প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

খেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১১ মাসে ৭৪৪ মামলা চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: সময়মতো বাণিজ্যিক ঋণ পরিশোধ না করায় চট্টগ্রামে বিভিন্ন খেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গত ১১ মাসে ৭৪৪টি মামলা করেছে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো। এ তালিকায় আছেন মুদি দোকানি থেকে শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী। মামলা করার পর পাওনা আদায়ে অভিযুক্তদের সম্পদ একে একে নিলামে তুলছেন আদালত। তথাপি পাওনা আদায় নিয়ে চিন্তিত অধিকাংশ ব্যাংক।

অর্থঋণ আদালত ও বিভিন্ন ব্যাংকের সূত্রমতে, বিভিন্ন ব্যাংকের শাখাগুলো ঋণ আদায়ের লক্ষ্যে অর্থঋণ আদালতে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত মোট মামলা হয়েছে ৭৪৪টি। এর আগে ২০১৫ সালে মামলা করা হয় ৯৫৮টি। এছাড়া ২০১৪ সালে ৪৫৪টি, ২০১৩ সালে ৪৬৭টি, ২০১৩ সালে ৪৬৭টি, ২০১২ সালে ২২১টি ও ২০১১ সালে ৯৬টি মামলা করা হয়।

মামলা করার শীর্ষে আছে অগ্রণী ব্যাংক। এ ব্যাংক চলতি বছরে বিভিন্ন শাখার মিলে মামলা করেছে ২৭০টির বেশি। ১৩০টি মামলা করে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ব্র্যাক ব্যাংক। তৃতীয় অবস্থানে ইস্টার্ন ব্যাংক। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধের ব্যর্থতার দায়ে আদালত বিভিন্ন শিল্প গ্রুপের বন্ধকি সম্পদ নিলামের বিক্রয়ের আদেশ দেন। এগুলো হলো: জাহিদ এন্টারপ্রাইজের ৪০ কোটি টাকার বিপরীতে, রাইজিং গ্রুপের কনফিডেন্স এডিবল অয়েলের পাঁচ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে, মাবিয়া স্টিলের সাড়ে ১০ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে, নূরজাহান গ্রুপের মেসার্স নূরজাহান সুপার অয়েল লিমিটেড ও মাররিন ভেজিটেবল অয়েলের বিপরীতে ৮৭ কোটি ২৬ লাখের অনাদায়ে। এছাড়া ম্যাক ইন্টারন্যাশনালের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের পাওনা প্রায় ৭০০ কোটি টাকার আদায়ে বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকগুলো মামলা করে।

এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংক আগ্রাবাদ করপোরেট শাখার ডিজিএম ও শাখা ব্যবস্থাপক রিজোয়ানুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে ব্যবসা-বাণিজ্য খুবই স্থবির। পুরোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ভোগ্যপণ্য আমদানিতে এরই মধ্যে ঝুঁকিতে পড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে আমদানি ঋণপত্র খুলতে ব্যাংকের অনীহা কিংবা আইনি বাধ্যবাধকতা আছে। এ ঋণ আদায়ে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। গত কয়েক বছরে নতুন আমদানিকারকদের আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় ভোগ্যপণ্যে ব্যাংকের বিনিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।’

এ বিষয়ে একাধিক শিল্প গ্রুপের কর্ণধারদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কেউ কোনো কথা বলতে রাজি হননি তারা। তবে আইনি প্রক্রিয়ায় তা নিষ্পত্তি করবেন বলে জানান।

জানা যায়, চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ ছাতা প্রস্তুত ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স সিদ্দিক ট্রেডার্স। লোকসানের ভারে ন্যুব্জ সিদ্দিক ট্রেডার্স পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রায় এক হাজার কোটি টাকা পরিশোধ না করেই গুটিয়ে নেয় ভোগ্যপণ্য ব্যবসা। তবে ব্যাংকের অর্থায়নে গম, চিনি, ছোলা আমদানি করে বিক্রির পরও ব্যাংকের টাকা শোধ করতে না পারায় ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৫০০ কোটি টাকার সম্পত্তি নিলামে তুলেছে ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে যমুনা ব্যাংক সিদ্দিক ট্রেডার্সের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সাইদ ফুডস লিমিটেডের ৫৫ কোটি টাকার জমি নিলামে তুলেছে।

