ধারাবাহিক শেষ পাতা

গণপূর্ত অধিদফতরে দুর্নীতির ‘১০ উৎস’

দুদকের প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক: অবকাঠামোবিষয়ক উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নকারী রাষ্ট্রায়ত্ত কর্তৃপক্ষ গণপূর্ত অধিদফতরে দুর্নীতির ১০ উৎস চিহ্নিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তা প্রতিরোধে ২০ দফা সুপারিশও করেছে সংস্থাটি। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের হাতে তুলে দেন দুদকের কমিশনার মো. মোজাম্মেল হক খান।
দরপত্র প্রক্রিয়াতেই দুর্নীতি বেশি হয় বলে দুদকের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে যথাযথভাবে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করা, অপছন্দের ঠিকাদারকে কাজ না দেওয়া, অস্বাভাবিক মূল্যে প্রাক্কলন তৈরি, ছোট ছোট প্যাকেজে প্রকল্প প্রণয়ন, দরপত্রের শর্ত উপেক্ষা করা প্রভৃতি।
এর বাইরে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, প্রকল্প প্রণয়ন, তদারকি, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কাজে ধীর গতি, প্রয়োজনের তুলনায় কম বরাদ্দ, প্রকল্পের অনাবশ্যক ব্যয় বৃদ্ধি, স্থাপত্য ও কাঠামোগত নকশা চূড়ান্তে বিলম্ব, প্রত্যাশী সংস্থার প্রয়োজনমতো জরুরি ভিত্তিতে কাজ শেষ না করা, সেবা প্রদানের বিভিন্ন স্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসহযোগিতা, সময়মতো ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ না করা এবং বরাদ্দ থাকার পরও ঠিকাদারদের আংশিক বিল পরিশোধ করাও চিহ্নিত হয়েছে দুদকের প্রতিবেদনে।
দুদক কমিশনার সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুদক ২৫ প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করে টিম গঠন করেছে। একেকটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কে একেকটি টিম। ২৫টির মধ্যে আজকের (গতকাল) প্রতিবেদনটি পঞ্চদশ। এ প্রতিবেদনের মূল বিষয় হচ্ছে গণপূর্ত অধিদফতর।’
তিনি বলেন, ‘এ প্রতিবেদনটি এক ধরনের পর্যবেক্ষণ বা সংক্ষিপ্ত জরিপ। কাজটি করতে এ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, স্টেকহোল্ডার, ঠিকাদার ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন, এ মন্ত্রণালয়ের অডিট রিপোর্ট, বার্ষিক প্রতিবেদন সবকিছু পর্যালোচনা করা হয়েছে।’
দুদকের এ প্রতিবেদনকে গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন বলে জানিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী রেজাউল করিম। তিনি বলেন, ‘এ প্রতিবেদন আমাদের কাজের গতি বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা আনতে ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এ গাইডলাইনকে আমরা খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব।’ এর ভিত্তিতে যদি তদন্ত করতে হয়, তাও করবেন বলে জানান মন্ত্রী।
দুদক কমিশনার মোজাম্মেল হক সাংবাদিকদের সামনে গণপূর্ত অধিদফতরের দুর্নীতির উৎসগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
এর মধ্যে দরপত্র প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি খুঁজে পেয়েছে দুদক; যেমন: অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন, দরপত্রের তথ্য ফাঁস, সমঝোতার নামে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এজেন্ট ঠিকাদার নিয়োগ, বারবার নির্মাণকাজের নকশা পরিবর্তন, নি¤œমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, টেন্ডারের শর্তানুসারে কাজ বুঝে না নেওয়া, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেরামত বা সংস্কার কাজের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার করে অর্থ আত্মসাৎ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা/প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বেনামে বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে ঠিকাদারি কাজ পরিচালনা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ এবং ঠিকাদার ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর অনৈতিক সুবিধা লাভ।
গণপূর্ত অধিদফতরের বৃহৎ পরিসরের কাজ ছাড়াও মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ রয়েছে। এ বরাদ্দের বিপরীতে কাজগুলো ছোট ছোট লটে ভাগ করা হয়। এসব কাজ তাদের পছন্দের ঠিকাদারদের দেওয়ার জন্য ই-জিপিতে না গিয়ে গোপন দরপত্রের মাধ্যমে কাজ দেওয়া হয় বলে দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।
অনেক ক্ষেত্রে অপছন্দের ঠিকাদারকে ‘নন রেসপনসিভ’ করা হয় এবং কৌশলগত হিসাবের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারকে রেসপনস করা হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। যেমন: বর্তমানে ই-জিপির মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হলেও আগেই গোপন সমঝোতার মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারকে রেট জানিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া, পছন্দের ঠিকাদারের যেসব অভিজ্ঞতা রয়েছে, সেসব অভিজ্ঞতার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, যাতে করে অন্য কোনো ঠিকাদার ওই দরপত্রে অংশ নিতে না পারেন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..