প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

গণহত্যা: নভেম্বর ১৯৭১

কাজী সালমা সুলতানা: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালির স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা বিনাশ করতে সমগ্র দেশজুড়ে নজিরবিহীন গণহত্যা ও ধ্বংসযঞ্জ সংগঠিত করে। পরবর্তী নয় মাস ধরেই বাঙালি নিধন অব্যাহত থাকে। এসব গণহত্যায় ৩০ লাখ মানুষ শহিদ হয়েছে বলা হলেও বাস্তবে এই সংখ্যা ৩০ লাখেরও অনেক বেশি। শুধু তা-ই নয়, নয় মাসে হত্যা ছাড়াও ছয় লাখেরও বেশি নারীকে নির্যাতন করা হয়েছে। এছাড়া দেশজুড়ে আনাচে-কানাচে নিপীড়িত হয়েছে অসংখ্য মানুষ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ-দেশীয় দোসররা কত ঘরবাড়ি ভস্মীভূত করেছিল তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কত যে নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তারও প্রকৃত হিসাব নাই। তবে এসব হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশই ঘটেছে রাজাকার, আল-বদর, আল-সামসদের সহায়তায়। এক রাষ্ট্রের নাগরিক হলেও পাকিস্তানিদের একার পক্ষে সম্ভব ছিল না দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটানো। দেশের আনাচে-কানাচে রয়েছে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য বধ্যভূমি ও গণকবর। এখন পর্যন্ত দেশে পাঁচ হাজারের অধিক বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়া গেছে। ১৯৭১-এর নভেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে যে গণহত্যাগুলো সংঘটিত হয়। 

ধুনট গণহত্যা : ১৯৭১ সালের ৪ নভেম্বর বগুড়ার ধুনট উপজেলায় গণহত্যায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে ২৮ জন সাধারণ মানুষকে। এদিন স্থানীয় রাজাকারদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় বিভিন্ন গ্রাম থেকে ২৮ জনকে আটকের পর শহরে একত্র করে পাকসেনারা। এরপর তাদের ওপর শুরু হয় নির্মম নির্যাতন। একপর্যায়ে রাতেই সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে তাদের সবাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর ধুনট থানা ভবনের প্রায় ২০০ গজ পূর্বদিকে পশ্চিম ভরনশাহী গ্রামে পাশাপাশি দুটি গণকবরে তাদের সমাধিস্থ করা হয়। এদিন শহিদদের মধ্যে ধুনট উপজেলার ভরনশাহী গ্রামের জহির উদ্দিন, কান্তনগর গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান, মাজবাড়ি গ্রামের একই পরিবারের ফরহাদ আলী ও পর্বত আলী, জিল্লুর রহমান, চাঁন্দারপাড়া গ্রামের আব্দুল লতিফ, শিয়ালী গ্রামের নুরুল ইসলামের পরিচয় জানা যায়। গণকবরে লেখা রয়েছে শহিদদের নামের তালিকা। তবে একই সময় পাকিস্তানি সেনাদের বুলেটের আঘাতে শহিদ হয়েছেন নাম না জানা আরও ২১ মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও তাদের অনেকের নাম ও পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি।

হাতিয়া গণহত্যা : ১৩ নভেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক কুড়িগ্রাম জেলার অন্তর্গত উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের দাগারকুঠি গ্রামে গণহত্যা সংঘটিত হয়।  এই গণহত্যায় পাকসেনারা প্রায় ৭০০ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে।

