও। এ পরিস্থিতিতে ঋণ অনুমোদন ও অর্থ ছাড়করণে তারা বেপরোয়া মনোভাব প্রদর্শন করতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তাদের মনে এ ধারণা জন্মে শেষ পর্যন্ত তো কিছুই হবে না। এতে তাদের মধ্যেও বেড়ে ওঠে অপাত্রে ঋণ বিতরণ ও দুর্নীতির প্রবণতা। অনেকে মনে করেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার পেছনে এটাও অন্যতম কারণ। এ খাতের ব্যাংকগুলোয় এমন কর্মকাণ্ড কমাতে হলেও প্রকৃতপক্ষে লোকসানকারী গ্রাহকের সুদ মওকুফের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ভেবেচিন্তে। মওকুফের পরিমাণ তো বটেই, বিবেচনায় রাখা উচিত গ্রাহকের বাস্তবতা।

কোনো গ্রাহক সুদ মওকুফের জন্য যখন আবেদন করেন, তখনও আবেদনের সত্যতা যাচাই করে দেখা উচিত। অভিজ্ঞতায় দেখেছি, ছোট অঙ্কের ঋণ গ্রহণকারী অনেক গ্রাহকও এ ধারণা পোষণ করেন ব্যবস্থাপকের টেবিলে একটা আবেদনপত্র রাখলেই যদি কিছু টাকা মাফ পাওয়া যায়, তাহলে সে সুযোগ নিতে অসুবিধা কী! ব্যাংকের পাওনা যে প্রকৃতপক্ষে সাধারণ মানুষেরই, সে ধারণা ও বোধই নেই অনেকের মধ্যে! এটা এ কারণে করা দরকার, আমরা নৈতিকতার মানদণ্ডে এতটাই নিচে নেমে গেছি ব্যাংককে কিছু টাকা কম দেওয়ার জন্য মিথ্যা বলতে অনেকের বাধে না। আর কিছু মানুষ আছে, তারা অভ্যাসগতভাবে ঋণখেলাপি। তারা ব্যাংকের শাখায় এসে এমন মনোভাব প্রদর্শন করেন, ঋণ নিয়ে মূল টাকা ফেরত দিচ্ছেন এটাই তার দয়া! রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েও আবেদনে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে এ ধরনের সুবিধা নিতে চান কেউ কেউ। দেশের ব্যাংকিং খাতে এ ধরনের আবেদন আগের চেয়ে বাড়ছে কি না, সেটা নিয়ে গবেষণাও হতে পারে। বলা ভুল হবে না, গয়রহ মওকুফের এ চর্চা কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষকে খেলাপি হতে উৎসাহিত করে। এ ধারায় চিন্তা যাতে ব্যাপকতা লাভ না করে, সেজন্য মওকুফের আবেদনগুলো প্রক্রিয়াকরণ করা উচিত তদন্তের মাধ্যমে।

ব্যাংকের কাজ হলো আমানত গ্রহণ এবং ঋণ বিতরণের মাধ্যমে তা মুনাফাসহ ফেরত আনা। খেলাপি গ্রাহকদের বিশেষ বিবেচনায় মার্জনার উদাহরণ ঋণ আদায়ে কোনো ব্যাংকের অক্ষমতাই প্রকাশ করে। প্রশ্ন হলো, ব্যাংক যদি বিতরণ করা ঋণের টাকা আদায়ে নীতিগত এবং পরোক্ষভাবে অক্ষমতা প্রকাশ করে, তাহলে ঋণ বিতরণের বৈধতা কি তার থাকে? দেখা যাচ্ছে, বিশেষত বড় অঙ্কের খেলাপি গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে বরাবরই ব্যর্থ হচ্ছে সোনালী ব্যাংক। ঋণ আবেদন মূল্যায়নেও দেখা যাচ্ছে ব্যাংকটির নানা অদক্ষতা। এক্ষেত্রে এ মন্তব্যও সঙ্গত যে, ব্যাংকটি ‘বড়’ গ্রাহকদের যথাযথভাবে হ্যান্ডেল করতে পারছে না। প্রশ্ন হলো, এক্ষেত্রে বরাবরই যারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে নিজেদের অক্ষমতা প্রকাশের পর তাদের হাতে সে ক্ষমতা রাখা কি উচিত হবে? নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংক কোম্পানি আইন মেনে গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ এবং ঋণ বিতরণ করতে পারে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান যদি তার অদক্ষতা অব্যাহত রাখে, সেক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কিছুদিন আগে নতুন প্রজন্মের কয়েকটি ব্যাংকের ঋণ বিতরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এত কঠোর সিদ্ধান্ত নেবে বলে মনে হয় না। তবে মনে রাখা দরকার, দেশের ব্যাংক খাতকে আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করতে হলে এ ধরনের ব্যাংকগুলোর ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান। তাই এর পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের মন ‘বড়’ হতে পারে। বড় অঙ্কের সুদ মওকুফের পেছনে সেটাও কাজ করতে পারে কারণ হিসেবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এতে একই গ্রাহকের অন্য ব্যাংকে যদি খেলাপি ঋণ থাকে, তিনি সেখানেও যেতে পারেন একই দাবি নিয়ে; অন্য গ্রাহকও আসতে পারেন একইভাবে। যে গ্রাহকের ১৩০ কোটি টাকা সুদ মওকুফ করা হয়েছে অন্য কোনো ব্যাংকে তিনি খেলাপি কি না, জানি না। বাস্তবতা হলো, এরকম ব্যক্তিরা একটি প্রতিষ্ঠানে প্রশ্রয় পেলে একইভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন অন্য প্রতিষ্ঠানে। বিভিন্ন ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপিরা এভাবে যদি তোড়জোড় করতে শুরু করেন, তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, ভাবা যায়!

গ্রাহক বিশেষে ব্যাংকেরও ‘বিশেষ বিবেচনা’ থাকে; সেটা থাকা উচিত। তাতে ব্যবসা পরিচালনার সুবিধা হয়। কিন্তু কোনো ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বিশেষ বিবেচনার প্রভাব যদি জনগণের করের টাকায় কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে গিয়ে পড়ে, সেটা থাকা উচিত নয় কোনোভাবেই। বললে ভুল হবে না, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক পরিণত হয়েছে লুটপাটের ক্ষেত্রে। এভাবে বড় অঙ্কের, অভ্যাসগত ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুদ মওকুফ করা হলে লুটপাটকে নীতিগতভাবে উৎসাহ জোগানো হবে। এটা ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান অবস্থাকে নিয়ে যেতে পারে আরও খারাপের দিকে। আর যাই হোক, ব্যাংক খাতে মানুষের আমানত এখনও অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। কিন্তু অনৈতিক চর্চা যদি বৈধভাবেই বাড়তে থাকে, তাহলে এ খাতও বেশি দিন মানুষের জন্য নিরাপদ থাকবে না।

 

বেসরকারি খাতে কর্মরত

fzakariabdÑgmail.com