প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

খেলাপি ঋণ হ্রাসে বজায় রাখুন নৈতিক মান

‘৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ১২৩ কোটি টাকা’ শীর্ষক যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গতকালের শেয়ার বিজে, তা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে পাঠকের মনোযোগ কাড়বে বলেই ধারণা। যখন কৃচ্ছ্র সাধন ও সঞ্চয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সবাই, তখন খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার খবর কোনোভাবেই স্বস্তিকর নয়। প্রতিবেদনের তথ্য, মোট খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা এবং গত তিন মাসে বেড়েছে ৯ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, অপচয় বন্ধ, কৃচ্ছ্র সাধন ও সঞ্চয় করে কত টাকাই জিডিপিতে যোগ করা যাবে!

আমাদের অর্থনৈতিক খাতের বড় সমস্যা হলো খেলাপি ঋণ। এটি কোনোভাবেই কমানো যাচ্ছে না। ঋণ আদায় করতে না পেরে খেলাপি ঋণ কমিয়ে দেখানোর এক ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। মাঝেমধ্যে সংজ্ঞা ও নিয়ম বদলানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বাস্তবতা হলো, অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ থাকে না। বিশেষজ্ঞরা বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অঙ্গীকার না থাকায় খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান হয় না। বিভিন্ন সময় অর্থমন্ত্রীরা ব্যাংক কমিশন গঠনের কথাও বলেছিলেন। এটি ভালো উদ্যোগ, এমন কথা শোনা গেলেও তা গঠন করার কোনো প্রক্রিয়া দেখা যায়নি। আমাদের মনে আছে, ক্রমাগতভাবে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বিষয়ে গত জুনে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হলে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ঋণখেলাপি হওয়ার কারণ পাঁচটি। এগুলো হলো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়মবহির্ভূত চর্চা অব্যাহত থাকা; ব্যাংক কর্তৃপক্ষের প্রকৃত ঋণগ্রহীতা নির্বাচনে ব্যর্থতা; তিন. ঋণের বিপরীতে রাখা পর্যাপ্ত জামানত, একই সম্পদ একাধিক ব্যাংকে জামানত রাখা ও জামানত বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দেখানো; ঋণগ্রহীতার সব দলিল সংগ্রহ ও সঠিকতা যাচাই না করা এবং ঋণগ্রহীতার তহবিল ভিন্ন খাতে ব্যয় করা প্রভৃতি।

অর্থমন্ত্রী সেব কারণের কথা বলেছেন, তা সঠিক। কিন্তু একটি বিষয় তিনি এড়িয়ে গেছেন এবং তা সচেতনভাবে। তা হলো, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ঋণ দেয়া বা ঋণখেলাপির তালিকায় না ফেলার সংস্কৃতি। অথচ অর্থনীতিবিদ-বিশেষজ্ঞরা প্রথম থেকেই বলছেন, ঋণখেলাপিদের শাস্তি দেয়ার কথা এলেই একটা বিভাজন সরকারের তরফ থেকে করা হয়, সেটি হলো ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। এর মাধ্যমে কাউকে ছাড় দেয়ার, কাউকে পাকড়াও করার প্রচেষ্টা সাধারণের সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়।

ঋণ বিতরণ ও আদায়ে সমতা বিধান করা গেলে ন্যূনতম স্বচ্ছতা, নৈতিক মান বজায় থাকবে। ঋণ বিতরণ স্বচ্ছতার সঙ্গে উৎপাদনশীল খাতে হলে আদায় করতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এখানে ব্যাংকার-গ্রাহক উভয়ের নৈতিকতার বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এটি মানতেই হবে, ব্যাংকমালিক কিংবা ব্যাংকারের সংশ্লেষ ব্যতিরেকে কেউ ঋণখেলাপি হতে পারেন না। ঋণখেলাপি তো একদিনে হয় না। কতগুলো ধাপ অতিক্রম করার পরই কেউ ঋণখেলাপি হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। খেলাপি ঋণ কমাতে আমাদের প্রস্তাব হলো নিয়মনীতি ভঙ্গ করে ঋণ দেয়া, ঋণ মওকুফ, ঋণের পুনঃতফসিলীকরণ, ঋণের অবলোপন বন্ধ করতে হবে নিরপেক্ষভাবে, শূন্য সহনশীলতায়। ঋণের সংজ্ঞা, দান, আদায়সহ প্রতিটি পর্যায়ে নৈতিক মান বজায় রাখলে খেলাপি ঋণ কমবে বলে আশা করা যায়।