হাতিয়া গণহত্যা বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ গণহত্যা। ১৯৭১ সালের ১৩ নভেম্বর, ২৩ রমজান। এদিন ফজরের নামাজের পর পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা কুড়িগ্রাম, উলিপুর ও চিলমারীÑএই তিন দিক থেকে ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ের বুড়াবুড়ি ও হাতিয়া ইউনিয়নে ব্যাপক আক্রমণ চালায়। পাকবাহিনী দাগারকুটিসহ নয়াডারা, নীলকণ্ঠ, অনন্তপুর, সরকারিগ্রাম, রামখানা, কলাতিপাড়া, বাগুয়া, হাতিয়া বকসী, হাতিয়া ভবেশ, রামরামপুর, জলাঙ্গারকুটি, হিজলীগোপ, সাদিরভিটা ও শ্যামপুরÑএই ১৫টি গ্রাম থেকে ৬৯৭ জন বাঙালিকে ধরে আনে দাগারকুটি গ্রামে খোলা জায়গায়। এরপর গুলি করে এবং বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় তাদের। হত্যার পর পাকিস্তানি হায়েনা ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর ও আলসামস বাহিনী মিলে নিরীহ গ্রামের বাড়ি-ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয় ও নারী ধর্ষণ করে। তাদের এই ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ থেকে কোলের শিশুরাও রক্ষা পায়নি। বধ্যভূমিতে শহিদদের মরদেহ দু’দিন পড়েছিল। পরে ৭০০ জনকে গণকবর দেয়া হয়। ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে দাগারকুটি বধ্যভূমি বর্তমানে বিলীন হয়ে গেছে। এই গণহত্যার শহিদদের স্মরণে হাতিয়া ইউনিয়নের অনন্তপুর বাজারের প্রবেশমুখে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছে। 

হরিপুর গণহত্যা :  ১৩ নভেম্বর রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার হরিপুরে এক নৃশংস গণহত্যা সংঘটিত হয়। এদিন ভোরে রাজশাহী-নবাবগঞ্জ রোডের দক্ষিণ পাশে রাজশাহী কোর্ট থেকে গোদাগাড়ী উপজেলার ফরহাদপুর গ্রাম পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনী ঘিরে ফেলে। ফজরের আজান দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা বাড়ি-ঘরে আগুল জ্বালিয়ে দেয়, সেই সঙ্গে গুলি করতে থাকে। শুধু হরিপুর ইউনিয়নে এদিন ১৪৫ জনকে কয়েক জায়গাতে জড়ো করে হত্যা করা হয়। গণহত্যা শিকার মানুষদের মধ্যে স্থানীয় বেলুয়া খোলা মসজিদে তাবলিগ জামায়াতে আসা অন্য স্থানের লোকজন ছিল। এছাড়া অন্যান্য স্থান থেকে লোকজন ধরে এনে এখানে হত্যা করা হয়। পাকসেনারা হরিপুর ইউনিয়নের বেশ কিছু নারী সেদিন লাঞ্ছিত ও নির্যাতন করে।

ছাব্বিশা গণহত্যা:  ১৭  নভেম্বর  টাঙ্গাইল জেলার ভুঞাপুর উপজেলার ছাব্বিশা গ্রামে গণহত্যা সংঘটিত হয়। ভুঞাপুরে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার আব্দুল হাকিম, জহুরুল হক চান মিঞা, আব্দুল হাইয়ের দল এবং স্থানীয় মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করে। সেদিনই সিরাজগঞ্জ থেকে এক ব্যাটালিয়ন পাকিস্তানি হানাদার সৈন্য কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে ভুঞাপুরের দিকে অগ্রসর হয়। তারা এদেশীয় কিছু দালাল রাজাকারদের সহযোগিতায়  মাটিকাটা কালীগঞ্জ ও তেঘড়ি গ্রামের উদ্দেশ্যে লঞ্চ থেকে নামে। এ সংবাদ পেয়ে ভুঞাপুরে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা প্রথমে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। পাকিস্তানি বাহিনীর এ অবস্থানটি ছিল অতর্কিত অথচ পরিকল্পিত। পাকিস্তানি সেনারা ছাব্বিশা উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের স্থানে পৌঁছালে কিছু মুক্তিযোদ্ধা বেতুয়া গ্রামে এসে অবস্থান নেন। ভুঞাপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও ভুঞাপুর ডাকবাংলোতে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা দুই ভাগে ভাগ হয়ে একটি দল পূর্ব ভুঞাপুর লৌহজং নদীর পাড়ে  পাকিস্তানি সৈন্যদের প্রতিরোধ করার জন্য অবস্থান নেয়। অন্য দলটি ছাব্বিশা গ্রামে অবস্থান নেয়।  মুক্তিযোদ্ধা ও পাকসেনাদের  সঙ্গে দীর্ঘসময়  প্রচণ্ড গুলি বিনিময় হয়। সকাল থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত যুদ্ধ শুরু; উভয় পক্ষের গুলিবর্ষণ চলে একপর্যায়ে পাকিস্তান সেনাদের প্রচণ্ড আক্রমণে  মুক্তিযোদ্ধাদের গোলাবারুদ ফুরিয়ে গেলে তারা নিরুপায় হয়ে সরে যায়।

