আজকের পত্রিকা সর্বশেষ সংবাদ সুশিক্ষা

গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস

আগ্রহী নয় শিক্ষার্থীরা

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী গত ১৭ মার্চ থেকে বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। চলমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে (গবি) অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ৯ এপ্রিল এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এ পদক্ষেপকে শিক্ষার্থীরা ইতিবাচকভাবে নিলেও নানা সমস্যা তুলে ধরে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার দাবি জানিয়েছেন তারা। শিক্ষার্থীদের অভিমত, চলমান পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হওয়ার পর থেকে  বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই তাদের বাসায় অবস্থান করছে। অনেক এলাকায় ওয়াইফাই তো দূরে থাক, অনেক ক্ষেত্রে ভালো নেটওয়ার্কও নেই। এ ধরণের দুর্বল ইন্টারনেট সেবার মাধ্যমে অনলাইনে ক্লাস করা কিভাবে সম্ভব?

তাছাড়া যেসব অঞ্চলে ইন্টারনেট সেবা ভালো, সেখানে মোবাইল ডেটা কিনে কতদিন অনলাইনে ক্লাস করা সম্ভব? কারণ, মোবাইল ডেটার জন্য তুলনামূলক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। দুর্যোগময় এ পরিস্থিতিতে যেখানে মানুষের আয় রোজগার নেই, সেখানে এ ধরণের সিদ্ধান্ত বিলাসিতা ছাড়া কিছু নয়। আর দেশের কঠিন পরিস্থিতিতে বাইরে  বের হয়ে মোবাইল রিচার্জ করা স্বাস্থ্যগতভাবে বেশ ঝুঁকির।

বর্তমানে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন ফার্মেসী, মাইক্রোবায়োলজি,  ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস, বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি প্রভৃতি চালু রয়েছে। এসব বিষয় সহজভাবে বুঝতে বিভিন্ন উপকরণের প্রয়োজন, যা অনলাইন ক্লাসে পাওয়া সম্ভব না। তাছাড়া এসব বিষয়ে পড়ালেখার জন্য ল্যাবরেটরির উপস্থিতি প্রয়োজনীয়। চিকিৎসা বিজ্ঞান ছাড়াও ইঞ্জিনিয়ারিং নানা বিষয়ের জন্য ল্যাবরেটরীর প্রয়োজন। অনলাইনে ক্লাসের মাধ্যমে এসব বিষয়ে কতটা উপকৃত হওয়া সম্ভব, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রাথমকিভাবে যখন ৩১ মার্চ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করা হয়, তখন এ স্বল্প সময়ের (দুই সপ্তাহ) ছুটির জন্য অনেকেই তাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী বাসায় নিয়ে যায়নি। এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী ছাড়া অনলাইনে ক্লাস করা বেশ কষ্টসাধ্য। দেশের চলমান পরিস্থিতির কারণে শিক্ষার্থীদের মাঝে পড়ালেখার মন মানসিকতা নেই বলেও অভিমত অনেক শিক্ষার্থীর।

অনলাইন ক্লাসের সমস্যার বিষয়ে ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস অনুষদের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী হাসানুল বাকের তামলিখা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত ইতিবাচকভাবে নেওয়া উচিত। শিক্ষার্থীরা যদি ঘরে বসে এ অলস সময়টা তাদের শিক্ষা কার্যক্রমে কিছুটা হলেও কাজে লাগায়, সেটা অবশ্যই ভালো। তবে সব শিক্ষার্থীর কথা চিন্তা করলে এটা সম্ভব নয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে যাদের বাড়ি, তারা এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবেন না।

সম্প্রতি অনলাইনে ক্লাসের পক্ষে বিপক্ষে শিক্ষার্থীদের মতামত নিয়ে একটি জরিপ করা হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬০ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। জরিপে ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসের বিপক্ষে মত দেন। আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মেরাজ তালুকদার বলেন, অনেক শিক্ষার্থী ও এমনকি অনেক শিক্ষকও রয়েছেন যারা অনলাইনে ক্লাসের সিস্টেম সম্পর্কে অবগত নন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্বল ইন্টারনেট সেবা, মোবাইল ডেটার অর্থ ব্যয় ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সমস্যার কথা বিবেচনা করে প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা উচিত। তবে প্রযুক্তির এ যুগে অনলাইনে ক্লাসের উদ্যোগ অবশ্যই যুগোপযোগী।

২৪ মার্চ বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনলাইনে ক্লাস পরিচালনার জন্য বলা হয়। ইউজিসির নির্দেশনা অনুযায়ী বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস চালু হয়। তবে শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যার কারণে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস চালু করার পর বন্ধ করা হয়।

সার্বিক বিষয়ে কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মো. নজরুল ইসলাম রলিফের সঙ্গে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একমত পোষণ করে তিনি বলেন, অনলাইন ক্লাস সম্পর্কে অনেক শিক্ষার্থী অবগত নয়। শিক্ষার্থীরা বাড়িতে অবস্থান করায় নিয়মিত ইন্টারনেট কেনার সামর্থ্য অনেকের নেই। এ বিপর্যয়ে অনলাইনে ক্লাস করা আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য যৌক্তিক হবে না।

তবে নানা ইতিবাচক বিষয় দেখছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সংশ্লিষ্টরা জানান, ঘরে বসে অলস সময় পার করার  চেয়ে অনলাইনে ক্লাস করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কিছুটা উপকৃত হলেও আমাদের স্বার্থকতা। ইউজিসির নির্দেশনা অনুযায়ী অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে ক্লাস চলমান রয়েছে। বিষয়টা সাবর ভালোভাবে নেওয়া উচিত। তবে এটা বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সংগঠন, সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা কাম্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী রেজিস্ট্রার আবু মুহাম্মাদ মুকাম্মেল বলেন, বর্তমানে অনলাইনে যুক্ত নয়, এমন শিক্ষার্থী কম। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত ও সেশনজটের কথা চিন্তা করে পরীক্ষামূলকভাবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সব বিভাগকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে যৌক্তিক সমস্যা তুলে ধরা হয় তবে কর্তৃপক্ষ অবশ্যই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে।

অনিক আহমেদ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..