প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

খেলাপি গ্রাহকদের নামে মামলা করবে বেসিক ব্যাংক

শওকত আলী: রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক থেকে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ নিয়ে যারা ফেরত দেননি বা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেননি, সেসব খেলাপি গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। সম্প্রতি ব্যাংকটির ঋণ আদায়সংক্রান্ত এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বেসিক ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ঋণ প্রদানে অনিয়মের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শ মোতাবেক ২০১৪ সালের জুলাইয়ে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় সরকার। পরবর্তী সময়ে আলাউদ্দিন এ মজিদকে পুনর্গঠিত পর্ষদের চেয়ারম্যন ও খোন্দকার মো. ইকবালকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এদিকে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় জালিয়াতির মাধ্যমে যেসব গ্রাহক বেনামে, সম্পদের অতিমূল্যায়ন দেখিয়ে, ভুয়া দলিলাদি দেখিয়ে ওই ঋণ নিয়েছেন, তাদের অনেকেরই সঠিক নাম-পরিচয় জানতো না বেসিক ব্যাংক। পুনর্গঠিত পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমেই ওই সব ঋণগ্রহীতাকে খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেয়। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যাদের খুঁজে পাওয়া গেছে, তাদের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধের স্বীকৃতি আদায়ের পাশাপাশি ঋণ পরিশোধে সর্বোচ্চ সময় দেওয়া হয়। এছাড়া কিছুসংখ্যক ঋণগ্রহীতা স্বঃপ্রণোদিত হয়ে টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হন বলে বেসিক ব্যাংক সূত্র জানায়।

সূত্র জানায়, যেসব ঋণগ্রহীতাকে খুঁজে পাওয়া গেছে, ব্যাংকের টাকা ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে যত রকমের শিথিলতা গ্রাহককে দেওয়া সম্ভব, এর পুরোটাই তাদের দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এরপরও যারা খেলাপি রয়ে গেছে এবং যাদের খোঁজ এখনও মেলেনি তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট শাখাগুলো মামলা করবে। সম্প্রতি এ ধরনের একটি নির্দেশনা বেসিক ব্যাংকের সব শাখায় পাঠানো হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসিক ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ব্যাংকের সর্বশেষ রিকোভারি মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, আমরা আর ঋণগ্রহীতাকে খুঁজে বেড়াবো না। এখন পর্যন্ত যাদের পেয়েছি এবং যারা নিজে থেকে এসেছে এই পর্যন্তই। আর সুযোগ দেওয়া হবে না। এখন যারা টাকা ফেরত দিতে চেয়ে সময় নিয়েছেন কিন্তু টাকা দেননি এবং যারা টাকা নিয়ে আত্মগোপন রয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিটি শাখা তাদের সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের বিরুদ্ধে মামলা করবে। এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এ মজিদ বলেন, ‘আমরা মূলত গ্রাহকদের সঙ্গে এত দিন নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে টাকা আদায়ের চেষ্টা করেছি। এ চেষ্টায় সাড়ে ৮০০ কোটি থেকে ৯০০ কোটি টাকার মতো আদায় করতে পেরেছি আমরা। এখনও অনেকে ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তারা টাকা দিতে চায়। তবে একেবারেই যারা ভিড়েনি, তাদের বিরুদ্ধে মামলায় যেতেই হবে। এজন্য ব্যাংক এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

দেরিতে মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘মামলা করলেও একটা পর্যায়ে গিয়ে আসলে আমাদের নেগোসিয়েশন করতেই হয়। কারণ গ্রাহকের বিভিন্নভাবে সময়ক্ষেপণের সুযোগ থাকে। তারা স্থগিতাদেশ নিতে পারেন। মামলার রায় হলেও আবার আপিল করতে পারেন। এদিকে সরকারের একটু বাড়তি নজর দেওয়া প্রয়োজন। ব্যাংকিং সেক্টরের এত বেশি মামলা এখন হয়, যেগুলো একটু দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে সরকার জোর দিলে ভালো হয়।’

এদিকে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের পরও অনিয়ম পিছু ছাড়েনি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বেসিক ব্যাংকের। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় নীতিমালা মানছেন না। পরিপালন করা হচ্ছে না বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেক নির্দেশনা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অগ্রাহ্য করে ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী এখনও একই শাখায় তিন বছরের বেশি সময় কাজ করছেন।

নীতিমালা অনুযায়ী, ২০১৫ সালেও ব্যাংকের সব বিভাগে অডিট কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়নি। নিয়মের বাইরে গিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন শহরের কয়েকজন গ্রাহককে পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। শ্রেণীকৃত ঋণ অশ্রেণীকৃত হিসেবে সিএল বিবরণীতে রিপোর্ট করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৫ সাল থেকে প্রভিশন সংরক্ষণ শুরু করার শর্ত দিলেও তা পরিপালন করেনি ব্যাংকটি।

শুধু তা-ই নয়, ২০১৪ সালে মূলধন ঘাটতি কম দেখাতে ব্যাংকটি সংরক্ষিত মূলধনের বেশি দেখিয়েছিল বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। বেসিক ব্যাংকের ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক আর্থিক পরিস্থিতির ওপর পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে, যা ডায়াগনস্টিক রিভিউ রিপোর্ট (ডিআরআর) নামে পরিচিত। ব্যাংকটির ২০১৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন, ম্যানেজমেন্ট সংশ্লিষ্ট রিপোর্ট, ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে এ রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। যেখানে বেসিক ব্যাংকের নানা অনিয়ম, ত্রুটি-বিচ্যুতি ও বিভিন্ন দুর্বলতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। শিগগিরই উদ্ঘাটিত এসব অনিয়ম ও ত্রুটি-বিচ্যুতির বিষয়ে ব্যাংকটিকে সতর্ক করার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবে বলে জানা গেছে।