এরপর পাকসেনারা গ্রামে ঢুকে নির্বিচারে গণহত্যা ও জ্বালাও-পোড়াও শুরু করে। প্রথমেই গণহত্যা করে ছাব্বিশা গ্রামে। বৃদ্ধ, যুবা নারী শিশু যাকে পেয়েছে তাকেই তারা গুলি করে হত্যা করে। কিছু সময়ের মধ্যে ছাব্বিশা গ্রাম পরিণত হয়  গণহত্যাস্থলে। এ গণহত্যায় ৪৩ জন নারী-পুরুষ ও শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যা করে বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী। তারা ৪০০ ঘরবাড়ি, দোকানপাট  জ্বালিয়ে দেয়। পাকিস্তানি সৈন্যরা তিনজন গর্ভবতী নারীকে লাথি মেরে বাচ্চা প্রসব করায়। এই গণহত্যা ভুঞাপুরের আকাশ-বাতাসকেও ভারী করে তোলে।

মুগরুল গণহত্যা: ১৮ নভেম্বর রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি ইউনিয়নের মুগরুল গ্রামে গণহত্যা সংঘটিত হয়। সেদিন শবেকদরের রাত ছিল। ভোরবেলা পাকিস্তানি বাহিনী মুগরুল গ্রামটি ঘিরে ফেলে। এরপর তারা গ্রামের ১৫ জনকে বেঁধে গুলি করে হত্যা করে। অক্টোবর মাসে রাজাকাররা সেই এলাকার নিরীহ ৩৮ মানুষকে ধরে গুলি করে হত্যা করে এবং একটি গর্ত করে তাদের মাটিচাপা দিয়ে রাখে।

মোহনপুর থানার সাঁকোয়া-মুগরুল গ্রামে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এদেশীয় দোসর রাজাকারদের একটি ক্যাম্প ছিল। ক্যাম্পটিতে রাজাকার আবদুল মহিনের নেতৃত্বে রাজাকাররা এলাকার বিভিন্ন গ্রাম থেকে নিরীহ লোকজনকে ধরে আনত সাঁকোয়া গ্রামে। সেখানে নির্মমভাবে অত্যাচার করার পর তাদের হত্যা করা হতো। রাজাকাররা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের ধরে বেয়োনেট দিয়ে বুক ফেড়ে হত্যা করত।

তারা মুক্তিকামী মানুষদের প্রথমে সাঁকোয়া গ্রামে ধরে আনত, তারপর তাদের অত্যাচার করে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের কথা জানার চেষ্টা করত। পরে ধৃত ব্যক্তিদের পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিত। এই রাজাকারেরা আবার বন্দিদের ছাড়িয়ে আনার কথা বলে তাদের পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায় করত। একইভাবে তারা মুক্তিযোদ্ধা আইয়ুব আলী ও আমজাদ আলীকে সাঁকোয়া ক্যাম্পে ধরে এনে অত্যাচার করে তথ্য আদায়ের চেষ্টা করে। পরে তাদের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়। এ অবস্থায় নিরুপায় সাধারণ সাঁকোয়া গ্রামের মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তাদের ওপর অত্যাচারের তথ্য প্রদান করে সাহায্য প্রার্থনা করেন। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯৭১ সালের ১৭ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা মান্দা থানার সীমান্ত এলাকায় বাঁকাপুর ও মুরশিদপুর এলাকায় অবস্থান নেন। সেখান থেকে তারা সাঁকোয়া গ্রামে স্থাপিত রাজাকারদের ক্যাম্পের অবস্থান সম্বন্ধে অবগত হন। মুক্তিযোদ্ধারা ২৬ নভেম্বর রাত দেড়টায় অতর্কিতে সেই ক্যাম্প আক্রমণ করেন। প্রায় এক ঘণ্টা গুলিবিনিময়ের পর রাজাকাররা আত্মসমর্পণ করে এবং মুক্তিযোদ্ধারা এলাকাটিকে মুক্তাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেন। সেই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা তসির উদ্দিন ও নুরউদ্দিন মাস্টার আহত হন।

