দুরে কোথাও

গড় জরিপা দুর্গ এখন শুধুই স্মৃতি…

ইতিহাসের বহু ঘটনার সাক্ষী শেরপুরের গড় জরিপা বা গড় দলিপা। আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে ভারতের কামরূপ কামাখ্যার কোচ রাজা দলিপ সামন্তের এ মাটিদুর্গ ধ্বংস হয়ে গেছে। আধিপত্য পোক্ত করার জন্য দলিপ সামন্ত গড় দলিপা দুর্গ নির্মাণ করেন। তবে মাটির দুর্গে চারটি পরিখার মধ্যে একটির অস্তিত্ব এখনও টিকে রয়েছে।

ঐতিহাসিক কিছু নিদর্শন রয়েছে, যা শত বছর ধরে টিকে থাকে। আবার কিছু নিদর্শন রয়েছে, যার সব স্মৃতি মুছে গিয়ে কেবল ইতিহাস হয়ে থাকে বইয়ের পাতায়। তেমনই একটি নিদর্শন শেরপুরের গড় জরিপা দুর্গ বা স্থানীয় ভাষায় জাঙ্গাল বা পরিখা।

ওই দুর্গের প্রায় ৪০ ফুট উঁচু পরিখাটির এখন ১০ ফুটের মতো অংশ টিকে রয়েছে। বেশিরভাগ টিলায় গড়ে উঠেছে বাড়িঘর, কাঠবাগান ও ফসলের মাঠ। দীর্ঘ ৫০০ বছরের পুরোনো বলে স্থানীয়দের কাছে এ দুর্গের কোনো মূল্য হয়তো নেই।

দুর্গের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে বাস করেন কৃষক আ. খালেক। তিনি তার বাবা-দাদার কাছে শুনেছেন, এ দুর্গটিতে যখন বসতি স্থাপন শুরু হয়, তখন এর উচ্চতা এতটাই ছিল যে, মই দিয়ে বাড়িতে ওঠার প্রয়োজন পড়ত। দুর্গের উত্তর-পূর্ব প্রান্তের যে গেটটি ছিল, তা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। কিন্তু এখানে একসময় মাটি খুঁড়তে গেলে বিশাল আকৃতির পাথর বের হতো। তবে সেসব পাথর কেউ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতে পারতেন না। অজ্ঞাত কারণে পরদিন পাথরটি ওই স্থানেই রেখে আসতে হতো। কেউ কেউ বলেন, কোনো ব্যক্তি পাথর বাড়িতে নিয়ে গেলে ওই রাতেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন এবং পরদিন ভোরে সে পাথর আবার রেখে আসতেন।

১৪৫০ সালের দিকে বৃহত্তর ময়মনসিংহের শেরপুর অঞ্চলে দলিপা নামে একজন কোচ রাজা রাজত্ব করতেন। উত্তরের গারো পাহাড়ের কড়ইবাড়ি, খুটিমারী ও বার হাজারী থেকে দক্ষিণে ব্রহ্মপুত্র নদ এবং পূর্বে নেতাই নদী থেকে পশ্চিমে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত তার রাজত্ব ছিল। রাজধানী ছিল গড় জরিপা। দলিপ সামন্ত বা দলিপ সিংহের শেরপুর অধিকার ও রাজত্বকাল নিয়ে নানা ধরনের তথ্য পাওয়া যায়।

শেরপুর জেলা শহর থেকে ১২ কিলোমিটার উত্তরে ভগ্ন গড় জরিপার দুর্গ। এ দুর্গে নকশার বিশেষ কারুকাজ না থাকলেও ইতিহাস ও আকারের কারণে এটি বিশেষ স্থানের মর্যাদা পেয়েছে। তিনটি প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত ছিল দুর্গটি। বাইরের প্রাচীর ও মাঝখানের প্রাচীরের মধ্যে ছিল পরিখা। চারটি প্রবেশপথ ছিল। এগুলোর ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে। পূর্ব দরজার নাম কাম দুয়ারী, পশ্চিম দরজা পানি দুয়ারী, দক্ষিণ দরজা শ্যামশেখর দুয়ারী ও উত্তর দরজা খিরদুয়ারী।