শুধু সিদ্দিক ট্রেডার্স নয়, ভোগ্যপণ্য ব্যবসায় নেমে ডুবতে বসেছে চট্টগ্রামের মেসার্স ইয়াসির এন্টারপ্রাইজের। ব্যাংকের দায় না মিটিয়েই প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ মোজাহের হোসেন ২০১৪ সালে দেশের বাইরে চলে যান। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংক ও খাতুনগঞ্জের একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মোট বকেয়ার পরিমাণ ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে যমুনা, ন্যাশনাল, রূপালীসহ বিভিন্ন ব্যাংকের পাওনা ৪৮১ কোটি টাকা। ব্যাংকঋণ শোধ করতে না পারায় ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের তালিকায় প্রথম আলোচনায় আসে এমইবি গ্রুপের নাম। এ গ্রুপের ২০১০ সালে ব্যাংকের দেনা দাঁড়ায় সাড়ে ৯০০ কোটি টাকা। ফলে দেশের শীর্ষ খেলাপি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় এমইবি গ্রুপ। কোম্পানিটি ১৫টি ব্যাংক থেকে প্রায় ৯১৫ কোটি টাকা ঋণ নিলেও বর্তমানে খেলাপির পরিমাণ ৮০১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। চট্টগ্রামের একসময়ের ঐতিহ্যবাহী ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মোস্তফা গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির কাছে এক হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে বিভিন্ন ব্যাংকের। ভোগ্যপণ্য বিকিকিনির মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করে ইমাম গ্রুপের মোহাম্মদ আলী। ট্রেডিং ব্যবসায়ী থেকে চট্টগ্রামের অন্যতম ভোগ্যপণ্য আমদানিকারকে পরিণত হওয়া প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিক লোকসানে ভোগ্যপণ্য ব্যবসাই ছেড়ে দিয়েছে। গার্মেন্ট ব্যবসায় ধারাবাহিকতা থাকলেও ভোগ্যপণ্য আমদানি বাবদ ইমাম গ্রুপের কাছে কয়েকটি ব্যাংকের পাওনা প্রায় ৭০০ কোটি টাকা।

পাওনা আদায়ে বিভিন্ন ব্যাংক চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রাইজিং গ্রুপ অব কোম্পানিজের বন্ধকি সম্পদ নিলামে তুলেছে। গ্রুপটির বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বকেয়া ঋণ হাজার কোটি টাকারও বেশি। পাওনা আদায়ে পূবালী, সাউথইস্ট, এবি ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের মামলায় আদালত একে একে এ গ্রুপের বিভিন্ন সম্পদ নিলামে তুলছে।

এ বিষয়ে সাউথইস্ট ব্যাংক হালিশহর শাখার ব্যবস্থাপক মনজুর আহমেদ বলেন, পুরোনো জাহাজ আমদানি ও রিসাইক্লিং করতে রাইজিং স্টিলকে এ ঋণ দেওয়া হয়। কিন্তু বারবার চেষ্টার পর গত পাঁচ বছরেও ঋণের টাকা ফেরত না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধারদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। বর্তমানে কোম্পানিটির যে অবস্থা, তাতে ঋণের টাকা নিয়ে শঙ্কায় আছি। গ্রুপটির প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের অবস্থা তেমন ভালো নয় বলে জানান তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাইজিং গ্রুপের এক কর্মকর্তা বলেন, গ্রুপটির প্রধান ব্যবসা ছিল ইস্পাত শিল্প ও শিপব্রেকিং খাতে। কয়েক বছর ধরে এ খাত দুটিতে ধস নামায় গ্রুপটির অবস্থাও নাজুক। এছাড়া একের পর এক রাজনৈতিক মামলায় গ্রুপের কর্ণধাররা ব্যবসায় সময় দিতে পারছেন না। ফলে ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে পুরো গ্রুপটিই লোকসানে পড়ে। এরই মধ্যে গ্রুপটির শিপব্রেকিং, রি-রোলিংসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। রি-ফুয়েলিং ছাড়া বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা নাজুক।

ব্যাংক, ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন ও আমদানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টানা লোকসান, ব্যাংকের দায় পরিশোধে ব্যর্থতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে ধারাবাহিক দরপতনে এরই মধ্যে ভোগ্যপণ্য ব্যবসা থেকে অনেকটা সরে এসেছে খাতুনগঞ্জে নেতৃত্ব দেওয়া এসব প্রতিষ্ঠান।

চিটাগং চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘অর্থঋণের আইনটি একটি মার্শাল ’ল। এ আইন একতরফাভাবে করা হয়েছে। এ আইনের আলোকে বিচারের ৮০ শতাংশ ব্যাংকের পক্ষেই যায়। আর ব্যাংকাররা ভালোভাবে যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়ন করে ঋণ দিলে এত মামলা হতো না। এখানে ব্যাংকগুলো দায় এড়াতে পারে না।’

এনসিসি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমানে পরিচালক নূরে নেওয়াজ সেলিম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ব্যাংকগুলো এখন আগের মতো টাকা দিতে চায় না। কারণ ঋণের অনাদায় বেশি চট্টগ্রামে। এর জন্য বিশ্বমন্দা ও না বুঝে বিনিয়োগ করাটা অন্যতম কারণ। এতে বেশ কিছু শিল্প গ্রুপ ব্যবসায়িকভাবে লোকসানে পড়ে। ফলে পাওনা আদায়ের ব্যাংকগুলো মামলা করছে। তবে ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে হবে।’