তেরশ্রী গণহত্যা: ২২ নভেম্বর মানিকগঞ্জের ঘিওরের তেরশ্রীতে গণহত্যা সংঘটিত হয়। পাক হানাদার ও তাদের এদেশীয় দোসর এবং রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সদস্যরা সেদিন বর্বরোচিত নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার তেরশ্রী গ্রামের তৎকালীন জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরীসহ ৪৩ গ্রামবাসীকে গুলি করে এবং বেয়োনেটের আঘাতে নির্মমভাবে হত্যা করে। নিরীহ গ্রামবাসীর ওপর বর্বরোচিত হামলা ও হত্যাকাণ্ডের কারণ জানতে চাওয়ায় ঘাতকরা বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমানকে। ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর দোসররা টার্গেট করে এই গ্রামটিকে। গোপনে শিক্ষানুরাগী, মুক্তিযোদ্ধা, ভাষাসৈনিক, রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবীদের তালিকা প্রস্তুত করে দালালরা। ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর ভোরে ঘিওর থেকে পাক হানাদার আর তাদের সহযোগীরা আক্রমণ চালায় তেরশ্রী গ্রামে। হায়েনার দল ঝাঁপিয়ে পড়ে সেনপাড়ার ঘুমন্ত মানুষের ওপর। হানাদার বাহিনী যাকে যেখানে পেয়েছে, তাকে সেখানেই হত্যা করে। তেরশ্রী এলাকার উন্নয়নের পৃষ্ঠপোষক জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরীকে তার শয়নকক্ষ থেকে বের করে লেপ-কম্বল দিয়ে পেঁচিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারে।

এ সময় তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমান ঘটনাস্থলে এসে জানতে চান জমিদার বাবুকে হত্যা করা হচ্ছে কেন? হায়েনার দল তখন অধ্যক্ষ সাহেবকে ধরে নিয়ে আসে তেরশ্রী বাজারে এবং বেয়োনেট চার্জ করে। পরক্ষণেই তাকে তার বাসায় নিয়ে শিশুপুত্র ও স্ত্রীর সামনে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। দুপুর ১২টা পর্যন্ত হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ সম্পন্ন করে ফিরে যায় ঘিওরে। লাশের গ্রামে পরিণত হয় পুরো তেরশ্রী গ্রাম। পরে স্থানীয় হিন্দু-মুসলমান মিলে লাশগুলোকে কবর দেন গণকবরের মতো।

সূর্যদী গণহত্যা: ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর শেরপুরের সূর্যদী গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় নির্মম গণহত্যা সংঘটিত হয়। এদিন বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে প্রাণ হারান এক মুক্তিযোদ্ধাসহ ৩৯ নিরীহ গ্রামবাসী। সেদিন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় সেখানকার ৩০০ ঘরবাড়ি।

২৪ নভেম্বর সকাল ৭টায় জিপ আর ট্রাকবোঝাই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গ্রামটিতে হামলা চালায়। গ্রামের লোকজন কিছু বুঝে ওঠার আগেই হানাদার বাহিনী গুলি ছুড়তে থাকে। একই সময়ে গান পাউডার ছিটিয়ে গ্রামের দেওয়ানবাড়ি, কিরসাবাড়ি ও বড়বাড়ির প্রতিটি ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। আর গ্রামের যুবক-কিশোর যাদের পায় তাদের হত্যা করার জন্য ধরে এনে দাঁড় করায় স্থানীয় ধানক্ষেতের মধ্যে।