জানা যায়, সম্রাট আকবরের সময় এ অঞ্চলের নাম ‘দশ কাহনীয়া বাজু’ ছিল। তবে এ অঞ্চলের কোচ শাসক দলিপ সামন্তের রাজ্যের রাজধানী গড় জরিপার উল্লেখ আছে। দলিপ সামন্তের নাম থেকেই এর নাম হয় গড় দলিপা, তবে কালক্রমে বিকৃত হয়ে এর নাম গড়জরিপায় রূপান্তরিত হয়।

১৪৯১ সালে ফিরোজ শাহ বাংলার নবাব হলে সেনাপতি মজলিশ শাহ হুমায়ন দুর্গটি দখল করেন। ১৫১৯ সালের মধ্যে শেরপুর অঞ্চলটি পাঠান সুলতানদের অধিকারে আসে।

মজলিস খান হুমায়ন শাহ চতুর্দশ শতাব্দীতে গড়জরিপাকে পথচারীদের জানমাল পাহাড়িয়া দস্যু ও ঠগদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য দুর্গটি ব্যবহারের অনুমতি দেন।

১৮৫৭ সালের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের কবলে পড়ে দুর্গের অনেক কিছু ভেঙে চূর্ণ হয়ে যায়। পরিখাগুলো সব সময় পানিতে পূর্ণ হয়ে খাল বা লেকের মতো দেখাত। এর মধ্যে আবার নৌকা আকৃতির একটা দ্বীপ ছিল। ভূমিকম্পের পর আর দ্বীপটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। দুর্গের ভেতরে দিঘি ছিল। ধারণা করা হয়, সৈন্য, হাতি, ঘোড়ার গোসলসহ প্রয়োজনীয় সুপেয় পানির সংকুলানের জন্য দিঘি খনন করা হয়েছিল। কালের পরিক্রমায় দিঘিগুলোও ভরাট হয়ে চলেছে। এর মধ্যে মতি মিয়ার তালা নামে একটি জলাধার ছিল। পরবর্তীকালে দুর্গ ও এর আশপাশ এলাকা কৃষিক্ষেত্রে পরিণত হয়। ভেতরের প্রাচীরের মধ্যে এক দশমিক ১৭০ বিঘা জমি ছিল। প্রাচীরের উচ্চতা ছিল ২৫ ফুট থেকে ৪৩ ফুট পর্যন্ত। প্রাচীরের পরিধি প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। পরিখাগুলো ৪৫০ ফুট থেকে ৯০০ ফুট পর্যন্ত চওড়া ছিল।

জনশ্রুতি রয়েছে, দলিপ সামন্ত আক্রমণকারীদের হাত থেকে রক্ষার জন্য দুর্গ ও পরিখা নির্মাণ করেন। ফিরোজ শাহের রাজত্বকালে (১৫৫১-৮৭) মজলিশ শাহ নামে একজন সেনাপতি দুর্গ আক্রমণ করেন। তিনি দলিপ সামন্তকে হত্যা করে দুর্গের দখল নেন। দুর্গে মজলিস শাহ হুমায়নের সমাধি ও শিলালিপি ছিল। পরে আরবি ও ফার্সি শিলালিপি থেকে এর পাঠোদ্ধার করা হয়। গড় জরিপা শিলালিপিতে বাংলায় এটির নির্মাণকাল লেখা ‘শেরপুর ঈসায়ী ১৪৮৮’।

১৫৭৬ সালে কুচবিহারের রাজা লক্ষ্মী নারায়ণের সঙ্গে পটকানোয়ারের বিবাদ তুঙ্গে উঠলে এ-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে বাংলার শাসনকর্তা মানসিংহ কিছুদিন এ দুর্গে বাস করেন।

শেরপুরের এ ঐতিহাসিক স্থানটির স্মৃতি ধরে রাখতে স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করে স্থানীয়রা।

  রফিক মজিদ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..