সেদিন আত্মগোপন করে থাকা এ গ্রামের বাসিন্দা ছয় বীর মুক্তিযোদ্ধা গিয়াস কোম্পানির মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব আলী, আবদুল খালেক, ফজলুর রহমান, হাবীবুর রহমান, মমতাজ উদ্দিন ও আবুল হোসেন সামনে এগিয়ে আসেন। মাত্র ৪৫ রাউন্ড গুলি, এসএমজি আর কয়েকটি গ্রেনেড নিয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েন হানাদারদের ওপর। একটু পরেই তাদের সঙ্গে যোগ দেন অন্য গ্রামে আত্মগোপন করে থাকা কোম্পানি কমান্ডার গিয়াস উদ্দিনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের আরও দুটি দল। সম্মিলিত আক্রমণের মুখে হানাদাররা দ্রুত পিছু হঠে যায়। এ যুদ্ধেই শহিদ হন খুনুয়া চরপাড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মো. আফসার আলী।

১৯৭১ সালের ২৫ নভেম্বর শ্রীরামপুর পদ্মা নদীর তীরে পাকিস্তানি সৈন্যরা রাজাকার-আলবদরদের মদতে গণহত্যা চালায়। তারা একসঙ্গে সবাইকে হাত-পা ও চোখ বেঁধে জীবন্ত অবস্থায় বালুর নিচে পুঁতে দিয়ে গণহত্যা চালায়।

বক্তাবলী গণহত্যা: ১৯৭১ সালের ২৯ নভেম্বর দেশ যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে ঠিক তখনই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার প্রত্যন্ত অঞ্চল বক্তাবলী পরগনার ২২টি গ্রামে। বর্বরোচিত ওই হামলায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে ১৩৯ নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি নারী কিংবা শিশু। রাজাকার, আলবদররা জ্বালিয়ে দিয়েছিল গ্রামের পর গ্রাম। স্বাধীনতাযুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে একসঙ্গে এত মানুষ হত্যার ঘটনা দ্বিতীয়টি আর নেই।

ঘটনার দিন ভোরের দিকে হঠাৎ পাক বাহিনী গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প লক্ষ করে গুলি ছুড়তে থাকে। অপ্রস্তুত মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা জবাব দেন। উভয় পক্ষের মধ্যে সম্মুখযুদ্ধ চলাকালে মুন্সীগঞ্জ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ব্যাটালিয়ন বক্তাবলীতে এসে সেখানকার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিলে তাদের শক্তি বাড়ে। পরে তারা একত্রে পাক বাহিনীর সঙ্গে প্রায় চার ঘণ্টা একটানা যুদ্ধ চালান। এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা মোক্তারকান্দি কবরস্থানের সামনে কয়েকজন রাজাকারকে ধরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেন।

বক্তাবলীর মানুষ শত শত মুক্তিযোদ্ধার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। সেইসঙ্গে হানাদার বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে পালিয়ে আসা শত শত পরিবারের আশ্রয়স্থল ছিল বক্তাবলী। স্বাধীনতার লাভের মাত্র ১৭ দিন আগে ঘটে বক্তাবলীর হৃদয়বিদারক হত্যাযজ্ঞ।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা স্বজন ও সম্পদ হারিয়েছেন, তাদের দুঃখ-যন্ত্রণা কখনোই ভুলে যাওয়ার নয়। এমন অসংখ্য হত্যাকাণ্ড ঘটেছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে। অসংখ্য প্রাণের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের মহান স্বাধীনতা। আমাদের স্বাধীনতা লাভের দীর্ঘ রক্তাক্ত পথে যাদের আমরা হারিয়েছি, তাদের আমরা যেন তাদের ভুলে না যাই- এই হোক আমাদের শপথ।

তথ্যসূত্র: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]